বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম আলোচিত দুই নেতা—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং—অবশেষে মুখোমুখি বৈঠকে বসেছেন। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বেইজিংয়ে শুরু হওয়া এই বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল ও জল্পনা। কারণ, এমন এক সময় এই বৈঠক হচ্ছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য অস্থিরতা একসঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের আলোচনায় শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনাও বড় গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সংকট বর্তমানে বিশ্বের জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সময় বুধবার (১৩ মে) চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে পৌঁছান ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান চীনের ভাইস প্রেসিডেন্টসহ দেশটির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা। ২০১৭ সালের পর এটিই ট্রাম্পের প্রথম চীন সফর হওয়ায় এই সফরকে কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার বৈঠকের জন্য ট্রাম্প যান বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক গ্রেট হল অব দ্য পিপলে। তিয়ানআনমেন স্কয়ারের পশ্চিম পাশে অবস্থিত এই ভবনটি চীনের রাষ্ট্রীয় কূটনীতির অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের স্বাগত জানানো থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অনুষ্ঠান—সবকিছুর কেন্দ্র এই ভবন।
ট্রাম্পকে সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানানো হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত বাজানো হয় এবং একই সঙ্গে আয়োজন করা হয় রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের অনুষ্ঠান। পরে চীনের জাতীয় সংগীতও পরিবেশিত হয়। পুরো আয়োজনে দুই দেশের কূটনৈতিক সৌহার্দ্যের একটি বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা দেখা গেছে।
অনুষ্ঠানে রঙিন পোশাক পরা চীনা শিশুদেরও অংশ নিতে দেখা যায়। তারা দুই দেশের পতাকা নাড়িয়ে অতিথিদের শুভেচ্ছা জানায়। বিশ্লেষকদের মতে, এই আয়োজন শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিবাচক বার্তা পাঠানোরও একটি কৌশল।
তবে এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব। কারণ, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক একাধিক ইস্যুতে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাণিজ্য শুল্ক, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা, সামরিক প্রভাব বিস্তার এবং মধ্যপ্রাচ্য নীতি—সব মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই চাপা উত্তেজনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান সংকট এই বৈঠকের অন্যতম মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে। ইতোমধ্যে তেলের দাম বেড়েছে এবং বিশ্ব শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
চীন বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হওয়ায় হরমুজ সংকট নিয়ে বেইজিংয়ের উদ্বেগ অনেক বেশি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও চায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ স্বাভাবিক রাখতে। ফলে এই ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে অন্তত কিছু পর্যায়ে সমঝোতা তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের আরেকটি বড় পর্যবেক্ষণ হলো, এই বৈঠক শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়েও রূপ নিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প-জিনপিং বৈঠক বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমানো, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার প্রশ্নে এই আলোচনা কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।

