ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো শহরের শান্ত একটি দুপুর মুহূর্তেই রূপ নেয় আতঙ্ক, চিৎকার আর রক্তাক্ত বিভীষিকায়। স্থানীয় সময় সোমবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ক্লেইরমন্ট এলাকার একটি ইসলামিক সেন্টার ও মসজিদে ঢুকে গুলি চালায় দুই কিশোর। কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রাণ হারান তিনজন। পরে হামলাকারী দুই কিশোর নিজেদের গুলিতে আত্মহত্যা করে। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচে।
যে ইসলামিক সেন্টারকে ঘিরে এই ভয়াবহ ঘটনা, সেটি সান দিয়েগো কাউন্টির সবচেয়ে বড় মসজিদগুলোর একটি। শুধু নামাজ নয়, প্রতিদিন সেখানে শিশুদের জন্য ইসলামি শিক্ষার ব্যবস্থাও থাকে। ক্যাম্পাসের ভেতরেই রয়েছে ‘আল রশিদ স্কুল’। হামলার সময় সেখানে শিশুরা ক্লাস করছিল। গুলির শব্দে পুরো এলাকা মুহূর্তে আতঙ্কে ভরে ওঠে।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ছোট ছোট শিশুরা একে অপরের হাত ধরে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছে। তাদের চোখেমুখে ছিল আতঙ্ক, বিভ্রান্তি আর কান্না। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে আশপাশের কয়েকটি স্কুলও সঙ্গে সঙ্গে লকডাউন করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, হামলাকারীদের একজনের বয়স ১৭ এবং অন্যজনের বয়স ১৯ বছর। প্রথমে মসজিদের সামনে তিনজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে কাছাকাছি একটি গাড়ির ভেতর থেকে দুই সন্দেহভাজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীদের ধারণা, তারা নিজেদের অস্ত্র দিয়েই আত্মহত্যা করেছে।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন মসজিদের একজন নিরাপত্তারক্ষী। হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি প্রাণ হারান। তবে পুলিশ বলছে, তার সাহসী ভূমিকার কারণেই আরও বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
সান দিয়েগো পুলিশের প্রধান স্কট ওয়াহল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নিরাপত্তারক্ষীর পদক্ষেপ ছিল অসাধারণ বীরত্বপূর্ণ। তার মতে, ওই ব্যক্তি নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা করেছেন।
ঘটনার পেছনের কারণ খুঁজতে গিয়ে পুলিশ একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায়। হামলার প্রায় দুই ঘণ্টা আগে এক কিশোরের মা পুলিশকে ফোন করে জানান, তার ছেলে কয়েকটি বন্দুক ও গাড়ি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। তার সঙ্গে আরেকজন তরুণও ছিল। দুজনের গায়েই ছিল সামরিক ছদ্মবেশী পোশাক।
পুলিশ পরে জানতে পারে, ওই তরুণ বাড়িতে একটি চিরকুট রেখে গিয়েছিল। সেখানে ছিল বিদ্বেষমূলক ও উগ্র বক্তব্য। যদিও নির্দিষ্ট কোনো মসজিদ বা ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবু তদন্তকারীরা এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। কারণ হামলার লক্ষ্য ছিল একটি ইসলামিক সেন্টার এবং সেখানে তখন শিশু ও পরিবার উপস্থিত ছিল।
এ কারণেই ঘটনাটিকে ‘বিদ্বেষমূলক অপরাধ’ হিসেবে তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। সংস্থাটি সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও তথ্য চেয়েছে। তদন্তকারীরা একটি স্থানীয় উচ্চবিদ্যালয়েও যান, যেখানে সন্দেহভাজনদের একজন পড়াশোনা করত। পাশাপাশি একটি শপিং মলেও তল্লাশি চালানো হয়, কারণ হামলাকারীদের গাড়ির অবস্থান সেখানে শনাক্ত হয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, তারা একটি আধা-স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে একটানা প্রায় ৩০ রাউন্ড গুলির শব্দ শুনেছেন। একজন বলেন, পরিস্থিতি এতটাই ভয়ংকর ছিল যে তিনি সঙ্গে সঙ্গে জরুরি সেবায় ফোন করেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ পৌঁছে যায়।
স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, ঘটনাটি শুক্রবারে ঘটলে হতাহতের সংখ্যা আরও ভয়াবহ হতে পারত। কারণ জুমার দিনে ওই মসজিদে হাজারো মানুষের সমাগম হয়।
ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক ইমাম ত্বহা হাসান গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, কোনো উপাসনালয়কে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। তার ভাষায়, “এটি একটি উপাসনালয়, যুদ্ধক্ষেত্র নয়।”
এই হামলার ঘটনায় ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসমও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যেখানে পরিবার ও শিশুরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে একত্রিত হয়, সেখানে এমন সহিংসতা মেনে নেওয়া যায় না। ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি বা সন্ত্রাস সৃষ্টির চেষ্টা ক্যালিফোর্নিয়া সহ্য করবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘটনাটিকে “ভয়াবহ পরিস্থিতি” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করবে।
এই হামলা আবারও যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় বিদ্বেষ, অস্ত্র সহিংসতা এবং তরুণদের উগ্রপন্থায় জড়িয়ে পড়ার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে শিশুদের উপস্থিতিতে একটি উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা দেশজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষমূলক হামলার সংখ্যা বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া উগ্র মতাদর্শ, মানসিক অস্থিরতা এবং সহজে অস্ত্র পাওয়ার সুযোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
সান দিয়েগোর এই রক্তাক্ত ঘটনা শুধু কয়েকটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং নিরাপত্তা, সহনশীলতা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে পুরো আমেরিকার সামনে।

