ভারতের অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মান ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় দেশটির আর্থিক বাজারে চাপ আরও বেড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা মিলিয়ে ভারতের অর্থনীতি এখন কঠিন সময় পার করছে।
বুধবার (১৩ মে) আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে এক ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মূল্য দাঁড়ায় ৯৫ দশমিক ৭৯ রুপিতে। এর আগের দিনও রুপি ৯৫ দশমিক ৭৩-এ নেমে রেকর্ড গড়েছিল। কিন্তু মাত্র একদিনের ব্যবধানে সেই রেকর্ডও ভেঙে যায়। ফলে বর্তমানে এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল এবং সবচেয়ে খারাপ পারফর্ম করা মুদ্রা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে ভারতীয় রুপি।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। গত কয়েক মাস ধরেই ভারতের ওপর বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বাড়ছিল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়েছে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতের মতো বড় আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। দেশটির বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেই ভারতের আমদানি ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যায়। এতে ডলারের চাহিদা বাড়ে এবং স্থানীয় মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়। বর্তমানে ঠিক সেই পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই যাচ্ছে দেশটি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু তেলের দামই নয়, বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপও রুপির দরপতনকে আরও ত্বরান্বিত করছে। ভারতীয় কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশের বৈদেশিক ঋণ ডলারে নেওয়া। ফলে রুপির মান কমে গেলে সেই ঋণ পরিশোধ করতে আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে ডলারের চাহিদা আরও বাড়ছে এবং রুপির দুর্বলতা গভীর হচ্ছে।
একই সঙ্গে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ঝুঁকি কমাতে বেশি পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটিকে বলা হয় ‘হেজিং’। কিন্তু এই বাড়তি ডলার সংগ্রহও বাজারে রুপির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কয়েকদিন আগেই বৈদেশিক মুদ্রার চাপ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তার সেই মন্তব্যের পরই বাজারে উদ্বেগ আরও বাড়ে। অনেক বিনিয়োগকারী মনে করছেন, সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ফলে শেয়ারবাজার ও মুদ্রাবাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারত সরকার ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। স্বর্ণ ও রুপা আমদানির ওপর শুল্ক বাড়ানো হয়েছে, যাতে অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমানো যায় এবং ডলারের চাপ কিছুটা হ্রাস পায়। তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপ সাময়িক স্বস্তি দিলেও মূল সংকট সমাধান করতে পারবে না।
তাদের মতে, যতদিন পর্যন্ত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা না ফিরবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমবে না, ততদিন ভারতীয় রুপির ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ভারতীয় অর্থনীতিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, রুপির এই ধারাবাহিক দরপতন শুধু মুদ্রাবাজারের সমস্যা নয়; এটি সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলবে। কারণ মুদ্রার মান কমে গেলে আমদানি ব্যয় বাড়ে, আর তার প্রভাব পড়ে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা ধরে রাখা। আগামী কয়েক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে রুপির ভবিষ্যৎ গতিপথ।

