মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলোচিত বেইজিং সফরের রেশ কাটতে না কাটতেই চীন সফরে যাচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ১৯ মে থেকে শুরু হতে যাওয়া দুই দিনের এই সফরকে শুধু নিয়মিত কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ, সময়, প্রেক্ষাপট এবং বৈশ্বিক উত্তেজনার দিক থেকে এই সফর এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় বার্তা বহন করছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে এখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক এক জটিল ত্রিভুজে পরিণত হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা কমাতে চায় না, আবার পুরোপুরি সংঘাতেও যেতে চায় না। অন্যদিকে চীনও ওয়াশিংটনের সঙ্গে দরজা বন্ধ করছে না, তবে একইসঙ্গে মস্কোর সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করছে। ঠিক এই জায়গাতেই পুতিনের চীন সফর নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।
ক্রেমলিনের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সফরে পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দুই দেশের সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার উপায় নিয়ে আলোচনা করবেন। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নানা ইস্যুও আলোচনার টেবিলে থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ট্রাম্পের সফরের এত অল্প সময়ের মধ্যে পুতিনের বেইজিং যাত্রা আসলে কী বোঝাচ্ছে?
প্রথমত, এটি চীনের কূটনৈতিক ভারসাম্যের একটি স্পষ্ট প্রদর্শন। চীন দেখাতে চাইছে, সে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারে, কিন্তু পশ্চিমা চাপের কারণে রাশিয়াকে দূরে সরিয়ে দেবে না। বরং মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক বেইজিংয়ের জন্য এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করলেও রাশিয়াকে তার প্রধান ভূরাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে ধরে রাখছে।
ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক বৈঠকে বড় কোনো নাটকীয় অগ্রগতি না হলেও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, তাইওয়ান, ইউক্রেন যুদ্ধ, বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিরল খনিজ সম্পদ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় এসেছে। তাইওয়ান প্রশ্নে শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করেছেন, এ বিষয়ে ভুল পদক্ষেপ বড় ধরনের সংঘাত ডেকে আনতে পারে।
অন্যদিকে ট্রাম্পও তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষে নন বলে মন্তব্য করেছেন এবং তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এসব বিষয় চীনের জন্য কূটনৈতিকভাবে সুবিধাজনক বলে মনে করা হচ্ছে। এই বাস্তবতায় পুতিনের সফর চীনের জন্য আরও একটি সুযোগ তৈরি করছে—ওয়াশিংটনকে বোঝানো যে বেইজিং একা নয়, তার পাশে শক্তিশালী মিত্র রয়েছে।
রাশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকেও চীন সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে রাশিয়া পশ্চিমা বাজার থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে চীনের ওপর নির্ভরতা বাড়ে।
বর্তমানে চীন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষি ও ডিজিটাল অবকাঠামোসহ নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া-চীন বাণিজ্যের পরিমাণ ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। পশ্চিমা বাজার হারানোর পর রাশিয়ার জন্য চীনা বাজার অনেকটা অর্থনৈতিক জীবনরেখায় পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে জ্বালানি খাতে চীন রাশিয়ার জন্য বড় ভরসা। ইউরোপীয় বাজার সংকুচিত হওয়ার পর রাশিয়া তার তেল, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের জন্য চীনের দিকে আরও বেশি ঝুঁকেছে। এতে রাশিয়া অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা সামাল দিতে পারছে, আর চীন তুলনামূলক সুবিধাজনক শর্তে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করছে। অর্থাৎ সম্পর্কটি দুই পক্ষের জন্যই প্রয়োজনীয়, তবে সমান নয়।
চীন ও রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে নিজেদের সম্পর্ককে “সীমাহীন অংশীদারত্ব” হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এরপর থেকে দুই দেশ পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে আরও কাছাকাছি এসেছে। তবে এই সম্পর্কের ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য সমান নয়। রাশিয়া সামরিকভাবে বড় শক্তি হলেও অর্থনৈতিকভাবে এখন চীনের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। তাই সম্পর্কটি অনেক বিশ্লেষকের চোখে অসম হলেও পারস্পরিক প্রয়োজনের কারণে টিকে আছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে চীন সরাসরি রাশিয়ার সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেনি, আবার প্রকাশ্যে নিন্দাও করেনি। বরং চীন বারবার পশ্চিমা সামরিক জোটের বিস্তার ও পশ্চিমা নীতিকেই এই সংকটের পেছনের বড় কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, চীন পরোক্ষভাবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পকে সহায়তা করছে। তবে বেইজিং এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
এই সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ এবং জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা নতুন ভূরাজনৈতিক হিসাব তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যে বেশি মনোযোগ দিতে বাধ্য হয়, তাহলে চীন ও রাশিয়া অন্য অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ পায়।
রাশিয়ার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা জ্বালানির দাম বাড়িয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা আনতে পারে। অন্যদিকে চীন নিজেকে স্থিতিশীল, দায়িত্বশীল এবং আলোচনামুখী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। তাই পুতিনের বেইজিং সফর শুধু রাশিয়া-চীন সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তর ক্ষমতার রাজনীতির অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই সফর একটি সতর্কবার্তা। ওয়াশিংটন চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আছে, কিন্তু চীনকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে পারছে না। একই সময়ে রাশিয়াকে দুর্বল করতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও মস্কো বেইজিংয়ের সহায়তায় বিকল্প পথ খুঁজে নিচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—চীনকে সামাল দেওয়া এবং রাশিয়া-চীন ঘনিষ্ঠতাকে সীমিত রাখা।
চীনও এই পরিস্থিতিকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠক করে বিশ্বকে দেখাচ্ছে যে সে আলোচনায় আগ্রহী। অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে বোঝাচ্ছে, পশ্চিমা চাপের কাছে সে নতি স্বীকার করবে না। এই কৌশল চীনকে আলোচনার টেবিলে তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানে রাখছে।
বিশ্ব রাজনীতির বড় পরিবর্তন এখানেই। যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক একমেরু ব্যবস্থার বদলে চীন ও রাশিয়া বহুদিন ধরে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার কথা বলছে। তাদের লক্ষ্য এমন একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো, যেখানে পশ্চিমা দেশগুলোর একক আধিপত্য থাকবে না। পুতিনের চীন সফর সেই ধারণাকেই নতুনভাবে সামনে আনছে।
তবে এই সম্পর্কের ভেতরে ঝুঁকিও কম নয়। চীন রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলেও পশ্চিমা বাজার হারাতে চায় না। আবার রাশিয়াও চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়লে ভবিষ্যতে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই দুই দেশের সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ দেখাক, এর ভেতরে বাস্তববাদী হিসাব-নিকাশও প্রবল।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্পের সফরের পরপরই পুতিনের বেইজিং যাত্রা বিশ্ব রাজনীতিতে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের দরজা খোলা রাখবে, কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত বন্ধনও ছাড়বে না। রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপ সামাল দিতে চীনের ওপর আরও নির্ভর করবে। আর যুক্তরাষ্ট্রকে এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, যেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা আলাদা আলাদা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে সমন্বিতভাবে এগোচ্ছে।
এই সফর তাই শুধু দুই নেতার বৈঠক নয়; এটি বিশ্ব ক্ষমতার নতুন বিন্যাসের ইঙ্গিত। আগামী বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং সামরিক ভারসাম্যে চীন-রাশিয়া সম্পর্ক বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বেইজিংয়ের এই কূটনৈতিক মঞ্চ তাই শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
সিভি/এইচএম

