ইসরায়েলের রাজনীতিতে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নতুন করে বিক্ষোভে নেমেছেন শত শত মানুষ। তাদের মূল দাবি, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে যে নিরাপত্তা ব্যর্থতা ঘটেছিল, তার পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
শনিবার (১৩ জুন) তেল আবিবের হাবিমা স্কয়ারে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে প্রায় ৫০০ মানুষ অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, এত বড় একটি জাতীয় বিপর্যয়ের পরও সরকার এখন পর্যন্ত আইন অনুযায়ী স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেনি। বরং সরকার এমন একটি তদন্ত কাঠামোর কথা বলছে, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এত বড় নিরাপত্তা বিপর্যয়ের পর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে কীভাবে ঘটনা ঘটল, কোথায় ব্যর্থতা ছিল এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাদের মতে, এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সরকার সময়ক্ষেপণ করছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আয়ালা মেটজগার, যার শ্বশুর ইয়োরাম মেটজগার গাজায় অপহরণের পর নিহত হন, বলেন যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রশ্ন আরও বাড়ছে। তার ভাষায়, রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশনই ইসরায়েলের সবচেয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানী ব্যবস্থা, যেখানে স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সরকারের প্রস্তাবিত কাঠামো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করছে।
তিনি অভিযোগ করেন, প্রস্তাবিত কমিটিতে সরকার ও বিরোধী শিবিরের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত তদন্তের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। তার মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা সত্য উদঘাটনের বদলে দায় এড়ানোর পথ তৈরি করতে পারে।
সমাবেশে আরও আবেগঘন বক্তব্য দেন এরান লিটম্যান, যার মেয়ে ওরিয়া লিটম্যান হামাসের হামলার সময় একটি সঙ্গীত উৎসবে নিহত হন। তিনি বলেন, পরিবারের সদস্য হারানো মানুষদের কাছে এই তদন্ত কেবল রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
তার বক্তব্যে তিনি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনেরও সমালোচনা করেন। বিশেষ করে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির জন্য ভিন্ন নিয়মের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার মতে, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সবাইকে সমান দায়িত্ব নিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভ কেবল একটি তদন্ত কমিশন গঠনের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত সরকারের ওপর জনগণের আস্থার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। ২০২৩ সালের হামলার পর থেকে ইসরায়েলি সমাজের একটি বড় অংশ মনে করে, ঘটনার পেছনের ব্যর্থতাগুলো পুরোপুরি প্রকাশ না হলে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা পরিকল্পনাও দুর্বল থেকে যাবে।
সমাবেশ চলাকালে কিছুটা উত্তেজনাও দেখা যায়। এক সরকারপন্থি কর্মী বিক্ষোভস্থলে এসে ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে সরকারবিরোধী এক কর্মীর সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দ্রুত হস্তক্ষেপ করে এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর পরিস্থিতি শান্ত করে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এবং নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এই নতুন বিক্ষোভ নেতানিয়াহু সরকারের জন্য আরও চাপ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন নিয়ে সরকার যদি স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে আগামী দিনগুলোতে ইসরায়েলে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।

