তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে থালাপতি বিজয়ের হাত ধরে। অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা এই জনপ্রিয় নেতা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরই বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি শুধু প্রতীকী নেতৃত্ব দিতে আসেননি; বরং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পথেই হাঁটতে চান।
রোববার দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন বিজয়। তার প্রথম দিনের সিদ্ধান্তগুলো থেকেই স্পষ্ট, নতুন সরকার জনসেবামুখী ইস্যুগুলোকেই অগ্রাধিকার দিতে চাইছে।
সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত এসেছে বিদ্যুৎ খাতে। দায়িত্ব নিয়েই তিনি ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রস্তাবে অনুমোদন দেন। নির্বাচনের সময় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, সেটির বাস্তব প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
তামিলনাড়ুর মতো শিল্প ও জনবহুল রাজ্যে বিদ্যুতের খরচ বহু পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের সুবিধার দাবি জানিয়ে আসছিল। ফলে বিজয়ের এই সিদ্ধান্ত জনগণের মধ্যে দ্রুত ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে।
শুধু অর্থনৈতিক স্বস্তিই নয়, নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও নিজের প্রথম দিনের সিদ্ধান্তে গুরুত্ব দিয়েছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি নারীদের সুরক্ষার জন্য একটি বিশেষ বাহিনী গঠনের নথিতেও স্বাক্ষর করেছেন।
তামিলনাড়ুসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নারী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। তাই নতুন সরকারের এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাইরে সামাজিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিজয় বোঝাতে চাইছেন, তার প্রশাসনে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রশ্নে আলাদা গুরুত্ব থাকবে।
এর পাশাপাশি রাজ্যে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে প্রতিটি জেলায় ‘মাদকবিরোধী ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাবও অনুমোদন করেছেন তিনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণদের মধ্যে মাদকসংক্রান্ত উদ্বেগ বাড়তে থাকায় বিষয়টি নির্বাচনী প্রচারণাতেও বড় ইস্যু হয়ে উঠেছিল। বিজয় তখনই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।
শপথের পর দেওয়া বক্তব্যে আগের ডিএমকে সরকারের কঠোর সমালোচনাও করেছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশ করা হবে। এর মাধ্যমে জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে আগের সরকারের সময়ে কত ঋণ তৈরি হয়েছে এবং নতুন সরকার কী ধরনের অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।
বিজয়ের দাবি, আগের সরকার প্রায় ১০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা রেখে গেছে। এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ, নতুন সরকার শুরু থেকেই নিজেদের “স্বচ্ছতা” ও “জবাবদিহির” প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
ভাষণে বিজয় আরও বলেন, জনগণ যে আস্থা রেখে তাকে ক্ষমতায় এনেছে, সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করা হবে। তিনি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জানান, নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিটি অঙ্গীকার ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ের প্রথম দিনের সিদ্ধান্তগুলো মূলত একটি শক্ত বার্তা বহন করছে। তিনি চাইছেন জনগণের কাছে এমন একটি ভাবমূর্তি তৈরি করতে, যেখানে তাকে কেবল জনপ্রিয় অভিনেতা নয়, বরং কার্যকর প্রশাসক হিসেবেও দেখা হবে।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ডিএমকে ও এআইএডিএমকের আধিপত্য ছিল। সেই বাস্তবতায় নতুন একটি শক্তি হিসেবে উঠে এসে বিজয়ের সরকার গঠন অনেকের কাছেই ঐতিহাসিক ঘটনা। তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—জনপ্রিয়তার ঢেউকে তিনি কতটা কার্যকর প্রশাসনে রূপ দিতে পারেন।
প্রথম দিনের সিদ্ধান্তগুলো অন্তত এটুকু ইঙ্গিত দিচ্ছে, তামিলনাড়ুতে নতুন সরকার শুরু থেকেই দ্রুত ছন্দে খেলতে চাইছে।

