ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বেইজিং বৈঠক ঘিরে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। গত দেড় বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্যনিরাপত্তা ও শিল্প উৎপাদন—সবকিছুই এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে এই বৈঠক যদি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যবিরতির পথ খুলে দেয় এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বাস্তব সুযোগ তৈরি করে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর থেকে বড় ধরনের ঝুঁকির চাপ কিছুটা হলেও কমতে পারে।
এই বৈঠক কি শুধু কূটনৈতিক ছবি তোলার আয়োজন, নাকি এর ভেতরে বিশ্ববাজার বদলে দেওয়ার মতো বাস্তব অর্থনৈতিক তাৎপর্য আছে? প্রথম নজরে বৈঠকটি ছিল রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের এক মঞ্চ। প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট মূল ভূখণ্ড চীন সফর করলেন। ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতা—টেসলার ইলন মাস্ক, অ্যাপলের টিম কুক, বোয়িংয়ের কেলি অর্টবার্গ এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং। তাঁদের উপস্থিতি নিজেই একটি বার্তা দেয়: যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান চীনের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ককে এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
তবে বৈঠকের বাহ্যিক আয়োজনের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এর বাস্তব ফলাফল। যদি বৈঠক থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে—প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যবিরতি আরও দীর্ঘ হয়; দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর পথে বাস্তব সমঝোতা তৈরি হয়—তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক স্বস্তি পাবে, যা গত দেড় বছরে প্রায় অনুপস্থিত ছিল।
বাণিজ্যবিরতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
২০২৫ সালের অক্টোবরে বুসানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছিল, সেটি ট্রাম্পের অধিকাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক কার্যকর হওয়া আপাতত থামিয়ে দিয়েছিল। এর বিনিময়ে চীন বিরল খনিজ রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ কিছুটা শিথিল করতে রাজি হয়। এখন যদি বেইজিং বৈঠকের মাধ্যমে এই বিরতি ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর পথ তৈরি হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক উৎপাদনব্যবস্থা, প্রযুক্তিশিল্প, জ্বালানি রূপান্তর ও প্রতিরক্ষা খাতেও পড়বে।
কারণ চীন বিশ্বের প্রায় ৮৫% বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাত করে এবং বিরল খনিজ চুম্বকের ৯০%–এর বেশি উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। এসব উপাদান বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং উন্নত তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ সরঞ্জামে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ এই সরবরাহে স্থিতিশীলতা ফিরলে একসঙ্গে বহু পশ্চিমা শিল্পের ওপর থেকে বড় বাধা সরে যেতে পারে।
এখানে লাভবান হওয়ার সম্ভাব্য পক্ষগুলো স্পষ্ট। ২০১৯ সাল থেকে চীনা অর্ডার সংকটে থাকা বোয়িং নতুন করে বড় উড়োজাহাজ ক্রয়ের সুযোগ পেতে পারে। অ্যাপল বিরল খনিজ চুম্বকের স্থিতিশীল সরবরাহ পেলে স্পিকার থেকে ক্যামেরা মডিউল—বিভিন্ন পণ্যে উৎপাদন পরিকল্পনা আরও নির্ভরযোগ্য করতে পারবে। টেসলার সাংহাই কারখানা এখন তার বৈশ্বিক উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি তৈরি করে; ফলে চীনে নীতিগত স্বচ্ছতা টেসলার জন্য বড় সুবিধা হবে। আর যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকেরাও চীনের সয়াবিন ও শস্য আমদানি বাজারে ফের প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন, যে বাজার ধীরে ধীরে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার দিকে সরে গিয়েছিল।
চীনের জন্য সবচেয়ে বড় লাভ হবে পূর্বানুমানযোগ্যতা। গত দেড় বছরে চীনের ব্যবসা ও রপ্তানিখাতের ওপর সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে কোনো একক মার্কিন সিদ্ধান্ত থেকে নয়, বরং ট্রাম্পের নীতিগত অনিশ্চয়তা থেকে। ব্যবসা কখন শুল্ক বাড়বে, কখন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বদলাবে, কখন নতুন নিষেধাজ্ঞা আসবে—এই অস্থিরতার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারে না। একটি স্থিতিশীল কাঠামো তৈরি হলে চীনা রপ্তানিকারকসহ বিশ্বজুড়ে বহু প্রতিষ্ঠান আবার স্বাভাবিক পরিকল্পনায় ফিরতে পারবে।
হরমুজ প্রণালি: জ্বালানি বাজারের সবচেয়ে বড় চাপ
বৈঠকের দ্বিতীয় বড় সম্ভাবনা হরমুজ প্রণালি ঘিরে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে, ইরানের কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া বৈশ্বিক তেলবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিঘ্ন। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধ ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়ার আগের তুলনায় এখন বৈশ্বিক তেলের দাম প্রায় ৫০% বেশি।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব বোঝার জন্য কয়েকটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০% সাধারণত এই পথ দিয়ে যায়। ২০২৪ সালে এই অপরিশোধিত তেলের ৮৪% গেছে এশিয়ায়। এর মধ্যে প্রায় ৭০% গেছে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়। অর্থাৎ হরমুজ সংকটের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি পড়েছে এশিয়ার ওপর।
এর প্রভাব অসমভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে, যাকে কিছু বিশ্লেষক মন্দাসদৃশ অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করছেন। পাকিস্তান ও ভিয়েতনাম জ্বালানি ব্যবহারে রেশনিং করছে। জ্বালানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় এশীয় বিমান সংস্থাগুলো ভাড়ার ওপর অতিরিক্ত মাশুল বসিয়েছে। এর পাশাপাশি ইউরিয়ার ৩০%–এর বেশি সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সারদাম বেড়ে কায়রো থেকে ম্যানিলা পর্যন্ত খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যদি ট্রাম্প–শি বৈঠক হরমুজ প্রণালি টেকসইভাবে খুলে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, তাহলে এর প্রভাব দ্রুত দেখা যেতে পারে। চীন ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা হিসেবে তেহরানের ওপর চাপ দিতে পারে, আর যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরের ওপর পাল্টা অবরোধ শিথিল করতে পারে। এই দুই দিক থেকে চাপ ও ছাড় মিললে বৈশ্বিক অর্থনীতি তার জলপথনির্ভর জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাবে। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উদীয়মান অর্থনীতিগুলো তেলের দাম, সারের খরচ এবং জাহাজ চলাচলের বীমা ব্যয়ে দ্রুত স্বস্তি পেতে পারে।
তবে ঝুঁকি এখনো শেষ হয়নি
এই সম্ভাবনার মধ্যেও কয়েকটি বড় সতর্কতা আছে। প্রথমত, চীন বিরল খনিজ রপ্তানির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তুলে নেবে—এমনটা ধরে নেওয়া ভুল হবে। বরং চীন সম্ভবত আংশিক ছাড় দেবে। এর লক্ষ্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে ভবিষ্যৎ শুল্ক বৃদ্ধি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ থেকে বিরত রাখা নয়; ইউরোপসহ অন্য দেশগুলো যাতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুরূপ পদক্ষেপে যোগ না দেয়, সেটিও নিশ্চিত করা। চীন সম্ভবত বর্তমান শিল্পচাহিদা পূরণের মতো সরবরাহ বজায় রাখবে, কিন্তু অন্য দেশগুলোকে বড় কৌশলগত মজুত গড়ার সুযোগ দিতে চাইবে না।
দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ওপর। ইরান ইতিমধ্যে দেখিয়েছে, চাইলে সে হরমুজ বন্ধ করার সক্ষমতা রাখে। একবার কোনো রাষ্ট্র এই কৌশলগত শক্তি প্রদর্শন করলে সেই বাস্তবতা আর অদৃশ্য হয়ে যায় না। ফলে প্রণালি খুললেও বাজারের মনে ঝুঁকির ধারণা রয়ে যাবে।
তৃতীয়ত, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন নিজেই একটি অনিশ্চয়তা। বেইজিংয়ে কোনো সমঝোতা হলেও ওয়াশিংটনে ফিরে সেটি বদলে যেতে পারে। তাই ব্যবসা ও বাজারের জন্য প্রশ্ন থাকবে—এই সমঝোতা কত দিন স্থায়ী হবে?
বিশ্বায়নের ভাঙন কি থামবে?
এই বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হয়তো তাৎক্ষণিক শিরোনামে ধরা পড়বে না। গত দেড় বছর ধরে বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ধরে নিয়েছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে। এই ধারণার ভিত্তিতে তারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—কারখানা কোথায় বসাবে, কত মজুত রাখবে, কোন সরবরাহকারীকে বেছে নেবে, কোথায় উৎপাদন সরাবে, কর্মী নিয়োগ বাড়াবে নাকি থামাবে।
এই প্রবণতার উদাহরণ অনেক। চীনা গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডি থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে নতুন কারখানা করছে। তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি অ্যারিজোনায় ১৬৫ বিলিয়ন ডলারের সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অ্যাপল আইফোন সংযোজনের বড় অংশ ভারতে সরিয়ে নিচ্ছে। আরও বহু খাতে একই ধরনের দ্বৈত সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে—একটি চীনের জন্য, আরেকটি চীনের বাইরে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য।
যুক্তরাষ্ট্র–চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থিতিশীল হলে এসব সিদ্ধান্ত পুরোপুরি পাল্টে যাবে না। কারণ ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা। কিন্তু নতুন করে বিচ্ছিন্নতা বাড়ার গতি কমতে পারে। যেসব প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি কমাতে গিয়ে একই জিনিসের দুটি করে ব্যবস্থা তৈরি করছে, তারা আবার দক্ষতা ও স্থিতিস্থাপকতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে পারে।
ট্রাম্পের চীন সফর এবং সেপ্টেম্বরে শি জিনপিংয়ের পরিকল্পিত যুক্তরাষ্ট্র সফর কৌশলগত প্রতিযোগিতার যুগ শেষ করবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তি, সামরিক প্রভাব, বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব চলতেই থাকবে। কিন্তু এই বৈঠকগুলো যদি দুর্ঘটনাজনিত উত্তেজনা বা হঠাৎ নীতিগত বিস্ফোরণের ঝুঁকি কমাতে পারে, তাহলেই তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় অর্জন হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের চিপ নিষেধাজ্ঞা হঠাৎ আরও বিস্তৃত হওয়া, বিরল খনিজ সরবরাহ আচমকা বন্ধ হয়ে যাওয়া, কিংবা জাহাজ চলাচল সংকট আরও বড় সংঘাতে রূপ নেওয়া—এসব ঝুঁকি কমানোই এখন বড় কাজ। অনেক কিছু ভুল পথে যাওয়ার এক বছরে যদি এই বৈঠক অন্তত অনিশ্চয়তার চাপ কমাতে পারে, তাহলে সেটিই বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির বার্তা।
সিভি/এইচএম

