মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই দিনের সফরে বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে তাঁর মার্কিন প্রতিপক্ষ শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন। বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতির এই দুই নেতার আলোচ্যসূচির শীর্ষে রয়েছে ব্যবসা ও বাণিজ্য চুক্তি, তবে নেপথ্যে ইরানের বিষয়টিও বড় হয়ে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরানকে সামরিক সহায়তা দেওয়ায় চীন লাভবান হয়েছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক মডেলের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।
বেইজিংয়ের রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ওয়াং ইওয়েই বলেন, “[মার্কিন হামলার জবাবে] ইরানের সাহসী জবাব ট্রাম্পকে একটি শিক্ষা দিয়েছে। ট্রাম্প তথাকথিত ‘চুক্তির কৌশল’ দিয়ে চীনকে ব্ল্যাকমেল করতে পারবেন না, ইরান তো দূরের কথা।”
চীন হলো যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং তাইওয়ানকে নিয়ে উভয় দেশ তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।
ইরানকে দমন করতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে চীনে স্বাগত জানানো হয়েছে এবং এই উদীয়মান শক্তিটি শুধু নিষ্ক্রিয়ভাবে দর্শকের আসনে বসে থাকেনি।
সূত্র সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই সর্বপ্রথম জানায় যে, ইসরায়েলের সঙ্গে ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধের পর চীন ইরানকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে। ওই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার মাধ্যমে। আরো জানায়, ২০২৬ সালের হামলার ঠিক আগে চীন ইরানকে কামিকাজে ড্রোন সরবরাহ করেছিল। পরবর্তীতে নিউইয়র্ক টাইমস জানায় যে, এপ্রিল মাসে ইরানে কাঁধে বহনযোগ্য চীনা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানো হয়েছিল।
ফিনান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে যে, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে অত্যাধুনিক চীনা স্যাটেলাইট ব্যবহার করেছে।
অভিন্ন স্বার্থ
কিছু বিশেষজ্ঞ ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি “সুয়েজ মুহূর্ত”-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন, যারা এর সমান্তরাল হিসেবে ১৯৫৬ সালে খাল নিয়ে মিশরের সঙ্গে সেই সংঘাতকে দেখেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আধিপত্যের পতনের সূচনা করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমোস হখস্টাইন এই মাসে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করা সত্ত্বেও ইরান হরমুজ প্রণালী ‘চিরকালের জন্য’ নিয়ন্ত্রণ করবে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার করতে কিংবা দেশটির বিপুল পরিমাণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়েছে।
“ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানি সরকারকে উৎখাত করতে সফল হতো, তাহলে চীন আতঙ্কিত হয়ে পড়ত। কিন্তু বেইজিংও সতর্ক। তারা দেখছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী দেশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এবং তারা তাকে উস্কানি দিতে চায় না,” কুইন্সি ইনস্টিটিউটের পূর্ব এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক জেক ওয়ার্নার বলেন।
এই যুদ্ধের ফলে বেইজিং দেশের অভ্যন্তরে কিছু কৌশলগত বিজয় লাভ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যপ্রাচ্যে অভিযান পরিচালনার জন্য ওয়াশিংটনকে সাময়িকভাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে কিছু সামরিক সরঞ্জাম প্রত্যাহার করতে হয়েছিল।
কিন্তু চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো এবং এমিরেটস পলিসি সেন্টারের চায়না স্টাডিজ গবেষণা ইউনিটের প্রধান আহমেদ আবৌদৌহ বলেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি দেখার ক্ষেত্রে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।
“ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র একমত,” তিনি বলেন।
চীনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদার পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতা করে আসছে।
হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার জন্য চীনকে কূটনীতি ‘জোরদার’ করার আহ্বান জানানোর দুই দিন পর, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই-এর সঙ্গে আলোচনার জন্য বেইজিং সফর করেন।
এমিরেটস পলিসি সেন্টারের আবৌদৌহ বলেন, “সময়টা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। চীনারা আমেরিকানদের দেখাতে চায় যে, ইরানের ওপর তাদের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু তারা সত্যিই এই যুদ্ধের অবসান চায়।”
ট্রাম্প সোমবার বলেছেন যে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে এবং তিনি যুদ্ধ শেষ করার একটি ইরানি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। মঙ্গলবার, তিনি এই ধারণাটি প্রত্যাখ্যান করেন যে, যুদ্ধ শেষ করার জন্য তার চীনের সাহায্যের প্রয়োজন।
“আমার মনে হয় না ইরানের ব্যাপারে আমাদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন আছে। আমরা যেকোনো উপায়েই জিতব, শান্তিপূর্ণভাবে হোক বা অন্যভাবে,” তিনি গণমাধ্যমকে বলেন।
মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রিহলা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভাইজরির সিইও জেসি মার্কস বলেছেন যে, শি “ট্রাম্পকে ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ দেবেন না”, কিন্তু একটি পারমাণবিক চুক্তির “কার্যপ্রণালী” নিয়ে সাহায্য করতে পারেন।
মার্কস বলেছেন, “যদি এমন কোনো সুস্পষ্ট চুক্তি থাকে যেখানে চীন তার দৃষ্টিতে ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে পারে এবং কোনো রকম ঝামেলায় না জড়িয়েই তা বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে বেইজিং সম্ভবত সেই ভূমিকা পালন করবে।”
একটি চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান থেকে বিদ্যমান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণে সহায়তা করার বিষয়ে চীন ইতিমধ্যেই অনুসন্ধান চালিয়েছে।
চীনের অর্থনৈতিক দুর্বলতা
যুদ্ধ শেষ করার পেছনে চীনের নিজস্ব উদ্দেশ্য রয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এশিয়ার অর্থনীতিতে ঝাঁকুনি দিয়েছে, কারণ এই দেশগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাসের ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। রবিবার, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতীয়দের পেট্রোল ও ডিজেলের ব্যবহার কমাতে এবং সোনা কেনা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
“হরমুজ বন্ধের কারণে এই অঞ্চলের মার্কিন মিত্ররা—জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত—চীনের আগেই নতি স্বীকার করতে পারে,” ওয়ার্নার বলেছেন।
বেইজিং চায় ঐ দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দুর্বল হোক, কিন্তু তারা অর্থনৈতিক ক্ষতিতে খুশি নয়, কারণ তারা ঐ দেশগুলোর অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাদের অর্থনীতি বাণিজ্য ও রপ্তানিনির্ভর।
এই সংঘাত ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করেছে।
যুদ্ধের আগে ইরান তার মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ কিনত এবং মার্কিন কর্মকর্তারা সেই কেনাকাটার ওপর বিশেষভাবে নজর রেখেছেন। এই মাসের শুরুতে, চীন তার সংস্থাগুলোকে ইরানের অপরিশোধিত তেল ক্রয়কারী পাঁচটি তেল শোধনাগারের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার নির্দেশ দিয়েছে।
কিন্তু তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগের তুলনায় ইরানের সঙ্গে তার অর্থনৈতিক সম্পর্ক নগণ্য। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীনে চীনা নির্মাণ চুক্তির তৃতীয় বৃহত্তম প্রাপক ছিল সৌদি আরব, যার মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার।
এছাড়াও চীন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহের চতুর্থ বৃহত্তম উৎস। চীনা সংস্থাগুলো আবুধাবিতে অবস্থিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের খলিফা শিল্পাঞ্চলে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।
এদিকে, চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জাহাজ নির্মাণকারী বৃহৎ প্রতিষ্ঠান কসকো খলিফা বন্দরকে তার মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রস্থল হিসেবে গড়ে তুলেছে।
“চীন জিসিসিতে শত শত কোটি ডলার ঢেলেছে, যা ইরানকে দেওয়া অর্থের চেয়ে অনেক বেশি,” ওয়ার্নার বলেছেন।
সেই বিনিয়োগগুলো এখন আর তেমন আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে না। যুদ্ধটি উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগকে ওলটপালট করে দিয়েছে।
আবৌদৌহ বলেছেন যে, চীন উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুদ্ধে যোগদান করা থেকে বিরত রাখতে চায়।
“যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এটাই তাদের একমাত্র পার্থক্য, যারা উপসাগরীয় দেশগুলোকে এই সংঘাতে প্রবেশ করতে তদবির করেছে,” তিনি বলেন।
তিনি বলেছেন যে, চীন ২০২১ সালে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিটিকে আরও সম্প্রসারিত করতে চায়, যার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছিল।
তারা এটিকে এমন একটি মডেল হিসেবে দেখে, যা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের উড্ডয়ন বন্ধ হয়ে গেলে আরও বড় পরিসরে অনুকরণ করা যেতে পারে।
সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

