ভালো চাকরি, মোটা বেতন আর উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে তরুণদের রাশিয়ায় নেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালে যে ভয়াবহ বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা একের পর এক মৃত্যুসংবাদে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় বিদেশে যাওয়া যুবকেরা এখন কেউ ফিরছেন লাশ হয়ে, কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে আটকা পড়ে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন ভিডিও বার্তায়।
এবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন আরও দুই বাংলাদেশি যুবক। তারা হলেন মাদারীপুরের সুরুজ কাজী (৩৫) এবং কিশোরগঞ্জের জাহাঙ্গীর হোসেন (২৪)। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও বার্তায় কুমিল্লার ইউসুফ খান নামের আরেক বাংলাদেশির মৃত্যুর খবরও সামনে এসেছে। যদিও তাঁর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত রুশ বাহিনীর হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ করতে গিয়ে অন্তত ৩৯ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে ভেঙে পড়ছে একটি পরিবার, নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য স্বপ্ন।
মাদারীপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ খাগড়াছড়া এলাকার সুরুজ কাজী ছিলেন পরিবারের বড় সন্তান। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় হওয়ায় সংসারের দায়িত্বও ছিল তাঁর কাঁধে। পরিবারের ভালো ভবিষ্যতের আশায় তিনি রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে দাঁড়ায় মৃত্যুর পথে হাঁটা।
গত বুধবার রাতে তাঁর মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর থেকেই বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। বাবা শাহাবুদ্দিন কাজী যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না, তাঁর ছেলেটি আর ফিরবে না। ভাঙা কণ্ঠে তিনি শুধু একটাই দাবি জানিয়েছেন— শেষবারের মতো যেন ছেলের মুখটা দেখতে পারেন।
এই পরিবারের ট্র্যাজেডি আরও গভীর। মাত্র তিন মাস আগে ঠান্ডাজনিত রোগে মারা যায় সুরুজের দুই বছরের শিশু সন্তান। সেই শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এবার স্বামীকেও হারালেন স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। অল্প বয়সী এই নারীর চোখে এখন শুধু অন্ধকার। তিনি বলছেন, তাঁর স্বামী নেই, সন্তানও নেই— এখন বেঁচে থাকার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিবার যোগাযোগ করলে মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে সহযোগিতা করা হবে। তবে বাস্তবতা হলো, বিদেশের যুদ্ধক্ষেত্রে নিহতদের মরদেহ ফেরত আনার প্রক্রিয়া অনেক সময় জটিল ও দীর্ঘ হয়।
কিশোরগঞ্জেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের বাগপাড়া গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেন কয়েক দিন আগে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর স্বজনরা।
এর আগেও চলতি মাসের ২ মে রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্ত এলাকায় ড্রোন হামলায় নিহত হন কিশোরগঞ্জের আরেক যুবক রিয়াদ রশিদ (২৮)। একই ঘটনায় মারা যান ময়মনসিংহের আবদুর রহিম (৩০)।
এক মাসের ব্যবধানে একই জেলার দুই তরুণের মৃত্যু স্থানীয় মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে। গ্রামগুলোতে এখন বিদেশে চাকরির নামে তরুণদের পাঠানো নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, নির্মাণকাজ বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে চাকরির কথা বলে তাদের সন্তানদের রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে। অনেককে মাসে এক লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
গোপালগঞ্জের তিন যুবকের পরিবার জানিয়েছে, তারা নির্মাণ খাতে কাজের আশায় রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু পরে বুঝতে পারেন, তাদের সামনে যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
এই ঘটনায় ঢাকার খিলক্ষেত থানায় একটি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, চাকরির নামে প্রতারণা করে তরুণদের বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভিডিওতে এক বাংলাদেশি তরুণ অভিযোগ করেন, তাদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
তিনি জানান, তাদের সাতজনের একটি দলে ইতোমধ্যে তিনজন নিহত হয়েছেন। কেউ মারা গেছেন মাইনের বিস্ফোরণে, কেউ ড্রোন হামলায়।
ভিডিও বার্তায় আরও ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে। দাবি করা হয়, একজন বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠাতে পারলে দালালচক্র প্রায় পাঁচ লাখ ৮০ হাজার রুবল, অর্থাৎ প্রায় ৯ লাখ টাকা পর্যন্ত কমিশন পায়।
তরুণটির ভাষ্য অনুযায়ী, নাগরিকত্ব ও চাকরির লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে মানুষ নেওয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট সংখ্যক লোক পাঠাতে পারলে দালালদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও দেওয়া হয়। অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করিয়ে বহু তরুণকে সেখানে পাঠানো হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যারা যাচ্ছেন তাদের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের মধ্যে জড়িয়ে পড়ছেন। অথচ যাওয়ার আগে তাদের বেশিরভাগই জানতেন না সামনে কী অপেক্ষা করছে।
বিদেশে কাজের স্বপ্ন বাংলাদেশের বহু তরুণের জীবনের বড় আকাঙ্ক্ষা। বেকারত্ব, আর্থিক সংকট ও পরিবারের দায়িত্ব তাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগাচ্ছে সংঘবদ্ধ দালালচক্র।
তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন বিজ্ঞাপন ও পরিচিতজনের মাধ্যমে তরুণদের টার্গেট করছে। উচ্চ বেতন, স্থায়ী নাগরিকত্ব, উন্নত জীবন— এসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দালালদের ধরলেই হবে না। পুরো নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশে চাকরির বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রাশিয়া বা ইউক্রেনে যাওয়া ঠেকাতে সরকার সক্রিয় রয়েছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এ বিষয়ে নজরদারি করছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— এত মৃত্যুর পরও কেন তরুণরা এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন? আর কেনই বা দালালচক্রকে পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না?

