যুদ্ধক্লান্ত বিশ্ব এখন নতুন করে তাকিয়ে আছে বেইজিংয়ের দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন বৈঠক শুধু দুই নেতার ব্যক্তিগত কূটনীতির বিষয় নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা, তাইওয়ান প্রশ্ন এবং ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ—সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। দুই দিনের এই বৈঠককে তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্কের আরেকটি অধ্যায় হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; বরং এটি বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
ট্রাম্পের এই চীন সফর ঐতিহাসিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৭ সালের পর এটি কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর। কিন্তু ২০১৭ সালের বাস্তবতা আর এখনকার বাস্তবতা এক নয়। তখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এতটা তীব্র ছিল না, প্রযুক্তি যুদ্ধ এত গভীরে যায়নি, আর বৈশ্বিক ভূরাজনীতি এতটা ভাঙাচোরা অবস্থায় ছিল না। এখন দুই দেশ শুধু বাণিজ্য প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; তারা দুই ভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের প্রতিনিধিও।
এই বৈঠকের ওপর সবচেয়ে বড় ছায়া ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধ। ট্রাম্প শুরুতে আশা করেছিলেন, যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে। কিন্তু এখন যুদ্ধ তৃতীয় মাসে পড়েছে এবং শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। সোমবার ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, ইরানের সঙ্গে মাসব্যাপী যুদ্ধবিরতি এখন “গভীর সংকটে” রয়েছে। ফলে বেইজিং সফরের মূল আলোচ্য বাণিজ্য হলেও ইরান ইস্যু আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসার সম্ভাবনা প্রবল।
ইরান প্রশ্নে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চীন ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ভোক্তাদের একটি। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্যও বড় ঝুঁকি। এই প্রণালি দিয়ে তেল চলাচলে সংকট তৈরি হলে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং এশিয়ার অন্যান্য মিত্র দেশের ওপর সরাসরি চাপ পড়তে পারে। সে কারণে ট্রাম্প চাইবেন, শি জিনপিং যেন ইরানের ওপর প্রভাব ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পথে ভূমিকা রাখেন।
তবে এখানে ট্রাম্পের অবস্থান পুরোপুরি সুবিধাজনক নয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সম্প্রতি বেইজিং সফর করেছেন, যা চীন–ইরান সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, চীন ইরানে নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে ধারণা করা হয়েছিল, যদিও চীন সংঘাতের সময় ইরানকে অস্ত্র দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে ট্রাম্পের জন্য শিকে চাপ দেওয়া সহজ হলেও ফল পাওয়া সহজ হবে না।
এই সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ১২ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অভিযোগ, তারা ইরানি তেল চীনে বিক্রি ও পরিবহনে ভূমিকা রেখেছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ওয়াশিংটন বেইজিংকে একটি বার্তা দিতে চাইছে—ইরান ইস্যুতে চীনের অর্থনৈতিক ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্র নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই নিষেধাজ্ঞা বৈঠকের পরিবেশকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।
তাইওয়ান প্রশ্নও এই বৈঠকের আরেকটি বড় পরীক্ষা। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, শি সম্ভবত তার চেয়ে বেশি করে তাইওয়ান প্রসঙ্গ তুলবেন। চীনের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্র যেন তাইওয়ানকে সামরিক সহায়তা কমায় এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার প্রশ্নে আরও স্পষ্টভাবে বেইজিংয়ের অবস্থানের কাছাকাছি আসে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র “এক চীন” নীতির আওতায় চীনের অবস্থানকে স্বীকার করে, কিন্তু তাইওয়ানের ওপর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির দাবিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আইনের মাধ্যমে তাইওয়ানকে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র দিতে বাধ্য।
শি জিনপিং হয়তো এই বৈঠককে তাইওয়ান বিষয়ে কূটনৈতিক চাপ তৈরির সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, ইরান যুদ্ধ এবং জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রাম্প এখন চীনের সহায়তা চাইছেন; সেই সুযোগে শি তাইওয়ান বিষয়ে ছাড় আদায়ের চেষ্টা করতে পারেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, মার্কিন নীতিতে বড় পরিবর্তনের আশা করা হচ্ছে না, তবু আলোচনার টেবিলে এই বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর থাকবে।
বাণিজ্য অবশ্যই বৈঠকের অন্যতম মূল বিষয়। গত অক্টোবর মাসে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শির বৈঠকে উত্তেজনা কিছুটা কমেছিল এবং বড় বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্ক ছাড়ের বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হয়েছিল। এবার সেই সমঝোতাকে আরও দৃঢ় করার চেষ্টা থাকবে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বুধবার সিউলে চীনা পক্ষের হে লিফেংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। এরপর দুই নেতার মূল বৈঠকে কৃষি, জ্বালানি, বিমান খাত এবং বিনিয়োগ নিয়ে কয়েকটি চুক্তি প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
এখানে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় তিনি ভোটারদের সামনে দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে চাইবেন। চীনের বড় পরিমাণ মার্কিন কৃষিপণ্য কেনা, বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয় বা জ্বালানি খাতে চুক্তি—এসব ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে। বেইজিংও জানে, ট্রাম্প দ্রুত ফল দেখাতে আগ্রহী। তাই চীন হয়তো এই আগ্রহকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে।
চীনের অবস্থান এখন আগের চেয়ে শক্তিশালী। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের বাণিজ্য ও প্রযুক্তি যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে বেইজিং নিজেদের উৎপাদন, রপ্তানি এবং উন্নত প্রযুক্তি সক্ষমতা বাড়িয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ জ্বালানি এবং রোবট প্রযুক্তিতে চীন এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বড় শক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা চীনের অগ্রগতি থামাতে পারেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে চীনকে আরও স্বনির্ভর হতে বাধ্য করেছে।
চীন এখন বিরল খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজের শক্তিশালী অবস্থানকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। উন্নত প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং আধুনিক শিল্প উৎপাদনে এসব খনিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাণিজ্য আলোচনার বাইরে বিরল খনিজও একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী দরকষাকষির বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
চীনের আরেকটি লক্ষ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্র যেন উন্নত প্রযুক্তি রপ্তানির ওপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা শিথিল করে। বিশেষ করে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন চিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি এবং সংবেদনশীল শিল্প উপকরণের ক্ষেত্রে বেইজিং ছাড় চাইতে পারে। চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতারাও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরও প্রবেশাধিকার চায়। একই সঙ্গে চীন চাইবে, তার কিছু প্রতিষ্ঠানকে মার্কিন কালো তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক।
মানবাধিকার ইস্যুও আলোচনায় আসতে পারে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি হংকংয়ের সাবেক গণমাধ্যম ব্যবসায়ী জিমি লাই এবং ধর্মযাজক এজরা জিনের বিষয়ে কথা বলবেন। জিমি লাইকে চলতি বছরের শুরুতে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে এজরা জিন বিভিন্ন শহর ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত অভিযানের সময় আটক হন। তবে বাস্তব প্রশ্ন হলো, বাণিজ্য, ইরান ও তাইওয়ানের মতো বড় কৌশলগত বিষয়ের পাশে মানবাধিকার আলোচনা কতটা গুরুত্ব পাবে।
শি জিনপিংয়ের জন্য এই বৈঠকও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি চান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক যতটা সম্ভব স্থিতিশীল থাকুক, যাতে চীনের দীর্ঘমেয়াদি উত্থান বাধাগ্রস্ত না হয়। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেছেন, রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ের কূটনীতি চীন–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিতে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, বেইজিং ব্যক্তিগত নেতা-সম্পর্ককে কৌশলগত স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে দেখছে।
তবে শির সামনে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রশ্ন আছে। একদিকে তিনি নিজেকে সম্ভাব্য শান্তি-উদ্যোক্তা হিসেবে দেখাতে পারেন, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চান না, কারণ চীনের অর্থনৈতিক লক্ষ্য এখনো বৈশ্বিক বাজার ও স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে বেইজিংয়ের কৌশল হবে—ট্রাম্পকে কিছু দৃশ্যমান সাফল্য দেওয়া, কিন্তু তার বিনিময়ে চীনের কৌশলগত স্বার্থে ছাড় আদায় করা।
এই বৈঠকের আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও আছে। ট্রাম্প ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আনুষ্ঠানিক আতিথেয়তা এবং বড় ঘোষণাকে গুরুত্ব দেন। বেইজিংও সেটি জানে। তাই টেম্পল অব হেভেন ভ্রমণ, রাষ্ট্রীয় ভোজ এবং আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার মাধ্যমে চীন এমন পরিবেশ তৈরি করতে চাইবে, যেখানে কূটনীতি শুধু নীতিগত আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ব্যক্তিগত সৌহার্দ্যও আলোচনার অংশ হবে।
কিন্তু বাহ্যিক সৌহার্দ্যের আড়ালে বাস্তবতা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র চায় চীন ইরানের ওপর চাপ দিক, বাণিজ্যে ছাড় দিক এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতায় নিয়ন্ত্রিত আচরণ করুক। চীন চায় যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করুক, তাইওয়ান বিষয়ে অবস্থান নরম করুক এবং চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ কমাক। অর্থাৎ দুই পক্ষই স্থিতিশীলতা চায়, কিন্তু সেই স্থিতিশীলতার অর্থ দুই দেশের কাছে এক নয়।
এই বৈঠকের ফলাফল তাই কয়েকটি স্তরে বিচার করতে হবে। প্রথমত, ইরান যুদ্ধ নিয়ে কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয় কি না। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য ও শুল্ক বিষয়ে কোনো স্পষ্ট সমঝোতা আসে কি না। তৃতীয়ত, তাইওয়ান প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ভাষাগত বা নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় কি না। চতুর্থত, প্রযুক্তি ও বিরল খনিজ নিয়ে উত্তেজনা কমে নাকি আরও বাড়ে।
সব মিলিয়ে, বেইজিং বৈঠক শুধু ট্রাম্প ও শির আরেকটি ছবি তোলার উপলক্ষ নয়। এটি এমন এক সময়ের কূটনৈতিক পরীক্ষা, যখন বিশ্ব একসঙ্গে যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈঠক সফল হলে যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। ব্যর্থ হলে দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হয়ে উঠবে, যার প্রভাব শুধু ওয়াশিংটন বা বেইজিংয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা ছড়িয়ে পড়বে গোটা বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায়।

