ভারত ও তুরস্কের সম্পর্ক গত এক বছরে যে পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল, তা দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্যই অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল। কাশ্মীর, পাকিস্তান, সামরিক সহযোগিতা, পর্যটন বয়কট এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য করিডর—সব মিলিয়ে দিল্লি ও আঙ্কারার মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ছিল দ্রুত। তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগ ইঙ্গিত দিচ্ছে, দুই দেশ আবারও সম্পর্ক মেরামতের পথে হাঁটতে চাইছে।
গত বছর আঙ্কারাভিত্তিক একটি তুর্কি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মতো ভারত–তুরস্ক সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। সেখানে দুই দেশের বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা অংশ নেন। সম্মেলনের পরিবেশ ছিল আশাব্যঞ্জক। দুই পক্ষই ইতিহাসের কথা স্মরণ করে। ভারতের পক্ষ থেকে তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার সমর্থনের প্রসঙ্গ আসে। আবার দুই ভাষার কিছু মিল থাকা শব্দের কথাও বলা হয়, যেমন ‘হাওয়া’ ও ‘কিসমত’। এসব আলোচনা থেকে মনে হয়েছিল, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দূরত্ব সত্ত্বেও দুই দেশ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে আগ্রহী।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভারত ও তুরস্ক উভয়ই উদীয়মান শক্তি। দুই দেশের রাজনৈতিক অবস্থান অনেক সময় ভিন্ন হলেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় পরিবেশ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
পরিস্থিতি বদলে যায় কাশ্মীরের এক হামলার পর। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে কাশ্মীরে হামলায় ২৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। এ ঘটনার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রূপ নেয়। ভারত ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর মাধ্যমে পাকিস্তান এবং পাকিস্তান-প্রশাসিত কাশ্মীরে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ করা স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। এই পর্যায়ে তুরস্ক প্রকাশ্যে পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন জানায়। এখান থেকেই ভারত–তুরস্ক সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যেতে থাকে।
ভারতের গণমাধ্যমের একটি অংশ তুরস্ককে ভারতের প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করে। অভিযোগ ওঠে, তুরস্ক নাকি পাকিস্তানে সামরিক সরঞ্জাম ও সহায়তা পাঠিয়েছে। তবে তুর্কি কর্মকর্তারা দাবি করেন, পাকিস্তানে কোনো অতিরিক্ত সহায়তা পাঠানো হয়নি। তাদের বক্তব্য ছিল, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বহু পুরোনো এবং তা নতুন কোনো ঘটনা নয়। নিয়মিত বন্দর সফর বা কার্গো উড়ানকে নতুন সামরিক সহায়তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে আঙ্কারার পক্ষ থেকে বলা হয়।
তুরস্ক কাশ্মীর হামলার বিষয়ে যৌথ তদন্তের আহ্বান জানায় এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে। ভারতের দৃষ্টিতে এই অবস্থান ছিল অস্বস্তিকর। কারণ কাশ্মীরকে ভারত নিজের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখে, আর তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের অবস্থানের প্রতি সহানুভূতিশীল।
এরপর কূটনৈতিক টানাপোড়েন অর্থনীতি ও পর্যটনেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ভারতে তুরস্কবিরোধী পর্যটন বয়কটের ডাক ওঠে। তুর্কি ব্যবসায়িক স্বার্থও চাপের মুখে পড়ে। ভারত তুর্কি প্রতিষ্ঠান চেলেবি এয়ারপোর্ট সার্ভিসেস ইন্ডিয়ার নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিল করে। প্রতিষ্ঠানটি দিল্লি, মুম্বাই ও বেঙ্গালুরুসহ ভারতের নয়টি বিমানবন্দরে কাজ করত। ভারতের পক্ষ থেকে জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখানো হয়। এরপর এয়ার ইন্ডিয়া তুর্কি টেকনিকের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনার কথা জানায়।
প্রায় এক বছর দুই দেশের সম্পর্ক কার্যত স্থবির হয়ে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লির অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের দিকে ভারত অপ্রত্যাশিতভাবে তুরস্ককে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার দ্বাদশ দফার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। তুরস্কের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বেরিস একিনজি আলোচনায় অংশ নিতে যান। ভারতের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিমবিষয়ক সচিব সিবি জর্জ আলোচনায় সহসভাপতিত্ব করেন।
এই বৈঠককে দুই পক্ষই ইতিবাচকভাবে দেখেছে। ভারতীয় এক কর্মকর্তা জানান, সম্পর্ক মেরামতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার মতে, কথা বলা বন্ধ রাখার চেয়ে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া ভালো। কারণ নীরবতা ভুল বোঝাবুঝি আরও গভীর করতে পারে। তুর্কি কর্মকর্তারাও একই ধরনের সুরে বলেছেন, আলোচনার পরিবেশ ভালো ছিল এবং দুই পক্ষই সুস্থ যোগাযোগ বজায় রাখতে আগ্রহী।
এই পরিবর্তনের পেছনে তুরস্কের সংযত আচরণও ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ভারতীয় রাজনৈতিক মহলের কিছু তীব্র মন্তব্য কিংবা ভারতের পক্ষ থেকে বিমান ও পর্যটন খাতে নেওয়া পদক্ষেপের পরও তুরস্ক পাল্টা কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। আঙ্কারা পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত না করে অপেক্ষার নীতি নেয়। সম্ভবত সেটিই পরে আলোচনার পথ খুলতে সাহায্য করেছে।
পর্যটন খাতের ক্ষতি ছিল দৃশ্যমান। ২০২৫ সালে তুরস্কে ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা ৩ লাখ ৩০ হাজার থেকে কমে ২ লাখ ৫০ হাজারে নেমে আসে। প্রায় ২৫ শতাংশ পতনের পেছনে পর্যটন বয়কট বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতীয় পর্যটকদের একটি বড় অংশ তুরস্কে বিয়ে, মধুচন্দ্রিমা ও অবকাশ যাপনের জন্য যেত। তবে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আভাস পাওয়ায় ভারতীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ বছর পর্যটন আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও টানাপোড়েনের প্রভাব পড়েছে, যদিও সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্য ৯০০ কোটি ডলার থেকে কমে ৭৫০ কোটি ডলারে নেমে আসে। পতনের হার ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ। তারপরও বাণিজ্য ভারসাম্য ভারতের পক্ষে রয়ে গেছে। তুরস্ক ভারত থেকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে, যার মধ্যে রয়েছে কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য, বস্ত্র, রাসায়নিক, গাড়ি ও যন্ত্রাংশ-সংশ্লিষ্ট উপকরণ।
এখানেই ভারতের বাস্তববাদী হিসাব স্পষ্ট। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও তুরস্ককে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে রাখা ভারতের জন্য সুবিধাজনক নয়। তুরস্ক ইউরোপ, মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। বর্তমান বিশ্বে বাণিজ্যপথ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহ শৃঙ্খল নতুন করে সাজানো হচ্ছে। এই বাস্তবতায় দিল্লি হয়তো বুঝতে পারছে, আঙ্কারার সঙ্গে সীমিত হলেও কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন।
আরেকটি বড় বিষয় হলো আঞ্চলিক যোগাযোগ করিডর। ২০২৩ সালে ভারত ভারত–মধ্যপ্রাচ্য–ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডরের কাঠামো সামনে আনে। পরিকল্পনা ছিল, সমুদ্রপথে সংযুক্ত আরব আমিরাত পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে সৌদি আরব, জর্ডান ও ইসরায়েল হয়ে ইউরোপে পৌঁছানো। তুরস্ক এই প্রকল্পকে সন্দেহের চোখে দেখেছিল। আঙ্কারার ধারণা ছিল, এই উদ্যোগে তুরস্ককে পাশ কাটানো হচ্ছে। তাই তুরস্ক ইরাকভিত্তিক বিকল্প প্রস্তাবকে সমর্থন দেয়।
কিন্তু ২০২৩ সালের পর থেকে সেই করিডর প্রকল্প নানা অনিশ্চয়তায় পড়ে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সম্পর্কে টানাপোড়েন, ইয়েমেন ইস্যু, গাজা যুদ্ধ এবং ইসরায়েল–সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের প্রক্রিয়া আটকে যাওয়া পুরো পরিকল্পনাকে দুর্বল করে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে হরমুজ প্রণালির ওপর চাপ এবং ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা আঞ্চলিক বাণিজ্যপথ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারত বিকল্প পথ খুঁজছে। তুরস্ক নিজেকে মধ্য করিডরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরছে। এই করিডর পূর্ব এশিয়াকে আজারবাইজান, জর্জিয়া ও আর্মেনিয়ার মাধ্যমে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। ভারতীয় কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, তারা একক কোনো করিডরের ওপর নির্ভর করতে চান না। তাই নতুন যোগাযোগ প্রকল্পে আগ্রহ বাড়ছে। এখানেও তুরস্কের গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসছে।
তবে সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্ন রয়ে গেছে কাশ্মীর। তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করে আসছে। আঙ্কারা মনে করে, কাশ্মীরিদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার থাকা উচিত। অন্যদিকে ভারত এই অবস্থানকে নিজের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অগ্রহণযোগ্য মনে করে।
তবু ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান কাশ্মীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেননি। এটিকে ভারতের প্রতি একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের সংকটের পর বিষয়টি আবার তার বক্তব্যে ফিরে আসে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে তিনি বলেন, কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত সংলাপের মাধ্যমে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব এবং কাশ্মীরি জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতে।
ভারতের দৃষ্টিতে তুরস্ক যদি কাশ্মীর প্রশ্নে প্রকাশ্য অবস্থান কিছুটা নরম করে এবং আরও কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করে, তাহলে সম্পর্ক মজবুত করা সহজ হবে। দিল্লি হয়তো চায় না তুরস্ক পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করুক; বরং চায়, তুরস্ক যেন ভারতের সংবেদনশীল বিষয়গুলো প্রকাশ্যে এমনভাবে না তোলে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আবার সংকটে ফেলে।
সব মিলিয়ে ভারত–তুরস্ক সম্পর্ক এখন এক সতর্ক পুনর্মিলনের পর্যায়ে আছে। এটি কোনো আবেগনির্ভর বন্ধুত্ব নয়, বরং বাস্তব স্বার্থের ভিত্তিতে গড়া নতুন হিসাব। বাণিজ্য, পর্যটন, আঞ্চলিক করিডর, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য—সবকিছুই দুই দেশকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনছে।
তবে সম্পর্ক কতটা এগোবে, তা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, কাশ্মীর নিয়ে তুরস্ক কতটা সংযত ভাষা ব্যবহার করে। দ্বিতীয়ত, ভারত তুরস্ককে কেবল পাকিস্তানের মিত্র হিসেবে দেখে কি না। তৃতীয়ত, বাণিজ্য ও যোগাযোগ করিডর নিয়ে দুই দেশ বাস্তবসম্মত সহযোগিতায় যেতে পারে কি না। চতুর্থত, গণমাধ্যম ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপ দুই দেশের কূটনীতিকে কতটা প্রভাবিত করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বলা যায়, দিল্লি ও আঙ্কারা কেউই পূর্ণ সংঘাতে যেতে চায় না। বরং মতভেদ রেখে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে। বিশ্বরাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় এটাই হয়তো সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কূটনীতি—যেখানে বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বীর সীমানা অনেক সময় একই সঙ্গে থাকে, আর স্থায়ী স্বার্থই শেষ পর্যন্ত নীতিনির্ধারণের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।

