বিশ্বের অন্তত ১৯টি সমুদ্র নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব সমুদ্রে তাপপ্রবাহ আর সাময়িক ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। বরং বছরের বেশিরভাগ সময়জুড়েই সেখানে অস্বাভাবিক উষ্ণতা থেকে যেতে পারে। অর্থাৎ, সমুদ্রের জল গরম হবে, কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে ঠান্ডা হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ কমে যাবে।
সাধারণভাবে সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা আশপাশের পরিবেশ, ঋতু পরিবর্তন, বাতাসের প্রবাহ, সূর্যালোক এবং জলের স্রোতের সঙ্গে ওঠানামা করে। কখনও কখনও তাপমাত্রা স্বাভাবিক মাত্রার অনেক উপরে উঠে গেলে তাকে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ বলা হয়। তবে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে এ ধরনের তাপপ্রবাহ কিছু সময় পর কমে যায়। জলের স্রোত, গভীরতা, বাতাস এবং বৃহৎ জলরাশির মিশ্রণের মাধ্যমে তাপ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, পৃথিবীর কিছু স্থলবেষ্টিত সমুদ্রে এই স্বাভাবিক ভারসাম্য ভেঙে যেতে পারে।
বিজ্ঞানীদের নজরে এসেছে ভূমধ্য সাগর, বাল্টিক সাগর, মেক্সিকো উপসাগর, লোহিত সাগরসহ বেশ কিছু স্থলবেষ্টিত বা আংশিক স্থলবেষ্টিত সমুদ্র। এগুলো বিশাল উন্মুক্ত মহাসাগরের মতো নয়। আকারে তুলনামূলক ছোট, গভীরতাও অনেক ক্ষেত্রে কম, আর চারপাশে স্থলভাগের প্রভাব বেশি। এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই এসব সমুদ্রকে তাপের ফাঁদে পরিণত করতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা।
সমুদ্রের তাপপ্রবাহ স্থায়ী হয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু জল গরম হওয়া নয়। এর অর্থ হলো, তাপ সমুদ্রের ভেতরে আটকে থাকা। স্বাভাবিকভাবে গরম হওয়ার পর যে শীতল হওয়ার ধাপটি থাকার কথা, সেটি দুর্বল হয়ে পড়বে বা বন্ধ হয়ে যাবে। কিছু সমুদ্রে বছরে ৩৩০ দিন পর্যন্ত তাপপ্রবাহ চলতে পারে বলে গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এই সংখ্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ এটি কোনো ছোটখাটো ঋতুভিত্তিক পরিবর্তন নয়। বরং এটি নতুন ধরনের স্থায়ী জলবায়ুগত অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।
জার্মানির লাইবনিজ় ইনস্টিটিউট ফর বাল্টিক সি রিসার্চ ওয়ারনেমুন্ডে-র সমুদ্রবিশেষজ্ঞ ম্যাথিয়াস গ্রোগারের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী এই গবেষণা করেছেন। তাঁরা বিশ্বের নানা অঞ্চলের ১৯টি আবদ্ধ সমুদ্রের ওপর জলবায়ু পূর্বাভাসভিত্তিক বিশ্লেষণ চালিয়েছেন। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘কমিউনিকেশন্স আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ পত্রিকায়। গবেষকদের বক্তব্য, স্থলভাগ দিয়ে ঘেরা থাকার কারণে এসব সমুদ্রে তাপ সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। প্রশান্ত বা অতলান্তিক মহাসাগরের মতো বিশাল জলভাগে তাপ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু ছোট ও সঙ্কীর্ণ সমুদ্রে সেই সুযোগ কম।
এই কারণেই আবদ্ধ সমুদ্রগুলো দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাপ বের হওয়ার পথ পাচ্ছে না। সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ প্রকৃতিগতভাবে স্বল্পস্থায়ী হওয়ার কথা। গবেষকদের মতে, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে সমুদ্রে তাপপ্রবাহ টানা পাঁচ দিনের বেশি স্থায়ী হয় না। কিন্তু যদি কোনো অঞ্চলে বছরের অধিকাংশ সময়ই তাপপ্রবাহ চলতে থাকে, তাহলে সেটি আর স্বাভাবিক চরম আবহাওয়ার ঘটনা থাকে না। তখন সেটি সমুদ্রের নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়তে পারে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর। সমুদ্রের প্রাণজগৎ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। মাছ, প্রবাল, শৈবাল, অণুজীব, সামুদ্রিক উদ্ভিদ, ঝিনুক, চিংড়ি, কাঁকড়া—প্রতিটি প্রাণী ও উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রা দরকার। জল যদি দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরম থাকে, তাহলে অনেক প্রজাতির প্রজনন, খাদ্য গ্রহণ, চলাচল ও বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কোনো কোনো প্রজাতি স্থান পরিবর্তন করতে পারে, আবার অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশেষ করে যেসব সমুদ্র তুলনামূলক অগভীর, সেখানে তাপমাত্রা দ্রুত বদলায়। গভীর সমুদ্রে তাপ নিচের স্তরে ছড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে, কিন্তু অগভীর সমুদ্রে সেই সামর্থ্য কম। ফলে ওপরের স্তরের তাপ দীর্ঘ সময় ধরে পুরো জলভাগে প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে মাছের আবাসস্থল বদলে যেতে পারে, খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে যেতে পারে এবং স্থানীয় মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই সমস্যার পেছনে বড় কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা বিশ্ব উষ্ণায়নকে দেখছেন। শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি তেল, পরিবহন এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফলে বায়ুমণ্ডলে তাপধারণকারী গ্যাসের পরিমাণ বেড়েছে। এর প্রভাব শুধু বাতাসের তাপমাত্রায় সীমাবদ্ধ নেই, সমুদ্রও সেই তাপ শোষণ করছে। পৃথিবীর জলভাগ দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত তাপের বড় অংশ নিজের মধ্যে ধরে রেখেছে। এখন সেই জমে থাকা তাপ অনেক জায়গায় বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ২০০০ সালের আশপাশে কলকারখানাজনিত দূষণের কারণে আবদ্ধ সমুদ্রগুলো উন্মুক্ত মহাসাগরের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হতে শুরু করে। শিল্প দূষণের একটি জটিল দিকও এখানে উঠে এসেছে। একসময় বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র ও জ্বালানি তেল থেকে নির্গত সালফেটজাত দূষণ সূর্যালোকের একটি অংশ মহাকাশে প্রতিফলিত করে দিত। এতে পৃথিবীর কিছু সমুদ্র দীর্ঘ সময় আংশিক ছায়াচ্ছন্ন অবস্থায় ছিল। পরে মানুষের উদ্যোগে বায়ুমণ্ডল কিছুটা দূষণমুক্ত হলে সেই ছায়ার প্রভাব কমে যায়। এর পরপরই সমুদ্রের জল দ্রুত উষ্ণ হতে শুরু করে। আবদ্ধ সমুদ্রগুলোতে এই পরিবর্তনের প্রভাব ছিল আরও বেশি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দূষণ কমানো অবশ্যই জরুরি, কিন্তু দীর্ঘদিনের জলবায়ুগত ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলে তার প্রতিক্রিয়াও জটিল হতে পারে। বাতাস পরিষ্কার হওয়া ভালো, কিন্তু একই সঙ্গে তাপধারণকারী গ্যাস কমানো না গেলে সমুদ্র আরও বেশি সূর্যালোক ও তাপ গ্রহণ করতে পারে। ফলে জলবায়ু নীতিতে শুধু দৃশ্যমান দূষণ কমানো যথেষ্ট নয়; সামগ্রিকভাবে উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা আরও গভীর। তাঁদের দাবি, পৃথিবীতে বর্তমানে যে হারে দূষণ হচ্ছে, সেই পরিমাণ যদি আর না-ও বাড়ে, তবুও ২১০০ সালের আগে ১৯টি সমুদ্রের মধ্যে অন্তত ১৫টি প্রায় স্থায়ী তাপপ্রবাহের মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ, দূষণ একই মাত্রায় থাকলেও বিপদ এড়ানো যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ অতীতের তাপ, বর্তমানের উষ্ণতা এবং ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তন একসঙ্গে মিলে সমুদ্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে।
লোহিত সাগর ও তাইল্যান্ড উপসাগরের মতো জলভাগে উষ্ণায়নের প্রবণতা আগামী ৩০ বছরের পূর্বাভাসের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এটি শুধু বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যান নয়, বরং উপকূলীয় জনগোষ্ঠী, মৎস্যজীবী, পর্যটন, সামুদ্রিক খাদ্য উৎপাদন এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য সরাসরি সতর্কবার্তা। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়লে মাছের প্রজনন এলাকা বদলে যেতে পারে, প্রবাল ক্ষয় হতে পারে, ক্ষতিকর শৈবালের বিস্তার বাড়তে পারে এবং সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল অস্থিতিশীল হতে পারে।
চলতি শতকের শেষে এই ধরনের সমুদ্রগুলোর তাপমাত্রা অনেকটা বেড়ে গেলে সামুদ্রিক অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বিপন্ন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। এই সম্ভাবনা বাস্তব হলে তা শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটও তৈরি করবে। কারণ পৃথিবীর বহু মানুষ জীবিকা, খাদ্য, বাণিজ্য এবং সংস্কৃতির জন্য সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকট ধীরে ধীরে তৈরি হলেও তার প্রভাব একসময় হঠাৎ তীব্র হয়ে উঠতে পারে। যখন কোনো সমুদ্র দীর্ঘদিন অতিরিক্ত গরম থাকে, তখন প্রাণীরা মানিয়ে নেওয়ার সময় পায় না। ছোট প্রজাতি দ্রুত মারা যায়, বড় প্রজাতি স্থান বদলায়, আর পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। ফলে একটি সমুদ্রের তাপপ্রবাহ শুধু ওই জলভাগের সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু স্থিতি এবং জীববৈচিত্র্যের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।
এই গবেষণা আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা তুলে ধরে: সমুদ্রকে অসীম সহনশীল ধরে নেওয়া ভুল। এতদিন মনে করা হতো, বিশাল জলরাশি সব তাপ শোষণ করে নেবে এবং পৃথিবীর ভারসাম্য কিছুটা রক্ষা করবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, কিছু সমুদ্র নিজেই তাপের চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে স্থলবেষ্টিত সমুদ্রগুলো উন্মুক্ত মহাসাগরের মতো দ্রুত তাপ ছড়িয়ে দিতে পারছে না।
তাই এখন প্রয়োজন নিয়মিত তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর পরিকল্পনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, তাপধারণকারী গ্যাস কমানো এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য আগাম প্রস্তুতি। সমুদ্রের তাপপ্রবাহকে আর শুধু সাময়িক আবহাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি ক্রমেই স্থায়ী জলবায়ুগত সংকটে রূপ নিতে পারে।
সমুদ্র যদি নিজেই আর ঠান্ডা হতে না পারে, তাহলে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র কতদিন ভারসাম্য ধরে রাখতে পারবে? ১৯টি সমুদ্রের এই সতর্কবার্তা তাই শুধু বিজ্ঞানীদের গবেষণাগারের বিষয় নয়; এটি পুরো পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর চিন্তার কারণ।

