মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা ঘনিয়ে আসছে। আর সেই আশঙ্কার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা নতুন করে বাড়তে থাকায় দেশটিতে যুদ্ধ প্রস্তুতির দৃশ্য এখন প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে। শুধু সেনাবাহিনী নয়, সাধারণ নাগরিকদেরও দেওয়া হচ্ছে অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ।
রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় খোলা হয়েছে অস্থায়ী প্রশিক্ষণ বুথ। সেখানে নারী, পুরুষ এমনকি কিশোরদেরও আগ্নেয়াস্ত্র চালানোর প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, সামরিক পোশাক পরা ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষকে অস্ত্র খোলা, জোড়া দেওয়া এবং ব্যবহারের নিয়ম শেখাচ্ছেন।
তেহরানের হাফতে তির স্কয়ারে এমন কয়েকটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে অংশ নিতে দেখা গেছে বিভিন্ন বয়সী মানুষকে। কেউ মনোযোগ দিয়ে অস্ত্র সম্পর্কে শুনছেন, কেউ আবার সরাসরি রাইফেল হাতে অনুশীলন করছেন।
এই ঘটনাগুলো সামনে এসেছে এমন এক সময়, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে নতুন করে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দ্রুত শান্তি চুক্তিতে না এলে ইরানের “আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না”। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর থেকেই তেহরানে যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
একই দিনে রাজধানীতে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভও হয়েছে। সেখানে কয়েক’শ মানুষ অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাদের ছবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড। অনেকেই প্রকাশ্যে যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং দেশ রক্ষায় জীবন দেওয়ার কথাও বলেছেন।
তেহরানের তাজরিশ স্কয়ারে অংশ নেওয়া তিয়ানা নামের এক তরুণী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, দেশের জন্য জীবন দিতেও তিনি প্রস্তুত। তার ভাষায়, ইরানের জনগণ ও সেনাবাহিনী যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানজুড়ে প্রায় প্রতিদিনই সরকারপন্থী সমাবেশ হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তা হলো—সাধারণ মানুষের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার এই প্রকাশ্য উদ্যোগ।
তেহরানের ভানক স্কয়ারের একটি বুথে দেখা গেছে, কালো চাদর পরা এক নারীকে একে-৪৭ রাইফেল ব্যবহারের কৌশল শেখানো হচ্ছে। একজন মুখোশধারী সামরিক সদস্য তাকে অস্ত্র খোলা ও পুনরায় সংযোজনের ধাপগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছেন। আশপাশে আরও কয়েকজন নারী-পুরুষ একই প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন।
শুধু প্রাপ্তবয়স্করাই নয়, শিশুদের হাতেও দেখা গেছে অনুশীলনের রাইফেল। এমন দৃশ্য অনেকের মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ যুদ্ধের প্রস্তুতি এখন শুধু সামরিক ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা জনপরিসরেও ছড়িয়ে পড়ছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও এই প্রস্তুতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি চ্যানেলের উপস্থাপককে সরাসরি সম্প্রচারে অস্ত্র হাতে দেখা গেছে। একজন উপস্থাপক স্টুডিওতে দাঁড়িয়ে রাইফেল থেকে গুলিও ছুড়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দৃশ্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে যুদ্ধের মানসিক প্রস্তুতি তৈরির চেষ্টা চলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে পুরো ইরান যে যুদ্ধের পক্ষে, বিষয়টি এমন নয়। দেশটির অনেক সাধারণ নাগরিক এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। কেউ কেউ যুদ্ধ নয়, স্বাভাবিক জীবন চান।
তেহরানের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তারা শুধু এমন একটি দেশে বাঁচতে চান যেখানে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ থাকবে। তার এই মন্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—রাষ্ট্রীয় অবস্থান ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার মধ্যে এখন বড় ধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে সাধারণ মানুষকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার এই উদ্যোগ মূলত দুই ধরনের বার্তা দিচ্ছে। প্রথমত, দেশটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা করছে। দ্বিতীয়ত, জনগণকে মানসিকভাবে যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রাখার চেষ্টা চলছে।
তবে এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নতুন করে বড় ধরনের অস্থিরতার ইঙ্গিতও হতে পারে। কারণ ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা যদি আরও বাড়ে, তাহলে তার প্রভাব শুধু এই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

