একটি পরিবারের মাসিক কেনাকাটার তালিকায় ভিটামিন, মেরামতের টেপ কিংবা আমের চাটনির মতো সাধারণ জিনিস থাকতে পারে। আজকের দিনে এসব পণ্য কিনতে অনেকেই আর আলাদা দোকানে যান না। কয়েকটি ক্লিকেই অর্ডার চলে যায় অ্যামাজনে। কিন্তু ব্যাপারটি শুধু কেনাকাটায় সীমাবদ্ধ নয়। একই পরিবার হয়তো অ্যামাজনের মালিকানাধীন হোল ফুডস থেকে বাজার করছে, প্রাইমে অনুষ্ঠান দেখছে, কিন্ডলে বই পড়ছে, আর অজান্তেই এমন বহু ওয়েবসাইট ব্যবহার করছে যেগুলো চলছে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের অবকাঠামোর ওপর।
এই বাস্তবতাই দেখায়, অ্যামাজন এখন কেবল একটি কেনাকাটার ওয়েবসাইট নয়; এটি এক বিশাল ব্যবসায়িক বাস্তুতন্ত্র। ১৯৯৫ সালে জেফ বেজোস একটি ভাড়া করা গ্যারেজ থেকে অনলাইন বইয়ের দোকান হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন। তিন দশকেরও কম সময়ে সেই প্রতিষ্ঠান পশ্চিমা বিশ্বের খুচরা বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনোদন, মেঘভিত্তিক কম্পিউটিং এবং গ্রাহক আচরণের বড় অংশকে প্রভাবিত করার জায়গায় পৌঁছে গেছে।
প্রশ্ন হলো, এত বড় বাজারে অ্যামাজনের মতো শক্তিশালী পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বী কেন তৈরি হলো না? ভোক্তাদের জন্য কি আরও প্রতিযোগিতা ভালো হতো না?
অ্যামাজনের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, এমন কথা পুরোপুরি সঠিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ালমার্ট ও টার্গেটের বড় অনলাইন বিক্রয়ব্যবস্থা আছে। তারাও নিজেদের সদস্যভিত্তিক সুবিধা চালু করেছে। যুক্তরাজ্যে অনলাইন মুদি বাজারে টেসকো শক্তিশালী। জার্মানিতে পোশাকের অনলাইন বিক্রিতে জালান্দো এগিয়ে। কম দামের পণ্যের ক্ষেত্রে টেমু ও শিন বড় শক্তি হয়ে উঠেছে। আবার ইবে এখনো নিলাম, পুরোনো পণ্য ও সংগ্রহযোগ্য জিনিসের ক্ষেত্রে আলাদা অবস্থান ধরে রেখেছে।
তবে মোট বাজারের হিসাবে অ্যামাজনের অবস্থান এখনো অনেক ওপরে। যুক্তরাষ্ট্রে অনলাইন খুচরা বিক্রির ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ অ্যামাজনের দখলে। এর কাছাকাছি থাকা ওয়ালমার্টের অংশ ৯ দশমিক ২ শতাংশ। ইবের অংশ প্রায় ৩ শতাংশ। যুক্তরাজ্যেও অনলাইন খুচরা বাজারের প্রায় ৩০ শতাংশ অ্যামাজনের নিয়ন্ত্রণে। গেমস্টপ সম্প্রতি ইবেকে ৫৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ৪১ বিলিয়ন পাউন্ডে কেনার প্রস্তাব দিয়েছিল, যদিও ইবে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তবু সেই ঘটনা দেখায়, অনেকেই অ্যামাজনের বিকল্প শক্তি তৈরি করার চেষ্টা করছে।
অ্যামাজনের শক্তির প্রথম বড় কারণ হলো সময়। ইন্টারনেটভিত্তিক কেনাকাটা যখন এখনকার মতো সাধারণ ছিল না, তখনই প্রতিষ্ঠানটি বাজারে ঢুকে পড়ে। শুধু ঢোকাই নয়, তারা বুঝতে পেরেছিল ভবিষ্যতের কেনাকাটায় সুবিধা, গতি ও পণ্যের বৈচিত্র্য সবচেয়ে বড় বিষয় হবে। ফলে শুরুতেই বড় গ্রাহকভিত্তি তৈরি করতে পেরেছিল অ্যামাজন।
দ্বিতীয় কারণ আরও গুরুত্বপূর্ণ। বহু বছর অ্যামাজনের বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠানটিকে দ্রুত লাভ তুলতে চাপ দেয়নি। বরং তারা লোকসান মেনে নিয়েছে, কম দামে পণ্য বিক্রি করার সুযোগ দিয়েছে এবং পরে পাওয়া আয় আবার ব্যবসা বাড়াতে ব্যবহার করতে দিয়েছে। প্রচলিত খুচরা প্রতিষ্ঠানগুলো এমন কৌশল সহজে নিতে পারত না। কারণ এতে তাদের শেয়ারমূল্য পড়ে যেতে পারত এবং বিনিয়োগকারীরা অসন্তুষ্ট হতে পারত। অ্যামাজন আজও শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেয়নি; বরং আয়কে নতুন বিনিয়োগের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেছে।
তৃতীয় কারণ হলো অ্যামাজন নিজেকে শুধু দোকান হিসেবে রাখেনি; বরং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেছে। অ্যালগরিদম, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, তথ্য বিশ্লেষণ ও দ্রুত সরবরাহব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানটিকে এমন দক্ষতা দিয়েছে যা সাধারণ খুচরা বিক্রেতাদের পক্ষে দ্রুত অনুকরণ করা কঠিন। গ্রাহক কী খুঁজছেন, কোন পণ্য বেশি বিক্রি হচ্ছে, কোন এলাকায় কীভাবে দ্রুত পৌঁছানো যায়—এসব জায়গায় তথ্যই অ্যামাজনের বড় অস্ত্র।
চতুর্থ কারণ হলো ব্যবসা বিস্তারের সাহস। অ্যামাজন বই বিক্রি থেকে শুরু করলেও এক জায়গায় থেমে থাকেনি। মেঘভিত্তিক কম্পিউটিং, নিজস্ব যন্ত্র, নিজস্ব ব্র্যান্ডের পণ্য, চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিক নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা—বহু খাতে তারা ঢুকেছে। কোনো উদ্যোগ কাজ না করলে সেখান থেকে সরে এসেছে, আবার সফল হলে তা মূল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করে শক্তি বাড়িয়েছে।
২০০০ সালে অ্যামাজন একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তন আনে। নিজে শুধু পণ্য বিক্রি না করে তৃতীয় পক্ষের বিক্রেতাদেরও নিজের প্ল্যাটফর্মে পণ্য বিক্রির সুযোগ দেয়। এতে পণ্যের সংখ্যা দ্রুত বাড়ে। বেশি পণ্য থাকায় গ্রাহকরা বেশি আসতে শুরু করেন। গ্রাহক বেশি হওয়ায় বিক্রেতারাও আরও বেশি করে অ্যামাজনে আসেন। এই চক্র একসময় এমন শক্তিশালী হয়ে যায় যে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা ভাঙা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
এরপর আসে প্রাইম। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৫ সালে এবং যুক্তরাজ্যে ২০০৭ সালে অ্যামাজন প্রাইম চালু হয়। বার্ষিক ফি দিয়ে দ্রুত ও বিনা অতিরিক্ত খরচে পণ্য পাওয়ার সুবিধা গ্রাহকদের অ্যামাজনের সঙ্গে আরও বেশি বেঁধে ফেলে। একজন গ্রাহক যখন সদস্যপদ নিয়েছেন, তখন তিনি অন্য কোথাও খোঁজার আগে অ্যামাজনেই পণ্য খোঁজেন। কারণ তার মনে থাকে, ডেলিভারির সুবিধা তো আগেই পাওয়া যাচ্ছে।
সময়ের সঙ্গে প্রাইম শুধু সরবরাহ সুবিধায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চলচ্চিত্র, ধারাবাহিক, নিজস্ব কনটেন্ট, কিছু বাজারে হোল ফুডসের ছাড় এবং আরও নানা সুবিধা। ফলে সদস্যপদ বাতিল করা গ্রাহকের কাছে সহজ সিদ্ধান্ত থাকে না। অ্যামাজন একটি দোকান থেকে ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
তবে এই আধিপত্য নিয়ে বিতর্কও কম নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল ট্রেড কমিশন এবং ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য অ্যামাজনের বিরুদ্ধে আলাদা প্রতিযোগিতা-বিরোধী মামলা করেছে। মামলাগুলোর বিচার ২০২৭ সালের শুরুতে হওয়ার কথা। অভিযোগ হলো, অ্যামাজন এমন কিছু কৌশল ব্যবহার করে যা প্রতিদ্বন্দ্বীদের বড় হতে বাধা দেয় এবং বাজারে প্রতিযোগিতা কমায়। ক্যালিফোর্নিয়া গত মাসে এ-সংক্রান্ত কিছু প্রমাণও প্রকাশ করেছে। অ্যামাজন অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং আইনি লড়াই চালাচ্ছে।
একটি বড় অভিযোগ হলো, অ্যামাজন বিক্রেতাদের অন্য জায়গায় কম দামে পণ্য বিক্রি করতে নিরুৎসাহিত করে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো বিক্রেতা অন্য ওয়েবসাইটে কম দাম দিলে অ্যামাজন তার পণ্যের দৃশ্যমানতা কমিয়ে দিতে পারে বা গুরুত্বপূর্ণ বিক্রয়স্থানে তাকে সরিয়ে দিতে পারে। এর ফলে ছোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্ল্যাটফর্মগুলো কম ফি নিয়ে বিক্রেতাদের আকৃষ্ট করলেও গ্রাহকের কাছে সস্তা দাম পৌঁছানো কঠিন হয়। কারণ বিক্রেতারা অ্যামাজনে নিজেদের বিক্রি হারানোর ভয় করেন।
এ কারণেই কেউ কেউ অ্যামাজনকে কয়েকটি আলাদা প্রতিষ্ঠানে ভেঙে দেওয়ার কথা বলেন। তাদের যুক্তি, এতে বাজারে নতুন প্রতিযোগিতার অক্সিজেন ফিরবে। তবে বাস্তবে এমন পদক্ষেপ সহজ নয়। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা মামলায় ভাঙনের দাবি উঠলেও তা সবসময় বাস্তবায়িত হয় না।
অন্যদিকে, তাত্ত্বিকভাবে বিপুল অর্থ, সময় ও অবকাঠামো থাকলে অ্যামাজনের মতো আরেকটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা সম্ভব। ওয়ালমার্টের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজটি তুলনামূলক সহজ হতে পারে, কারণ তাদের সরবরাহব্যবস্থা, দোকানভিত্তিক উপস্থিতি ও গ্রাহকভিত্তি আগে থেকেই আছে। কিন্তু অ্যামাজনের আসল শক্তি শুধু গুদাম বা ওয়েবসাইট নয়; শক্তি হলো সব ব্যবসাকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করে এমনভাবে দাঁড় করানো, যাতে একটি অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে।
তবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো কোনো প্রচলিত খুচরা বিক্রেতা থেকে আসবে না। কেনাকাটা ধীরে ধীরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কথোপকথন ব্যবস্থার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। যেমন, একজন ব্যবহারকারী কোনো আলাদা ওয়েবসাইটে না গিয়ে কথোপকথনের মাধ্যমেই পণ্য খুঁজে, তুলনা করে, কিনে ফেলতে পারেন। এই ধরনের পরিবর্তন বড় হলে অ্যামাজনের প্রচলিত অনুসন্ধাননির্ভর কেনাকাটার মডেল চাপে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে অ্যামাজনের আধিপত্য কোনো একক কারণে তৈরি হয়নি। আগে বাজারে ঢোকা, দীর্ঘমেয়াদি লোকসান মেনে নেওয়ার ক্ষমতা, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা, তৃতীয় পক্ষের বিক্রেতা ব্যবস্থা, প্রাইমের মতো গ্রাহক-আটকে রাখার কৌশল এবং লাভজনক ব্যবসা থেকে দুর্বল মার্জিনের খুচরা ব্যবসাকে সহায়তা—সব মিলেই প্রতিষ্ঠানটি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা খুব কঠিন।
তবু ইতিহাস বলে, কোনো বাজার স্থায়ীভাবে অপরিবর্তিত থাকে না। অ্যামাজন আজ পশ্চিমা অনলাইন খুচরা বাজারের সবচেয়ে শক্তিশালী নাম। কিন্তু প্রতিযোগিতা আইন, ভোক্তার আচরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কেনাকাটা এবং নতুন ব্যবসায়িক মডেল—এই চারটি বিষয় আগামী দিনে তার আধিপত্যের প্রকৃত পরীক্ষা নেবে।

