গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ দুই বছর ধরে চলা ভয়াবহ যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়ের পেছনে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বের অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বশাসিত অঞ্চলের সামরিক সহায়তার তথ্য সামনে এসেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার কয়েক মাসব্যাপী অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সমালোচনা, গণহত্যার আশঙ্কা এবং বিশ্বব্যাপী বিক্ষোভের মধ্যেও ইসরাইলের কাছে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বন্ধ হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ইসরাইলে মোট ২ হাজার ৬০৩টি সামরিক চালান পৌঁছেছে। এসব চালানের আর্থিক মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন শেকেল, যা মার্কিন মুদ্রায় প্রায় ৮৮ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের সমান।
অনুসন্ধানটি তৈরি করা হয়েছে ইসরাইলি ট্যাক্স কর্তৃপক্ষের আমদানি তথ্য, শুল্ক রেকর্ড এবং তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পাওয়া বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণ করে। প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হিসেবে উঠে এসেছে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত গণহত্যার ঝুঁকি নিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়ার পরও অস্ত্র সরবরাহের গতি কমেনি, বরং বড় অংশের সামরিক পণ্য সেই সময়ের পরই ইসরাইলে পৌঁছেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলের সবচেয়ে বড় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। মোট অস্ত্র আমদানির ৪২ শতাংশের বেশি এসেছে ওয়াশিংটন থেকে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত, যেখান থেকে এসেছে মোট সরবরাহের ২৬ শতাংশ।
ভারতের বিভিন্ন বেসরকারি ও যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইসরাইলি বাহিনীর জন্য ভারী কামানের গোলার খোল, বিস্ফোরক সামগ্রী এবং বুস্টার পেলেট সরবরাহ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া রোমানিয়া, তাইওয়ান ও চেক প্রজাতন্ত্রও বড় সরবরাহকারীদের তালিকায় রয়েছে।
একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। সম্মিলিতভাবে ইসরাইলের মোট সামরিক আমদানির প্রায় ১৯ শতাংশ এসেছে ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে। যদিও এসব দেশের অনেক সরকার প্রকাশ্যে গাজায় সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছে, বাস্তবে তাদের অনুমোদিত লাইসেন্সের আওতায় যুদ্ধ চলাকালেও অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ইসরাইলে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় দ্বৈত অবস্থান। একদিকে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে রাজনৈতিক বক্তব্য, অন্যদিকে একই সময়ে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত রাখা—এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক কূটনীতির নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
প্রতিবেদনে স্পেন, কানাডা, ফ্রান্স ও ইতালির উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। এসব দেশ প্রকাশ্যে নতুন অস্ত্র লাইসেন্স স্থগিতের কথা বললেও, আগে অনুমোদিত চালানের মাধ্যমে যুদ্ধকালীন সময়ে বিপুল পরিমাণ সামরিক পণ্য ইসরাইলে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এমনকি ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের জন্য পরিচিত তুরস্ক ও ব্রাজিলের মতো দেশ থেকেও যুদ্ধের শুরুর দিকে সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতসংশ্লিষ্ট কিছু যন্ত্রাংশ ইসরাইলে প্রবেশ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। যদিও পরে তুরস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্য বন্ধের ঘোষণা দেয়, তারপরও বিকল্প বন্দর ও বিমানপথ ব্যবহার করে কিছু পণ্য প্রবেশের তথ্য পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সতর্কবার্তার পরও যেসব দেশ অস্ত্র সরবরাহ চালিয়ে গেছে, তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠতে পারে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ স্টিফেন হামফ্রেস এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশ্লেষক গেরহার্ড কেম্পের মতে, গণহত্যা সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলোর শুধু গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানানোই যথেষ্ট নয়, সম্ভাব্য গণহত্যা ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও তাদের দায়িত্ব।
জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন বহুবার অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানালেও বাস্তবে বৈশ্বিক অস্ত্র সরবরাহ চেইন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সহায়তার কারণেই ইসরাইল গাজায় এত বড় ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে।
গাজা যুদ্ধ এখন শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং অস্ত্র বাণিজ্যের জটিল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। নতুন এই অনুসন্ধান সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

