ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত এখন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি কূটনৈতিক টেবিলও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে সৃষ্ট অচলাবস্থা শুধু তেহরান বা ওয়াশিংটনের জন্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতেই ৬ মে ২০২৬ বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বেইজিংয়ে গিয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। সময়ের দিক থেকে এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর ঠিক এক সপ্তাহ পর ১৪ ও ১৫ মে চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের জন্য বেইজিং সফরে যাওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের।
এই বৈঠককে শুধু দুই মিত্রদেশের নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিশ্ববাণিজ্য, নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাব-নিকাশ। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ কোন পথে যাবে, তা নির্ধারণে চীন এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে চলাচল করে। তাই এই প্রণালীতে যেকোনো ধরনের বাধা মানেই জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্পোৎপাদনে চাপ এবং সাধারণ মানুষের জীবনে বাড়তি খরচের আশঙ্কা। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করে। অন্যদিকে, এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নিজের অবরোধ জোরদার করে, যাতে তেহরানকে আলোচনায় ওয়াশিংটনের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা যায়।
এই পাল্টাপাল্টি চাপ বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা দিয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ায় উপসাগরীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় চীন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে শুধু চীন নয়, যুক্তরাষ্ট্রও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়ছে, অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হচ্ছে, আর সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। ফলে এখানে একটি অদ্ভুত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে—ওয়াশিংটন ও বেইজিং বহু বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও হরমুজ প্রণালী আবার সচল করা এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আনা দুই পক্ষেরই স্বার্থের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
বেইজিংয়ের বৈঠকে ওয়াং ই যুদ্ধবিরতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, নতুন করে সংঘাত বাড়ানো বিপজ্জনক হবে এবং আলোচনার পথ খোলা রাখাই সবচেয়ে জরুরি। চীন দীর্ঘদিন ধরেই এই সংঘাতকে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করছে। বেইজিং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপকে বৈধ মনে করছে না। একই সঙ্গে চীন ইরানের প্রতিটি পদক্ষেপকেও প্রকাশ্যে নিঃশর্ত সমর্থন করছে না। এই ভারসাম্যটাই এখন চীনের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক কৌশল।
চীন একদিকে ইরানের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদার, অন্যদিকে সে নিজেকে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার পক্ষের শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার ঘটনাকে বেইজিং বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে দেখিয়েছে এবং এটিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে শক্তির দাপটের দিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার সঙ্গে মিলে চীন হরমুজ প্রণালীতে ইরানের পদক্ষেপের নিন্দা জানানো প্রস্তাব আটকে দিয়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে চীন দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ বন্ধ রাখতে চায়। বরং চীনের মূল লক্ষ্য হলো—ইরানকে পুরোপুরি হারিয়ে না দিয়ে, আবার জলপথও বন্ধ না রেখে, এমন একটি সমাধান খোঁজা যাতে বাণিজ্য ও জ্বালানি প্রবাহ স্বাভাবিক হয়।
ইরানের দিক থেকে দেখলে, আরাগচির বেইজিং সফর ছিল প্রয়োজনীয় এবং কৌশলগত। বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি অনেকাংশে চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। চীন ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের একটি, এবং প্রায়ই ছাড়মূল্যে ইরানি তেল কিনে থাকে। এই তেল বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ আবার চীনা পণ্য ও সেবা কেনার দিকে যায়। ২০২১ সালে দুই দেশের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই হওয়ার পর অবকাঠামো, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও গভীর হয়েছে।
তাই ইরানের জন্য চীনের ভূমিকা শুধু অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেহরান সম্ভবত জানতে চাইছে, হরমুজ প্রণালীতে চাপ কমালে চীন তাকে কতটা সমর্থন দেবে। ইরান যদি জাহাজ চলাচলে ছাড় দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কি নতুন শর্ত চাপাবে? জাতিসংঘে নতুন নিষেধাজ্ঞা এলে চীন কি ইরানের পাশে থাকবে? শি চিনপিং ও ট্রাম্পের আসন্ন বৈঠকে চীন কি এমন কোনো সমঝোতায় যাবে, যা তেহরানের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই আরাগচির সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, চীনও ইরানের কাছ থেকে কিছু প্রত্যাশা করছে। বেইজিং চায় না হরমুজ প্রণালী দীর্ঘদিন অচল থাকুক। কারণ এতে চীনের শিল্প, পরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে চীন চায় না ইরানের সরকার মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ুক। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলায় ইরান চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরি করে। অর্থাৎ চীন একসঙ্গে দুই লক্ষ্য পূরণ করতে চাইছে—ইরানকে ধরে রাখা এবং হরমুজকে খোলা রাখা।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মুদ্রা ও অর্থনৈতিক প্রভাব। ইরান তেল বাণিজ্যে চীনা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াতে আগ্রহ দেখিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের আধিপত্য কমাতে চীন দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজের মুদ্রার ব্যবহার বাড়াতে চায়। ফলে ইরান শুধু জ্বালানি সরবরাহকারী নয়, চীনের বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলেরও অংশ।
এই সংকট চীনের জন্য সুযোগও তৈরি করেছে। ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সেই অভিজ্ঞতা এখন চীনকে আরও বড় কূটনৈতিক পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে। যদি বেইজিং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে চীন নিজেকে শুধু আঞ্চলিক শক্তি নয়, বৈশ্বিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি উৎপাদক দেশগুলোর ওপরও চীনের প্রভাব বাড়বে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোও চীনকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখবে।
তবে পথ সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় মিত্ররা হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করেছে বলে জানা গেছে। জার্মানির সংবাদ সংস্থা ডিপিএর তথ্য অনুযায়ী, এতে ইরানকে জাহাজে হামলা বন্ধ করা, সমুদ্র মাইন সরানো এবং চলাচলের জন্য ফি নেওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রস্তাবটি এমনভাবে সংশোধন করা হচ্ছে, যাতে রাশিয়া ও চীনের সমর্থন পাওয়া যায়।
এখানেই চীনের সিদ্ধান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যদি চীন প্রস্তাবের পক্ষে যায়, তাহলে ইরানের ওপর চাপ বাড়বে। যদি চীন বিরোধিতা করে, তাহলে তেহরান কূটনৈতিক আশ্রয় পাবে, কিন্তু হরমুজ সংকট দীর্ঘায়িত হতে পারে। আর যদি চীন একটি মধ্যপথ তৈরি করে, যেখানে ইরান মুখরক্ষা করে ছাড় দিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রও অর্থনৈতিক স্বস্তি পায়, তাহলে সেটি হতে পারে বর্তমান যুদ্ধের মোড় ঘোরানোর মতো ঘটনা।
তবু ঝুঁকি অনেক। অঞ্চলে সামরিক সরঞ্জামের উপস্থিতি বিপুল, পারস্পরিক সন্দেহ গভীর, আর ভুল হিসাবের আশঙ্কা সবসময়ই থাকে। একটি জাহাজে হামলা, একটি ভুল সংকেত, কিংবা কোনো পক্ষের অতিরিক্ত চাপ পুরো আলোচনাকে ভেঙে দিতে পারে। তাই কূটনীতি যত জরুরি, ততই ভঙ্গুর।
সব মিলিয়ে আরাগচির বেইজিং সফর প্রমাণ করে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ আর শুধু দুই দেশের সংঘাত নয়। এটি এখন বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। চীন এখানে দর্শক নয়; বরং সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী, স্বার্থরক্ষাকারী এবং প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি—সব ভূমিকাতেই হাজির।
হরমুজ প্রণালী খুলবে কি না, যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে কি না, তেহরান আলোচনায় ফিরবে কি না, আর ওয়াশিংটন কতটা ছাড় দেবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন অনেকটাই বেইজিংয়ের কূটনৈতিক দক্ষতার ওপর নির্ভর করছে। আগামী ১৪ ও ১৫ মে শি চিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক তাই শুধু দুই নেতার বৈঠক নয়; এটি হতে পারে যুদ্ধ, জ্বালানি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের মুহূর্ত।
সিভি/এইচএম

