বিশ্ব অর্থনীতিতে অতি ধনী মানুষদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। বামপন্থী ও ডানপন্থী—দুই ধারার জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতির মধ্যেই এখন একটি সাধারণ বক্তব্য শোনা যাচ্ছে: অতি ধনীরা নাকি সমাজ থেকে বেশি নিচ্ছেন, কিন্তু যথেষ্ট ফিরিয়ে দিচ্ছেন না। কেউ কেউ মনে করেন, বিলিয়ন ডলারের সম্পদ সৎভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়; এত বড় সম্পদ মানেই কোথাও না কোথাও বাজারক্ষমতার অপব্যবহার, শ্রমিক শোষণ বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুবিধা নেওয়া।
এই ধারণা শুনতে আবেগী ও জনপ্রিয় মনে হতে পারে। কারণ সাধারণ মানুষের আয়, জীবনযাত্রার ব্যয়, বাড়িভাড়া, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার খরচ নিয়ে বাস্তব চাপ আছে। ফলে অতি ধনী মানুষের বিশাল সম্পদ অনেকের চোখে বৈষম্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সব বিলিয়নিয়ার কি সত্যিই সমাজের ক্ষতি করে ধনী হয়েছেন? নাকি অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা এমন নতুন পণ্য, সেবা ও প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যা কোটি কোটি মানুষের জীবন সহজ করেছে?
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বড় অর্থনৈতিক ভুল ধারণা: অর্থনীতি যেন একটি শূন্য-যোগফলের খেলা। অর্থাৎ একজন ধনী হলে আরেকজন দরিদ্র হবে—এমন ভাবনা। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতিতে সব সময় বিষয়টি এত সরল নয়। অনেক উদ্যোক্তা নতুন বাজার তৈরি করেন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন, উৎপাদনশীলতা বাড়ান এবং মানুষের সময় ও খরচ কমান। তাঁরা যে সম্পদ অর্জন করেন, সেটি অনেক সময় তাঁদের সৃষ্ট মোট সামাজিক মূল্যের তুলনায় ছোট অংশ মাত্র।
উদাহরণ হিসেবে বিনোদন জগতের ধনী ব্যক্তিদের কথা ধরা যায়। মাইকেল জর্ডানের সম্পদের পরিমাণ ৪.৩ বিলিয়ন ডলার, লেব্রন জেমসের ১.৪ বিলিয়ন ডলার, টেইলর সুইফটের ২ বিলিয়ন ডলার, স্টিভেন স্পিলবার্গের ৭.১ বিলিয়ন ডলার, জে. কে. রাউলিংয়ের ১.২ বিলিয়ন ডলার এবং জেরি সাইনফেল্ডের ১.১ বিলিয়ন ডলার। তাঁদের বিপুল সম্পদ নিয়ে সাধারণত বড় রাজনৈতিক ক্ষোভ দেখা যায় না। কারণ তাঁদের সৃষ্ট মূল্য চোখে দেখা সহজ—খেলা, গান, চলচ্চিত্র, বই বা কৌতুকের মাধ্যমে মানুষ সরাসরি আনন্দ পায়।
কিন্তু প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেক সময় কম দৃশ্যমান। বিল গেটসের সম্পদের পরিমাণ ১০২.৮ বিলিয়ন ডলার। তিনি সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্বের অসংখ্য কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছেন। একইভাবে ল্যারি পেজের সম্পদ ৩১৪.৯ বিলিয়ন ডলার এবং সের্গেই ব্রিনের সম্পদ ২৯০.৪ বিলিয়ন ডলার। তাঁরা ইন্টারনেট অনুসন্ধান, মানচিত্র ও ই-মেইল ব্যবস্থাকে এমনভাবে বদলে দিয়েছেন, যার সুবিধা প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ প্রায় বিনা খরচে ব্যবহার করছে।
এখানে মূল প্রশ্নটি হলো—মানুষ তাঁদের সেবা থেকে কতটা উপকার পেয়েছে? অনেক সময় বাজারে কোনো সেবার মূল্য শূন্য হলেও ব্যবহারকারীর কাছে তার বাস্তব মূল্য বিশাল। বিনা খরচে মানচিত্র ব্যবহার করা, দ্রুত তথ্য খোঁজা, অনলাইনে যোগাযোগ করা বা সফটওয়্যারের মাধ্যমে কাজের গতি বাড়ানো—এসব সুবিধা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাই শুধু একজন উদ্যোক্তার সম্পদের পরিমাণ দেখে তাঁর অবদান বিচার করলে ছবির অর্ধেকটাই দেখা হয়।
অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম ডি. নর্ডহাউস উদ্ভাবনের সামাজিক লাভ নিয়ে গবেষণা করে দেখিয়েছিলেন, উদ্ভাবকেরা তাঁদের সৃষ্ট মোট সুবিধার মাত্র ২.২ শতাংশ নিজেরা ধরে রাখতে পারেন। এই যুক্তি ব্যবহার করলে জেফ বেজোসের ২৭৩ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ইঙ্গিত করে যে তিনি সমাজের জন্য প্রায় ১২.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্য তৈরি করেছেন। এই হিসাব নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ: সফল উদ্ভাবন থেকে শুধু উদ্যোক্তা নয়, ভোক্তা, কর্মী, সরবরাহকারী এবং বৃহত্তর অর্থনীতি—সবাই কোনো না কোনোভাবে উপকৃত হতে পারে।
অ্যামাজনের উদাহরণ এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। অনলাইন কেনাকাটা মানুষের সময় বাঁচিয়েছে, পণ্যের তুলনা সহজ করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়েছে। আগে যেখানে মানুষকে দোকানে যেতে হতো, পণ্য খুঁজতে হতো, দাম মিলিয়ে দেখতে হতো—এখন তা ঘরে বসেই করা যায়। দীর্ঘ ভ্রমণে অনেক বই বহনের বদলে একটি ডিজিটাল যন্ত্রে অসংখ্য বই রাখা যায়। এসব পরিবর্তন কেবল আরামের বিষয় নয়; এগুলো সময়, শ্রম ও অর্থনীতির কার্যকারিতার সঙ্গেও যুক্ত।
তবে এই যুক্তির অর্থ এই নয় যে সব ধনী মানুষ সমানভাবে সমাজে অবদান রাখেন, বা তাঁদের ওপর করনীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। করব্যবস্থা, একচেটিয়া বাজারক্ষমতা, শ্রমিক অধিকার, রাজনৈতিক প্রভাব, কর ফাঁকি এবং সম্পদের উত্তরাধিকার—এসব বাস্তব সমস্যা। কিন্তু সমস্যা চিহ্নিত করা আর সব বিলিয়নিয়ারকে একসঙ্গে সমাজের শত্রু হিসেবে দেখানো এক জিনিস নয়। নীতিনির্ধারণে আবেগের চেয়ে প্রমাণভিত্তিক বিচার বেশি জরুরি।
নিউইয়র্কে অতি দামি দ্বিতীয় বাড়ির ওপর কর আরোপের প্রস্তাবও এই বিতর্ককে সামনে এনেছে। জোহরান মামদানি পাঁচ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের বাড়ির ওপর বিশেষ করের কথা বলেছেন। তাঁর যুক্তি হলো, শহরের উন্নয়নে সবার ভূমিকা থাকা উচিত এবং যাদের সামর্থ্য বেশি, তাদের অবদানও বেশি হওয়া উচিত। সাধারণ মানুষের কাছে এই বক্তব্য আকর্ষণীয় হতে পারে, কারণ বড় শহরে আবাসন ব্যয় ও জীবনযাত্রার চাপ অনেক বেশি।
কিন্তু বিরোধী যুক্তিও আছে। কেন গ্রিফিন ও তাঁর প্রতিষ্ঠান সিটাডেলের নিউইয়র্ক-সংক্রান্ত অর্থনৈতিক অবদান উল্লেখযোগ্য বলে দাবি করা হয়। সিটাডেলের নিউইয়র্ক কর্মীরা গত পাঁচ বছরে শহর ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে ২.৩ বিলিয়ন ডলার কর দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত ৬ বিলিয়ন ডলারের পার্ক অ্যাভিনিউ অফিস প্রকল্পে ৬,০০০ নির্মাণকাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। গ্রিফিন নিজেও নিউইয়র্কে ৬৫০ মিলিয়ন ডলার দান করেছেন। এসব তথ্য দেখায়, অতি ধনী ব্যক্তিদের ভূমিকা শুধু ব্যক্তিগত সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁদের বিনিয়োগ, কর, কর্মসংস্থান ও দানের মাধ্যমেও অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ে।
তবে এখানে সতর্কতা প্রয়োজন। ধনীদের অবদান আছে বলেই তাঁদের কোনো নীতি-সমালোচনার বাইরে রাখা যাবে—এমন ভাবাও ভুল। আবার ধনী হলেই তাঁরা সমাজের ক্ষতি করছেন—এমন ভাবাও সমানভাবে ভুল। বাস্তবতা মাঝামাঝি জায়গায়। একটি ন্যায্য করব্যবস্থা দরকার, কিন্তু সেই করব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত নয় যাতে বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রণোদনা অকারণে দুর্বল হয়ে পড়ে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান। যদি নিউইয়র্ক বা ক্যালিফোর্নিয়ার মতো অঙ্গরাজ্য অতি ধনীদের লক্ষ্য করে অতিরিক্ত কঠোর নীতি নেয়, তাহলে অনেক উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠান অন্য অঙ্গরাজ্যে চলে যেতে পারে। ফ্লোরিডায় প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতের কিছু ধনী ব্যক্তির আগ্রহ বাড়ার পেছনে এই ধরনের কর ও নীতিগত উদ্বেগের কথাও বলা হয়। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সংশ্লিষ্ট শহরের করভিত্তি, কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক গতি।
এই বিতর্কে জাতীয় রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ। জনপ্রিয়তাবাদী ডানপন্থায় স্টিভ ব্যানন বিলিয়নিয়ারদের ওপর বড় কর বাড়ানোর কথা বলেছেন। অন্যদিকে জনপ্রিয়তাবাদী বামপন্থায় এলিজাবেথ ওয়ারেন অতি ধনীদের ওপর সম্পদ করের প্রস্তাব দিয়েছেন। অর্থাৎ ধনীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ এখন শুধু একটি দলের বিষয় নয়; এটি বৃহত্তর জনমতের অংশ হয়ে উঠছে।
এখানে রাজনৈতিক ঝুঁকি হলো, সাধারণ মানুষের বাস্তব হতাশাকে সহজ ব্যাখ্যায় নামিয়ে আনা। আয় বৈষম্য, স্বাস্থ্যব্যয়, শিক্ষার খরচ, আবাসন সংকট ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা—এসব সমস্যার পেছনে জটিল অর্থনৈতিক ও নীতিগত কারণ আছে। কিন্তু যখন বলা হয়, “সব সমস্যার মূল কারণ অতি ধনী মানুষ”, তখন সমস্যার প্রকৃত সমাধান আড়ালে পড়ে যায়। তখন করনীতি হয়ে ওঠে প্রতিশোধের ভাষা, উন্নয়ননীতির অংশ নয়।
তরুণদের জন্যও এই বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ। যদি সমাজ বারবার বলে যে বড় সাফল্য মানেই অন্যায়, বড় সম্পদ মানেই শোষণ, তাহলে উদ্ভাবন, ঝুঁকি নেওয়া ও উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা দুর্বল হতে পারে। তরুণদের বলা উচিত—সফল হও, নতুন কিছু তৈরি করো, মানুষের সমস্যা সমাধান করো, তবে নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বজায় রেখে। বড় সম্পদ নিজে অপরাধ নয়; অপরাধ হলো অন্যায় উপায়ে সম্পদ অর্জন, শ্রমিক শোষণ, আইন ভাঙা বা সমাজের ক্ষতি করা।
অতএব, বিলিয়নিয়ার বিতর্কে আবেগের জায়গা থাকলেও নীতির জায়গায় প্রয়োজন ভারসাম্য। সমাজের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের সুযোগ বাড়াতে করনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, সাশ্রয়ী আবাসন এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার দরকার। কিন্তু সেই সঙ্গে উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক ও বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা অস্বীকার করলে অর্থনীতির বড় শক্তিগুলোকেও দুর্বল করা হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ধনী বনাম গরিব নয়; প্রশ্নটি হলো ন্যায্যতা, উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক অবদানের। যারা সমাজে সত্যিকারের মূল্য তৈরি করেন, তাঁদের সাফল্যকে শুধু সন্দেহের চোখে দেখা উচিত নয়। আবার যেখানেই বাজারক্ষমতার অপব্যবহার, শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘন বা কর ফাঁকির প্রমাণ থাকবে, সেখানেই কঠোর নীতি দরকার। অর্থনীতি এগোয় তখনই, যখন সাফল্যকে উৎসাহ দেওয়া হয় এবং অন্যায়কে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
অতি ধনীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ভাষা তাই আকর্ষণীয় হলেও সব সময় কার্যকর নয়। বরং দরকার এমন নীতি, যা সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করবে, উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেবে এবং সম্পদের সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে। শুধু ধনী মানুষকে লক্ষ্য করে ক্ষোভ প্রকাশ করলে রাজনীতি হয়তো জনপ্রিয়তা পেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য সেটি বিপজ্জনকও হতে পারে।
সূত্রভিত্তিক পুনর্লিখন: মাইকেল আর. স্ট্রেইনের ১৩ মে ২০২৬ প্রকাশিত মতামতধর্মী নিবন্ধের আলোচনার ভিত্তিতে।

