ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু করার সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের লক্ষ্য ছিল খুব স্পষ্ট। তিনি চেয়েছিলেন রাশিয়াকে আবারও একটি ভয়ংকর, প্রভাবশালী এবং অপরিহার্য বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। তাঁর ধারণা ছিল, সামরিক শক্তি দেখিয়ে ইউক্রেনকে দ্রুত চাপে ফেলা যাবে, পশ্চিমা প্রভাবকে দুর্বল করা যাবে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়ার অবস্থান আরও শক্ত হবে।
কিন্তু চার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর ছবিটা অনেকটাই উল্টো। যুদ্ধ রাশিয়াকে শক্তিশালী করার বদলে নানা দিক থেকে ক্লান্ত, বিচ্ছিন্ন এবং সন্দেহের মুখে ফেলেছে। মস্কো এখনও পারমাণবিক অস্ত্র, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন এবং বিপুল জ্বালানি সম্পদের মালিক। কিন্তু শুধু এসব সম্পদ থাকলেই কোনো দেশ বিশ্ব রাজনীতিতে বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারে না। নেতৃত্বের জন্য দরকার আস্থা, নির্ভরযোগ্যতা এবং সংকটের সময়ে মিত্রদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। ইউক্রেন যুদ্ধ সেই জায়গাগুলোতেই রাশিয়াকে দুর্বল করে দিয়েছে।
কাজাখস্তানের সঙ্গে আস্থার ফাটল
ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার প্রথম বড় কূটনৈতিক ধাক্কাগুলোর একটি আসে কাজাখস্তানের দিক থেকে। কাজাখস্তান দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হলেও পুতিনের ইউক্রেননীতি দেশটির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, পুতিন অতীতেও কাজাখস্তানের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও স্বাধীন অস্তিত্ব নিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন, যা দেশটির নেতৃত্বকে সতর্ক করে তোলে।
ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও পুতিন একই ধরনের যুক্তি ব্যবহার করেছেন—ইতিহাস, ভাষা ও জাতিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে অন্য দেশের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা। কাজাখ নেতৃত্ব তাই বুঝতে পারে, আজ ইউক্রেন হলে কাল অন্য কোনো প্রতিবেশী দেশও একই চাপের মুখে পড়তে পারে।
২০২২ সালের আক্রমণের পর কাজাখ প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ মস্কোর সহায়তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। শুধু তাই নয়, তিনি পুতিনের সামনেই জানিয়ে দেন যে কাজাখস্তান ইউক্রেনে রাশিয়া-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলগুলোকে স্বীকৃতি দেবে না। পরে কাজাখস্তান তুরস্কের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা চুক্তি করে। বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কাজাখস্তান রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত নিরাপত্তা চুক্তি সংস্থার সদস্য হয়েও উত্তর আটলান্টিক জোটের সদস্য তুরস্কের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তোলে।
যদিও পরবর্তী সময়ে পুতিন ও তোকায়েভের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে, তবু সেটি বন্ধুত্বের গভীরতার চেয়ে পারস্পরিক প্রয়োজনের ফল বলেই মনে হয়। এই ঘটনাই দেখায়, রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীরাও এখন আর মস্কোর ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করতে প্রস্তুত নয়।
আর্মেনিয়ার ক্ষোভ এবং রাশিয়ার ব্যর্থতা
রাশিয়ার প্রভাব কমে যাওয়ার আরেকটি বড় উদাহরণ আর্মেনিয়া। দীর্ঘদিন ধরে আর্মেনিয়া নিরাপত্তার জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আজারবাইজান নাগোর্নো-কারাবাখে সামরিক অভিযান চালালে রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে আর্মেনিয়ার হতাশা চরমে ওঠে।
নাগোর্নো-কারাবাখ ছিল আজারবাইজানের ভেতরে অবস্থিত জাতিগত আর্মেনীয় অধ্যুষিত অঞ্চল। সেখানে রুশ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন ছিল। কিন্তু আজারবাইজানের অভিযানের সময় তারা কার্যত কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেনি। ফলে প্রায় এক লাখ মানুষ এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
এই ঘটনা আর্মেনিয়ার কাছে স্পষ্ট বার্তা দেয়—সংকটের মুহূর্তে রাশিয়া হয়তো আর আগের মতো নিরাপত্তা দিতে সক্ষম নয়, অথবা দিতে আগ্রহী নয়। এর এক বছরের মধ্যেই আর্মেনিয়া রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা কাঠামো থেকে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করে এবং ফ্রান্স ও ভারত থেকে অস্ত্র কেনার পথে এগোয়। রাশিয়াও নির্ধারিত সময়ের আগেই ওই অঞ্চল থেকে শান্তিরক্ষীদের সরিয়ে নেয়।
এটি কেবল একটি আঞ্চলিক ব্যর্থতা নয়; এটি রাশিয়ার নিরাপত্তা-প্রদানকারী শক্তি হিসেবে ভাবমূর্তির জন্য বড় আঘাত।
আজারবাইজানের সঙ্গে সম্পর্কেও টানাপোড়েন
আর্মেনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার পরও রাশিয়া আজারবাইজানের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখতে পারত। কিন্তু সেখানেও মস্কো বড় ভুল করে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি রুশ ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র আজারবাইজান এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে আঘাত করে। এতে ৩৮ জন নিহত হয়।
আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ রাশিয়ার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ ও দায় স্বীকার দাবি করেন। কিন্তু পুতিন প্রায় এক বছর দায় স্বীকার করতে অস্বীকার করেন। এর মধ্যে সম্পর্ক আরও খারাপ হয়। আলিয়েভ ২০২৫ সালের মে মাসে রাশিয়ার বার্ষিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে যাননি। অন্যদিকে রাশিয়ার বিশেষ বাহিনী ইয়েকাতেরিনবুর্গে জাতিগত আজারিদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অভিযান চালায়। এরপর আজারবাইজান বাকুতে রুশ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম স্পুটনিকের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে কর্মীদের আটক করে।
তবে আজারবাইজান রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। ইরান ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সহায়তা দিচ্ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই পথ খোলা রাখার প্রয়োজনেই মস্কো আজারবাইজানের সঙ্গে বিরোধ আরও বাড়াতে চায়নি। অবশেষে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে পুতিন স্বীকার করেন যে রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উড়োজাহাজটি ভূপাতিত করেছিল এবং অস্পষ্টভাবে ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দেন।
এই ঘটনা দেখায়, রাশিয়া এখন অনেক ক্ষেত্রেই কড়া প্রতিক্রিয়া দেখানোর অবস্থানে নেই। একসময় আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় মস্কো দক্ষ ছিল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পর পুতিন দুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক দুর্বল করে ফেলেছেন।
সিরিয়ায় দীর্ঘ বিনিয়োগ, শেষে শূন্য হাতে ফেরা
সিরিয়ায় রাশিয়ার ভূমিকা একসময় মস্কোর বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। প্রায় এক দশক ধরে রাশিয়া বাশার আল-আসাদের সরকারকে সামরিক, কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে টিকিয়ে রেখেছিল। রুশ বিমান হামলা, স্থলবাহিনীর উপস্থিতি এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কূটনৈতিক সুরক্ষা—সব মিলিয়ে সিরিয়ায় রাশিয়া ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী খেলোয়াড়। বিনিময়ে রাশিয়া তারতুস নৌঘাঁটি এবং হমেইমিম বিমানঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে সিরীয় বিদ্রোহীরা আকস্মিক অভিযান শুরু করলে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী বড় আকারে সাড়া দিতে পারেনি। কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধ মস্কোর সামরিক শক্তিকে এতটাই ব্যস্ত ও ক্লান্ত করে ফেলেছিল যে অন্য ফ্রন্টে একই মাত্রার প্রভাব দেখানো সম্ভব হয়নি। কয়েক দিনের মধ্যে আলেপ্পো ও দামেস্ক পতন হয় এবং আসাদ মস্কোতে পালিয়ে যান।
যে সিরিয়াকে রাশিয়া বহু বছর ধরে নিজের প্রভাবক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলেছিল, সেই জায়গাতেও শেষ পর্যন্ত তার অবস্থান ভেঙে পড়ে। এই ঘটনাটি রাশিয়ার জন্য শুধু সামরিক নয়, কূটনৈতিক মর্যাদারও বড় ক্ষতি।
আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের গল্পও দুর্বল হয়ে পড়ছে
ইউক্রেন যুদ্ধের আগে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রাশিয়ার প্রভাব বাড়ছিল। ভাড়াটে সামরিক গোষ্ঠী ওয়াগনার নিরাপত্তা সহায়তার বিনিময়ে রাজনৈতিক আনুগত্য ও খনিজ সম্পদের অধিকার পেত। মালি ছিল এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সেখানে সামরিক জান্তাকে জিহাদি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করার মাধ্যমে রাশিয়া নিজেকে নিরাপত্তার নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে তুলে ধরেছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালে তিনজাওয়াতেনের কাছে তুয়ারেগ বিদ্রোহীরা মালি-ওয়াগনার বহরে হামলা চালায় এবং বহু রুশ ভাড়াটে যোদ্ধা নিহত হয়। এরপর জিহাদিরা বামাকোর বিমানবন্দর ও জাতীয় জঁদারমেরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে হামলা চালায়। ফলে যে দাবি করা হচ্ছিল—ওয়াগনার মালিকে নিরাপদ করছে—তা আর বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।
ওয়াগনার আনুষ্ঠানিকভাবে মালি ছাড়ার পর কিছু বাহিনী আফ্রিকা কর্পস নামে থেকে গেলেও শেষ পর্যন্ত তারাও সরে যায়। আফ্রিকায় রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের যে গল্প তৈরি হয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধের চাপ এবং মাঠের ব্যর্থতা সেটিকে দুর্বল করে দিয়েছে।
ইউরোপে শেষ ভরসাগুলোও অনিশ্চিত
ইউরোপে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতা ছিল, যারা মস্কোর প্রতি সহানুভূতিশীল বলে পরিচিত। কিন্তু সেই জায়গাতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর সম্প্রতি ক্ষমতা হারিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি রাশিয়ার জন্য প্রতীকীভাবে বড় ধাক্কা, কারণ তিনি ইউরোপীয় রাজনীতিতে মস্কোর ঘনিষ্ঠ কণ্ঠগুলোর একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচও এখন সাবধানে ভারসাম্য রাখছেন। শুরুতে সার্বিয়া রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণকে সমর্থন করছে বলে মনে হলেও পরে ভুচিচ একাধিকবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে দেখা করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার্বিয়া তৃতীয় দেশের মাধ্যমে ইউক্রেনে অন্তত ৯০৮ মিলিয়ন ডলারের গোলাবারুদ পাঠিয়েছে।
এছাড়া ভুচিচ রুশ অস্ত্র সরবরাহকারীদের সঙ্গে সামরিক চুক্তি বাতিল করে ফ্রান্সের সঙ্গে ১২টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার জন্য ২.৭ বিলিয়ন ইউরো বা ৩.২ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছেন। তবু পুতিন প্রকাশ্যে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাননি। কারণ, ইউরোপে যেসব দেশ এখনও আংশিকভাবে রাশিয়ার কাছাকাছি আছে, তাদের পুরোপুরি দূরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তিনি নিতে চাইছেন না।
বেলারুশও বিকল্প পথ খুঁজছে
বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো দীর্ঘদিন ধরে পুতিনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্রদের একজন। কিন্তু সেখানেও সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তিনি পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা হিসেবে রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিয়েছেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগও করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
এতে বোঝা যায়, লুকাশেঙ্কো এখনই ক্রেমলিনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছেন না, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প পথ খোলা রাখছেন। রাশিয়ার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রও যখন নিজের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলাদা হিসাব করতে শুরু করে, তখন সেটি মস্কোর কূটনৈতিক অবস্থার দুর্বলতাই প্রকাশ করে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক: সমান অংশীদার নয়, প্রয়োজনের সম্পর্ক
ইউক্রেন যুদ্ধের আগে রাশিয়া ও চীন নিজেদের পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে দুই বড় শক্তি হিসেবে তুলে ধরত। যুদ্ধের ঠিক আগে দুই দেশের সম্পর্ককে সীমাহীন অংশীদারত্ব বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এখন সম্পর্কটি সমান শক্তির জোট নয়; বরং প্রয়োজনভিত্তিক এক অসম সম্পর্কের মতো দেখাচ্ছে।
চীন রাশিয়াকে সরাসরি অস্ত্র না দিয়ে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্য, যেমন মাইক্রোইলেকট্রনিক্স ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে। অন্যদিকে রাশিয়া চীনের কাছে ছাড়মূল্যে তেল ও গ্যাস বিক্রি করছে। এর অর্থ, রাশিয়া চীনের জন্য দরকারি হলেও সমান মর্যাদার কৌশলগত অংশীদার হিসেবে আর আগের মতো শক্ত অবস্থানে নেই।
চীন সুবিধা নিচ্ছে, কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের দায় পুরোপুরি ভাগ করে নিচ্ছে না। এটি রাশিয়ার জন্য বাস্তববাদী সম্পর্ক হলেও কূটনৈতিক মর্যাদার দিক থেকে সুখকর নয়।
উত্তর কোরিয়া: সবচেয়ে অনুগত, কিন্তু সম্পর্কটি লেনদেনভিত্তিক
আজ রাশিয়ার সবচেয়ে অনুগত মিত্রদের মধ্যে উত্তর কোরিয়ার নাম সবচেয়ে বেশি সামনে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ইউক্রেনের রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে অভিযানের পর উত্তর কোরিয়া ১০ হাজারের বেশি সৈন্য রুশ বাহিনীর পাশে লড়াইয়ের জন্য পাঠায়।
তবে এই সম্পর্কও আদর্শগত বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি লেনদেনভিত্তিক। দুই দেশই পশ্চিমের প্রতি বিরূপ, উভয়েরই নিরাপত্তা উদ্বেগ আছে, এবং একে অপরের কাছ থেকে সামরিক ও রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চায়। কিন্তু এ ধরনের সম্পর্ক রাশিয়ার বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায় না। বরং এটি দেখায়, মস্কোর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের তালিকা ক্রমশ এমন রাষ্ট্রের দিকে সরে যাচ্ছে, যাদের নিজস্ব আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও সীমিত।
শক্তি দেখাতে গিয়ে আস্থা হারিয়েছে রাশিয়া
পুতিন ভেবেছিলেন ইউক্রেনে আক্রমণ রাশিয়ার মহাশক্তির মর্যাদা ফিরিয়ে আনবে। তিনি হয়তো আশা করেছিলেন, পশ্চিম বিভক্ত হবে, ইউক্রেন দ্রুত দুর্বল হবে এবং বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত বহুমেরুকেন্দ্রিক দিকে যাবে, যেখানে রাশিয়া আবার বড় কেন্দ্র হিসেবে দাঁড়াবে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। যুদ্ধ রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদি চাপে ফেলেছে, অর্থনীতিকে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আটকে দিয়েছে, মিত্রদের সন্দিহান করেছে এবং অনেক অংশীদারকে বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করেছে।
কাজাখস্তান সতর্ক হয়েছে, আর্মেনিয়া হতাশ হয়েছে, আজারবাইজান ক্ষুব্ধ হয়েছে, সিরিয়ায় রাশিয়ার প্রভাব ভেঙে পড়েছে, আফ্রিকায় নিরাপত্তা-প্রদানকারী ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, ইউরোপে মিত্ররা দূরত্ব রাখছে, বেলারুশ বিকল্প দরজা খোলা রাখছে, আর চীনের সঙ্গে সম্পর্কও এখন সমতার চেয়ে নির্ভরতার দিকে বেশি ঝুঁকে আছে।
রাশিয়া এখনও ভয়ংকর সামরিক শক্তি। কিন্তু ভয় আর আস্থা এক জিনিস নয়। যুদ্ধ দিয়ে প্রভাব দেখানো যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব গড়া যায় না। ইউক্রেন যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ফল তাই শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়; কূটনৈতিক মানচিত্রেও দেখা যাচ্ছে। মস্কো যে প্রভাব ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল, সেই চেষ্টাই তাকে আরও একা, আরও নির্ভরশীল এবং আরও সীমাবদ্ধ করে তুলছে।

