পারস্য উপসাগর ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুধু জ্বালানি বাজারকেই অস্থির করছে না; এর প্রভাব এখন পৌঁছে গেছে বিশ্বশিল্পের গভীর স্তরে। বিশেষ করে সালফিউরিক অ্যাসিডের বাজারে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা খাদ্য উৎপাদন, ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণ, কাগজশিল্প, ব্যাটারি, পানি শোধন এবং অর্ধপরিবাহী চিপ উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতকে চাপের মুখে ফেলছে।
সালফিউরিক অ্যাসিডকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রাসায়নিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণ চোখে এটি একটি শিল্প রাসায়নিক মাত্র মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে আধুনিক অর্থনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও অবকাঠামো এর ওপর নির্ভরশীল। সার উৎপাদন থেকে শুরু করে তামা আলাদা করা, ইস্পাত পরিষ্কার করা, কাঠের মণ্ড তৈরি, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা, রাবার শক্তিশালী করা, এমনকি পৌর পানি শোধন ব্যবস্থাতেও এই অ্যাসিড ব্যবহৃত হয়।
এই রাসায়নিকের আরেকটি বড় ব্যবহার রয়েছে ব্যাটারি ও অর্ধপরিবাহী চিপ উৎপাদনে। ফলে সালফিউরিক অ্যাসিডের ঘাটতি শুধু কৃষি বা খনিশিল্পের সমস্যা নয়; এটি প্রযুক্তি, পরিবহন, জ্বালানি রূপান্তর এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
সংকটের মূল কারণ দুটি। প্রথমত, পারস্য উপসাগরে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সালফার সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বের সালফারের বড় একটি অংশ আসে ওই অঞ্চলের তেল শোধনাগার ও গ্যাস কারখানা থেকে। দ্বিতীয়ত, চীন নতুন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। চীন বিশ্বের অন্যতম বড় সালফার উৎপাদনকারী দেশ। দেশটি নিজস্ব খাদ্য নিরাপত্তা ও সার বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য রপ্তানি সীমিত করেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সালফার ও সালফিউরিক অ্যাসিডের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় আছে চিলি ও ইন্দোনেশিয়া। ইন্দোনেশিয়া মধ্যপ্রাচ্য থেকে বড় পরিমাণ সালফার আমদানি করে। দেশটির নিকেল খনিগুলো ইতিমধ্যে উৎপাদন কমাতে শুরু করেছে বলে ধাতুশিল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। নিকেল বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি ও স্টেইনলেস স্টিল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ধাতু।
আর্গাসের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বোমা হামলা শুরু করার সময় থেকেই ইন্দোনেশিয়ায় সালফারের দাম বাড়তে থাকে। এরপর থেকে দাম ৮০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এই বৃদ্ধি শুধু খনিশিল্পের ব্যয় বাড়াচ্ছে না; বৈদ্যুতিক গাড়ির সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ব্যাটারি উৎপাদনেও চাপ তৈরি করছে।
চিলির অবস্থাও উদ্বেগজনক। দেশটি বিশ্বের শীর্ষ তামা উৎপাদনকারী দেশ। বিশাল আকরিক স্তূপ থেকে তামা আলাদা করতে চিলি বিপুল পরিমাণ সালফিউরিক অ্যাসিড ব্যবহার করে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে সেখানে সালফিউরিক অ্যাসিডের দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। চিলি বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি সালফিউরিক অ্যাসিড আমদানি করে। তাই এই বাজারে দীর্ঘমেয়াদি চাপ থাকলে বৈশ্বিক তামা উৎপাদনেও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
তামা আজকের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। বড় তথ্যকেন্দ্র, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, সার্কিট বোর্ড, রূপান্তরক, বাড়ির তার, পানির পাইপ এবং গাড়ি—সবখানেই তামার ব্যবহার আছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি আসার আগেও একটি সাধারণ আমেরিকান গাড়িতে এক মাইলের বেশি তামার তার ব্যবহৃত হতো। ফলে তামার দাম আরও বাড়লে তার প্রভাব নির্মাণ, বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি ও পরিবহন খাতে ছড়িয়ে পড়বে।
সালফিউরিক অ্যাসিডের আরেকটি বড় সমস্যা হলো এটি সংরক্ষণ ও পরিবহন করা কঠিন। এটি অত্যন্ত ক্ষয়কারী রাসায়নিক। তাই সাধারণ পণ্যসামগ্রীর মতো সহজে এটি মজুত করা যায় না। বিশেষ ট্যাংক, সতর্ক পরিবহন ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পরিচালনা পদ্ধতি দরকার। ভ্যালরের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কুনাল সিনহার মতে, ব্যবহারকারীরা সাধারণত কয়েক সপ্তাহের বেশি সরবরাহ মজুত রাখেন না। ভালো পরিস্থিতিতে হয়তো এক মাসের মতো সরবরাহ থাকে। তাই রেল ধর্মঘট, সমুদ্রপথ বন্ধ হওয়া বা হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত পথ অচল হয়ে পড়া—যেকোনো বিঘ্ন দ্রুত বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।
এই কারণেই বর্তমান পরিস্থিতি এত স্পর্শকাতর। সালফার ও সালফিউরিক অ্যাসিডের সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা ঝুঁকি একসঙ্গে তৈরি হলে বাজারে দ্রুত ঘাটতি দেখা দেয়। তখন শুধু দাম বাড়ে না; উৎপাদন কমে যায়, মজুত ফুরিয়ে আসে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হয়।
সালফার ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্রেইগ জর্গেনসন সতর্ক করেছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে যেখানে মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং ফসফেটের মতো কৃষিপণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উৎপাদন ধীর হয়ে পড়ছে। এই সতর্কতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ফসফেট সার খাদ্য উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য। সারের উৎপাদন ব্যাহত হলে কৃষি ব্যয় বাড়বে, ফলন ঝুঁকিতে পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যের দামেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র আপাতত তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। দেশটির নিজস্ব তেল শোধনাগার ও ধাতু গলানোর কারখানা কিছু চাহিদা পূরণ করে। বাকি অংশের বড় উৎস মেক্সিকো ও কানাডা। কানাডার আলবার্টা অঞ্চলে কম দামের সময় সালফার পিরামিড আকৃতিতে বিশাল পরিমাণে মজুত রাখা হয়েছিল। এই মজুত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিছুটা সুরক্ষা তৈরি করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। বৈশ্বিক তামা উৎপাদন কমে গেলে এবং দাম রেকর্ড উচ্চতার চেয়েও বাড়লে তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও পড়বে। কারণ আধুনিক অবকাঠামো, তথ্যকেন্দ্র, গাড়ি, বাড়িঘর এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় তামার চাহিদা অত্যন্ত বেশি।
এই সংকটের মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান আবার লাভবানও হচ্ছে। খনিশিল্প উদ্যোক্তা রবার্ট ফ্রিডল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান আইভানহো মাইনস কঙ্গোর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় তামা গলানোর কারখানা চালু করেছে। কামোয়া-কাকুলা গলন কারখানাটি সালফিউরিক অ্যাসিডের বাড়তি দামের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ডলার আয় করছে বলে ফ্রিডল্যান্ড বুধবার প্রতিষ্ঠানটির ত্রৈমাসিক ফলাফল প্রকাশের সময় জানান। তার মতে, বেশি খরচ করে দক্ষ গলন কারখানা তৈরি করার সুফল এখন পাওয়া যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে সালফিউরিক অ্যাসিড সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতি কতটা আন্তঃনির্ভরশীল। একটি রাসায়নিকের সরবরাহে বাধা পড়লে তার ধাক্কা কৃষি, খনি, প্রযুক্তি, জ্বালানি, নির্মাণ ও পানি ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। পারস্য উপসাগরের যুদ্ধ পরিস্থিতি তাই শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক উৎপাদনব্যবস্থা ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় সতর্কবার্তা।
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক ও কাঁচামালের সরবরাহকে একক অঞ্চল বা সীমিত বাণিজ্যপথের ওপর নির্ভরশীল রাখা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। দেশগুলোকে বিকল্প সরবরাহ উৎস, নিরাপদ মজুত, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ এবং আঞ্চলিক উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে যেতে হবে। না হলে হরমুজ প্রণালি বা পারস্য উপসাগরের মতো কৌশলগত অঞ্চলের প্রতিটি উত্তেজনা বিশ্ববাজারকে নতুন করে অস্থির করে তুলবে।

