যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনা, সংঘাত ও কূটনৈতিক তৎপরতার পর একটি সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের সময় নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট ভিন্নতা দেখা দিয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচিত শান্তি চুক্তি রোববার, ১৪ জুন স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। শনিবার দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে, সেটি স্বাক্ষরের জন্য প্রস্তুত এবং এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কারণ সাম্প্রতিক সংঘাতের পর হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে সম্ভাব্য কোনো চুক্তি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জন্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে ট্রাম্পের আশাবাদী ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিন্ন অবস্থান জানায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। তাদের দাবি, আলোচনায় অগ্রগতি হলেও সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে রোববার চুক্তি স্বাক্ষরের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই।
এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, ইরানের আলোচক দল এখনো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলে যে ধারণা দেওয়া হচ্ছে, তা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ইরানি পক্ষের মতে, আলোচনার কিছু জটিল বিষয় এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। বিশেষ করে চুক্তি বাস্তবায়নের পদ্ধতি, পারস্পরিক দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও সময় লাগতে পারে।
এদিকে মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও সেটি কার্যকর করার জন্য পরবর্তী ধাপে নতুন করে ৬০ দিনের আলোচনা প্রয়োজন হবে। সেই আলোচনায় চুক্তির বাস্তবায়ন কাঠামো, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য কারিগরি বিষয় নির্ধারণ করা হবে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের বক্তব্যের এই পার্থক্য কেবল সময়সূচি নিয়ে মতবিরোধ নয়, বরং আলোচনার কৌশলগত অবস্থানও তুলে ধরছে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে দ্রুত অগ্রগতির বার্তা দিতে চাইছে, সেখানে ইরান আরও সতর্ক ও নিয়ন্ত্রিত বার্তা দিচ্ছে যাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কোনো অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি না হয়।
আইআরজিসি আরও ইঙ্গিত দিয়েছে যে ট্রাম্পের ঘোষণার পেছনে রাজনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্বও থাকতে পারে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৪ জুন ট্রাম্পের জন্মদিন হওয়ায় তিনি ওই দিনটিকে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্যের দিন হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইতে পারেন। যদিও এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতার সম্ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বলে মনে হলেও চুক্তি স্বাক্ষরের নির্দিষ্ট সময় নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। দুই পক্ষই আলোচনার টেবিলে রয়েছে এবং সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে বলে ইঙ্গিত মিলছে। তবে শেষ পর্যন্ত কখন এবং কী শর্তে চুক্তি হবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি।

