মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাতের আশঙ্কা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের মাঝেই আগামী সপ্তাহে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকের সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইতোমধ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে পাকিস্তান এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় রয়েছে বলেও কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রস্তাবিত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ১৪ দফার একটি খসড়া সমঝোতা স্মারক। মূলত এটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি নয়, বরং ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি তৈরির একটি প্রাথমিক কাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, দুই দেশ যদি এই খসড়ায় নীতিগত সম্মতিতে পৌঁছাতে পারে, তাহলে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভাঙার পথ তৈরি হতে পারে।
সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, সম্ভাব্য আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, তেহরান উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদনের মাধ্যমে পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ।
এছাড়া হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনাও আলোচনার বড় অংশ হতে পারে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিতে যেকোনো সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চাইছে সেখানে অবাধ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে।
খসড়ায় ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অন্য দেশে স্থানান্তরের বিষয়টিও রয়েছে বলে জানা গেছে। পশ্চিমা দেশগুলো এটিকে আস্থা তৈরির একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
তবে সবকিছুর মাঝেও সবচেয়ে জটিল ইস্যু হয়ে আছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি না দেখায়, তাহলে বড় কোনো সমঝোতায় যাওয়া কঠিন হবে।
তেহরানের মতে, বছরের পর বছর ধরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি ব্যাপক চাপে পড়েছে। ফলে কেবল আলোচনার আশ্বাস নয়, বাস্তব সুবিধা দেখতে চায় তারা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরান আগে তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিক। ফলে দুই পক্ষের অবস্থানের এই পার্থক্যই এখন আলোচনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের নাম সামনে আসায় নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দেখছেন বিশ্লেষকরা। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামাবাদ মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে পাকিস্তান একটি গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইসলামাবাদে বৈঠক বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই নয়, পুরো অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই পক্ষই অন্তত সংলাপ চালিয়ে যেতে আগ্রহী। এমনকি প্রয়োজন হলে প্রাথমিক এক মাসের আলোচনার সময়সীমাও বাড়ানো হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে এই আলোচনা কতটা সফল হবে, সেটিই এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

