ইরানের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—দেশটির প্রকৃত সিদ্ধান্ত কোথায় নেওয়া হচ্ছে? প্রকাশ্য মঞ্চে তিনি নেই। জনসমক্ষে বক্তব্য দিচ্ছেন না। তার অবস্থান নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। তবু মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আড়াল থেকেই যুদ্ধ, কূটনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার কৌশলে প্রভাব রাখছেন। একই বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার অনুপস্থিতি ইরানের ক্ষমতাকাঠামোকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা বাইরে থেকে যতটা কঠোর ও কেন্দ্রীভূত মনে হচ্ছে, ভেতরে ততটাই বিভক্ত ও অস্বচ্ছ। ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হন বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে মোজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতৃত্বে আসেন। আল জাজিরার ৮ মার্চ ২০২৬ সালের প্রতিবেদনেও তার নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার কথা প্রকাশিত হয়।
কিন্তু ক্ষমতার আসনে বসার পরও মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে আসেননি। এ অনুপস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। একদিকে সরকারি পক্ষ বলছে, তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন। অন্যদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, তার আঘাত গুরুতর ছিল এবং তিনি এখনো সীমিত যোগাযোগের মাধ্যমে নির্দেশনা দিচ্ছেন। আনাদোলু ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বলা হয়েছে, তার আঘাত ছিল পা, কোমর ও কানের পাশে; তবে তিনি এখন সুস্থ আছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
মার্কিন মূল্যায়ন অনুযায়ী, মোজতবা খামেনি কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার করছেন না। নিরাপত্তার ঝুঁকি এড়াতে তিনি সরাসরি সাক্ষাৎ, বিশ্বস্ত বার্তাবাহক অথবা খুব সীমিত যোগাযোগপদ্ধতির ওপর নির্ভর করছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এ ধরনের যোগাযোগপদ্ধতি ইরানের নেতৃত্বকে একদিকে সুরক্ষিত রাখলেও অন্যদিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে ধীর, অস্পষ্ট ও বহুস্তরীয় করে তুলতে পারে। কারণ, যুদ্ধক্ষেত্র ও কূটনৈতিক আলোচনায় দ্রুত নির্দেশনা অনেক সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই কারণেই প্রশ্ন উঠছে—মোজতবা খামেনি কি সত্যিই প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, নাকি শুধু বড় সিদ্ধান্তে তার অনুমোদন নেওয়া হচ্ছে? মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, তিনি আলোচনার সামগ্রিক দিকনির্দেশনায় যুক্ত আছেন। তবে প্রতিটি দৈনন্দিন সামরিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত তার কাছ থেকে আসছে—এমন স্পষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক আলি ভায়েজের মন্তব্য অনুযায়ী, তিনি সরাসরি আলোচনার নেতৃত্ব না দিলেও বড় সিদ্ধান্তে তার চূড়ান্ত অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এখানেই ইরানের ক্ষমতার আরেকটি স্তর সামনে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা এখন দৈনন্দিন কার্যক্রমে বড় ভূমিকা রাখছেন। গালিবাফকে ঘিরে বিশেষ আগ্রহের কারণও আছে। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে প্রথম দফার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানতে চান, ইরানের পক্ষে প্রকৃত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কার হাতে। অন্তত একটি উপসাগরীয় দেশ তখন ওয়াশিংটনকে জানায়, গালিবাফ এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন।
এরপর ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রথম দফার আলোচনায় ইরানি পক্ষের নেতৃত্ব দেন গালিবাফ। তবে সেই বৈঠক কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। দ্বিতীয় দফার আলোচনাও আর অনুষ্ঠিত হয়নি। এই অচলাবস্থা দেখায়, ইরানের শাসনব্যবস্থার ভেতরে নেতৃত্বের প্রশ্নটি শুধু আনুষ্ঠানিক নয়; এটি আলোচনার ফলাফলকেও প্রভাবিত করছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এখানেই বড় কূটনৈতিক সমস্যা তৈরি হয়েছে। সংঘাত বন্ধ করতে হলে ওয়াশিংটনকে জানতে হবে, তেহরানের কোন পক্ষ কথা বললে তা বাস্তব সিদ্ধান্তে পরিণত হবে। কিন্তু মোজতবা খামেনি আড়ালে, বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী সক্রিয়, গালিবাফ আলোচনায় দৃশ্যমান, আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিভক্ত। এমন অবস্থায় এক পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা হলেও অন্য ক্ষমতাকেন্দ্র তা মানবে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন।
সামরিক দিক থেকেও ইরান পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি বলে মার্কিন মূল্যায়নে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা রক্ষা পেয়েছে। সাম্প্রতিক আরেক মূল্যায়নে এই সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বলা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি ইরানকে মাটির নিচে চাপা পড়া উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা উদ্ধার করার সময় দিচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক দিকটি আরও জটিল। সিআইএর পৃথক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, চলমান মার্কিন অবরোধ সত্ত্বেও ইরানের অর্থনীতি আরও চার মাস পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। তবে আরেকজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার মূল্যায়ন আরও কঠোর। তার মতে, অবরোধে ইরানের বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছে; নৌবাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত; শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে; সামরিক বাহিনী দুর্বল; আর সবচেয়ে বেশি ভুগছে সাধারণ মানুষ। দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী ঘিরে চলমান অচলাবস্থা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান—কোনো পক্ষের জন্যই সহজ নয়।
এ পরিস্থিতিতে মোজতবা খামেনির নীরবতা দুইভাবে পড়া যায়। প্রথমত, এটি নিরাপত্তাজনিত কৌশল হতে পারে। বড় হামলার পর একজন নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে প্রকাশ্যে আনা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটি রাজনৈতিক কৌশলও হতে পারে। জনসমক্ষে না এসে তিনি হয়তো নিজের অবস্থানকে রহস্যময় রাখছেন, যাতে শাসনব্যবস্থার ভেতরের বিরোধ সরাসরি দৃশ্যমান না হয়।
তবে এই নীরবতা দীর্ঘ হলে তা দুর্বলতার ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হতে পারে। ইরানের মতো ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতার উপস্থিতি শুধু প্রশাসনিক নয়; এটি প্রতীকী শক্তিরও উৎস। জনগণ, সামরিক বাহিনী, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মিত্রগোষ্ঠীগুলোর কাছে নেতৃত্বের দৃশ্যমানতা গুরুত্বপূর্ণ। মোজতবা খামেনি যত দিন আড়ালে থাকবেন, তত দিন তার ক্ষমতার বাস্তব পরিধি নিয়ে প্রশ্ন থাকবে।
সব মিলিয়ে ইরান এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র, অর্থনীতি, কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব একসঙ্গে কাজ করছে। মোজতবা খামেনি হয়তো আড়াল থেকেই প্রভাব রাখছেন। কিন্তু তার অনুপস্থিতি ইরানের শাসনব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করার বদলে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—কার সঙ্গে কথা বললে যুদ্ধ থামবে? আর ইরানের জন্য বড় প্রশ্ন হলো—যে নেতৃত্ব চোখের আড়ালে, সে কি দীর্ঘ সংকটে রাষ্ট্রকে একসঙ্গে ধরে রাখতে পারবে?

