মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার মধ্যে এবার কিছুটা ভিন্ন সুর শোনা গেল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কণ্ঠে। ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছানোর ‘খুব ভালো সম্ভাবনা’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। একই সঙ্গে ট্রাম্প জানিয়েছেন, আলোচনার পথ খোলা রাখতেই আপাতত ইরানের ওপর সম্ভাব্য সামরিক হামলা স্থগিত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
১৯ মে নির্ধারিত সম্ভাব্য হামলার আগে ট্রাম্পের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আরব দেশ দীর্ঘদিন ধরেই আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিল—ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু হলে পুরো অঞ্চল আবারও ভয়াবহ অস্থিরতায় জড়িয়ে পড়তে পারে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি অনুরোধ জানায় যাতে তারা সামরিক অভিযান থেকে সরে এসে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যায়। কারণ, নতুন সংঘাত শুরু হলে শুধু ইরান নয়, গোটা উপসাগরীয় অঞ্চল জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং অবকাঠামোগত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “সমাধানে পৌঁছানোর খুব ভালো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। যদি বোমা হামলা ছাড়াই বিষয়টির সমাধান করা যায়, তাহলে আমি খুবই খুশি হব।”
তার এই বক্তব্যকে অনেকে কূটনৈতিক ভাষায় চাপ ও আলোচনার সমন্বিত কৌশল হিসেবে দেখছেন। কারণ, একদিকে ট্রাম্প আলোচনার সম্ভাবনার কথা বললেও অন্যদিকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন—সমঝোতা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাতেও প্রস্তুত।
মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বড় ধরনের বিমান হামলা চালায়। এর জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরাইলি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা উত্তেজনার পর এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় উভয় পক্ষ।
যদিও যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তবু পুরো পরিস্থিতি এখনো অস্থির। মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন হামলা ও পাল্টা হুমকি পরিস্থিতিকে আবারও উত্তপ্ত করে তুলছে। বিশেষ করে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক একাধিক বক্তব্যে ইরানকে সরাসরি সতর্ক করা হয়েছে। কখনও তিনি বলেছেন “সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে”, আবার কখনও ইঙ্গিত দিয়েছেন কঠোর সামরিক ব্যবস্থার।
এদিকে আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগও বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, যদি যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানে হামলা চালায়, তাহলে ইরান প্রতিশোধ হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এতে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থান মূলত দুই দিক সামলানোর চেষ্টা। একদিকে তিনি ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে চান, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ঝুঁকিও এড়াতে চাইছেন। কারণ, নতুন যুদ্ধ শুরু হলে বৈশ্বিক তেলের বাজার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যুদ্ধ, হুমকি ও উত্তেজনার মধ্যেও যদি আলোচনা এগোয়, তাহলে সেটি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য বড় স্বস্তির খবর হতে পারে। তবে পরিস্থিতি যেভাবে দ্রুত বদলাচ্ছে, তাতে সামান্য ভুল সিদ্ধান্তও আবার নতুন সংঘাতের পথ খুলে দিতে পারে।

