আফ্রিকাকে নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় একটি কথা প্রায়ই সামনে আসে—মহাদেশটি নাকি স্থায়ী ঋণসংকটে ডুবে আছে। কিন্তু সংখ্যাগুলো একটু গভীরভাবে দেখলে চিত্রটি এত সরল থাকে না। বাস্তবে আফ্রিকা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত অঞ্চল নয়। বরং বৈশ্বিক সার্বভৌম ঋণের মোট পরিমাণের ৩ শতাংশেরও কম আফ্রিকার হাতে। অথচ এই কম ঋণ নিয়েও বহু আফ্রিকান দেশ আজ কঠিন ঋণচক্রে আটকে আছে। সমস্যাটি তাই শুধু ঋণের পরিমাণে নয়; বরং ঋণের ধরন, শর্ত, মুদ্রা, সুদের হার এবং বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা আফ্রিকাকে যেভাবে দেখে—সেখানেই মূল সংকট।
আফ্রিকার ঋণসংকটকে শুধু আর্থিক অব্যবস্থাপনা বা অতিরিক্ত ঋণগ্রহণের ফল হিসেবে দেখলে বাস্তব কারণ আড়ালে থেকে যায়। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের অংশ আফ্রিকার তুলনায় অনেক বড়। আফ্রিকার গড় ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৬৭ শতাংশ, যেখানে ইউরোপের ৮৮ দশমিক ৫ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রের ১২২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং জাপানের ২৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ। তবু আফ্রিকাকেই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।
এই বৈপরীত্যই আফ্রিকার সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। কম ঋণ নিয়েও আফ্রিকাকে বেশি সুদ দিতে হয়। কম দায় নিয়েও তাকে বেশি ঝুঁকির দেশ হিসেবে বিচার করা হয়। ফলে উন্নয়নের জন্য নেওয়া ঋণ অনেক সময় উন্নয়নের হাতিয়ার না হয়ে উল্টো অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করে।
১২-১৩ মে সেনেগালে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের কথা বলা হয়েছে, যেখানে দেশটির ক্রমবর্ধমান ঋণসংকট এবং এর পেছনে থাকা বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর বৈষম্য নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। এই সম্মেলনের তাৎপর্য এখানেই যে, আফ্রিকার ঋণ সমস্যাকে প্রথমবারের মতো আরও বিস্তৃতভাবে দেখা হচ্ছে—শুধু একটি দেশের অর্থনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার অসম নিয়মের ফল হিসেবে।
আফ্রিকার অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদি ও কম সুদের উন্নয়ন ঋণের পরিবর্তে এখন স্বল্পমেয়াদি ও ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আগে উন্নয়ন সহযোগিতা বা সহজ শর্তের ঋণ বেশি ছিল; এখন বাজারভিত্তিক ঋণের চাপ বেড়েছে। এর ফলে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ছোট হয়েছে, সুদের হার বেড়েছে এবং নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিই ধীরে ধীরে ঋণফাঁদকে আরও শক্ত করে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিদেশি মুদ্রায় ঋণ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা। আফ্রিকার অনেক দেশের নিজস্ব আর্থিক বাজার দুর্বল, আঞ্চলিক মুদ্রাব্যবস্থা খণ্ডিত এবং স্থানীয় মুদ্রায় দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সংগ্রহের সুযোগ সীমিত। ফলে তাদের প্রধানত মার্কিন ডলারে ঋণ নিতে হয়। কিন্তু রাজস্ব আসে স্থানীয় মুদ্রায়। যখন স্থানীয় মুদ্রার মান কমে যায়, তখন একই ঋণ পরিশোধ করতে সরকারের বেশি অর্থ লাগে। এই মুদ্রাগত অমিল আফ্রিকার অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা এলে এই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়। বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বাজারে অর্থ সরিয়ে নেয়, আফ্রিকা থেকে পুঁজি বেরিয়ে যায়, স্থানীয় মুদ্রার দর পড়ে যায় এবং ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়। এরপর সরকারগুলো ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো, শিল্পনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো খাতে বিনিয়োগ কমে যায়। এতে প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়, রাজস্ব কমে এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ সংকট নিজেই নতুন সংকট তৈরি করে।
ঋণফাঁদকে আরও গভীর করে তুলছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন। এসঅ্যান্ডপি, ফিচ ও মুডিজের মতো সংস্থাগুলো অধিকাংশ আফ্রিকান দেশকে তুলনামূলক কম রেটিং দেয়। এর ফলে আফ্রিকার দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নিতে হলে অনেক বেশি সুদ দিতে হয়। আফ্রিকার সার্বভৌম বন্ডে সাধারণত ৮ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হয়, যেখানে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ১ থেকে ৫ শতাংশ। এই অতিরিক্ত ব্যয় শুধু আর্থিক চাপ নয়; এটি উন্নয়ন সম্ভাবনাকেও সীমিত করে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী, ঋণমান সংস্থাগুলোর বিষয়গত মূল্যায়নের কারণে আফ্রিকান দেশগুলোর আনুমানিক ৭৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে বহু দেশে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি কিংবা শিল্পায়নের ভিত্তি শক্ত করা যেত। কিন্তু উন্নয়ন ব্যয়ের বদলে বড় অংশ চলে যাচ্ছে সুদ পরিশোধে।
পরিস্থিতি কতটা জটিল, তা বোঝা যায় সরকারি রাজস্বের ওপর সুদের চাপ দেখে। কয়েকটি আফ্রিকান দেশে সুদ পরিশোধেই সরকারি আয়ের ২০ শতাংশের বেশি খরচ হচ্ছে। নাইজেরিয়ায় এই হার প্রায় ৪০ শতাংশ এবং মিসরে ৭০ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ সরকার আয় করছে, কিন্তু সেই আয়ের বড় অংশ জনগণের জীবনমান উন্নয়নের বদলে ঋণদাতাদের পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। এটি শুধু বাজেটের সমস্যা নয়; এটি উন্নয়নের সুযোগ হারানোর সমস্যা।
আফ্রিকার ঋণসংকট তাই পরিমাণের সংকট নয়, ব্যয়ের সংকট। একই পরিমাণ ঋণ অন্য অঞ্চল কম সুদে পেলে আফ্রিকাকে তা পেতে হয় বেশি ব্যয়ে। এর ফলে যে প্রকল্পগুলো উন্নয়নের জন্য লাভজনক হতে পারত, উচ্চ সুদের কারণে সেগুলো আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঋণের দাম এত বেশি হলে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে অবাস্তব রিটার্ন প্রত্যাশা তৈরি হয়। এতে ঋণ টেকসই থাকে না।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ব্যক্তিগত ঋণদাতাদের ভূমিকা দ্রুত বেড়েছে। ২০০০ সালে আফ্রিকার বহিঋণের ১৭ শতাংশ ছিল ব্যক্তিগত ঋণদাতাদের হাতে; এখন তা ৪০ শতাংশের বেশি। এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেসরকারি ঋণ সাধারণত বেশি ব্যয়বহুল, সময়সীমা ছোট এবং পুনঃঅর্থায়নের ঝুঁকি বেশি। চলতি বছরে আফ্রিকার দেশগুলোকে রেকর্ড ৯০ বিলিয়ন ডলারের ঋণপ্রাচীরের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যার বড় অংশ পরিপক্ব ইউরোবন্ডের কারণে। অর্থাৎ পুরোনো ঋণ পরিশোধের জন্য আবার নতুন ঋণের দরকার হচ্ছে।
এদিকে আফ্রিকার অর্থনীতি শুধু ঋণের চাপে নয়, পুঁজি পাচারের কারণেও দুর্বল হচ্ছে। প্রতি বছর ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ অবৈধ আর্থিক প্রবাহের মাধ্যমে মহাদেশ থেকে বেরিয়ে যায়। বাণিজ্য মূল্য কারসাজি, কর এড়ানো এবং মুনাফা স্থানান্তরের মতো প্রক্রিয়ায় এই অর্থ চলে যায়। বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার গোপন করস্বর্গ ও দুর্বল আন্তর্জাতিক কর সহযোগিতা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে।
অবকাঠামোর ঘাটতি, মানবসম্পদের ক্ষয় এবং পণ্যমূল্যনির্ভর অর্থনীতি আফ্রিকার ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক দেশ কাঁচামাল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক বাজারে পণ্যমূল্য কমে গেলে বৈদেশিক আয় কমে যায়। তখন ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়। আবার সংকটে পড়ে দেশগুলো বিদেশি মুদ্রায় ঋণ নিতে বাধ্য হয়। এরপর আসে ব্যয়সংকোচন কর্মসূচি। স্বল্পমেয়াদে বাজেট স্থিতিশীল হলেও দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সক্ষমতা, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই চক্র থেকে বের হতে হলে শুধু আফ্রিকান দেশগুলোর নীতি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার নিয়মও বদলাতে হবে। উন্নয়ন ঋণের সময়সীমা দীর্ঘ হতে হবে, সুদের হার কমাতে হবে এবং উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধনভিত্তি শক্ত করতে হবে। আফ্রিকার উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদি; তাই ঋণও হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদি ঋণ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন চালানো বাস্তবসম্মত নয়।
আঞ্চলিক পর্যায়ে আফ্রিকাকে নিজস্ব আর্থিক বাজার শক্ত করতে হবে। স্থানীয় মুদ্রায় দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সংগ্রহের সুযোগ বাড়াতে হবে। মুদ্রা একীকরণ ও আঞ্চলিক পুঁজি বাজার গড়ে তুলতে পারলে বিদেশি মুদ্রার ওপর নির্ভরতা কমবে। এতে ডলারের ওঠানামা, বৈদেশিক সুদের হার এবং পুঁজি পালানোর ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
ঋণমান নির্ধারণের পদ্ধতিও সংস্কার করা জরুরি। যদি মূল্যায়নে পক্ষপাত, অতিরিক্ত সতর্কতা বা কাঠামোগত বৈষম্য থাকে, তাহলে আফ্রিকার ঋণ ব্যয় কৃত্রিমভাবে বেড়ে যায়। ঋণমান সংস্থাগুলোকে আরও স্বচ্ছ, প্রমাণভিত্তিক এবং উন্নয়নবান্ধব পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। এতে শুধু আফ্রিকার লাভ হবে না; বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতাও বাড়বে।
সবশেষে, ঋণ টেকসই করার লক্ষ্যকে কেবল বাজেট ঘাটতি কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। ঋণ টেকসই হবে তখনই, যখন তা উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনে সহায়তা করবে। শুধু কৃচ্ছ্রসাধন দিয়ে ঋণসংকট সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়; কিন্তু উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করা যায় না।
আফ্রিকা আসলে অতিরিক্ত ঋণগ্রস্ত নয়; বরং অসম বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার মধ্যে ব্যয়বহুল ঋণের শিকার। ঋণের ফাঁদ থেকে বের হতে হলে আফ্রিকাকে একদিকে নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিয়মকেও আরও ন্যায্য, ভারসাম্যপূর্ণ ও উন্নয়নমুখী করতে হবে। আফ্রিকার জনসংখ্যা, বাজার, সম্পদ ও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা শুধু মহাদেশটির জন্য নয়; বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই আফ্রিকার ঋণসংকটকে আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে নয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ন্যায়ের প্রশ্ন হিসেবে দেখা দরকার।

