বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন প্যারিসের নতুন মেয়র এমানুয়েল গ্রিগোয়ার। বৈঠকে সামাজিক ব্যবসা, তরুণদের নেতৃত্ব এবং বৈশ্বিক সামাজিক পরিবর্তনের নানা বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। একই সঙ্গে প্যারিসকে সামাজিক ব্যবসা ও উদ্ভাবনের অন্যতম আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন নতুন মেয়র।
শুক্রবার (২৯ মে) অনুষ্ঠিত এই বৈঠক শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না; বরং এটি ভবিষ্যৎ সমাজ ও অর্থনীতির নতুন চিন্তাধারাকে সামনে নিয়ে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় ড. ইউনূসের বহুল আলোচিত ‘থ্রি জিরো’ ধারণা, যার মূল লক্ষ্য হলো শূন্য কার্বন নিঃসরণ, শূন্য সম্পদ কুক্ষিগতকরণ এবং শূন্য বেকারত্ব নিশ্চিত করা।
বৈঠকে এমানুয়েল গ্রিগোয়ার জানান, প্যারিসকে সামাজিক ব্যবসার একটি বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ‘সামাজিক ব্যবসা দিবস’কে বার্ষিক উৎসবের রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তার মতে, শুধু মুনাফাভিত্তিক অর্থনীতি নয়, বরং মানবকল্যাণ ও সামাজিক সমস্যার টেকসই সমাধানকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তোলার সময় এসেছে।
ড. ইউনূস বৈঠকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠা সাত হাজারের বেশি ‘থ্রি জিরো ক্লাব’-এর কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তরুণদের অংশগ্রহণ ছাড়া একটি বৈষম্যহীন ও টেকসই পৃথিবী গড়া সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, বেকারত্ব এবং সম্পদের অসম বণ্টনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্ব দিতে হবে।
আলোচনায় ড. ইউনূস একটি বিকল্প অর্থনৈতিক ধারণার কথাও তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, শুধুমাত্র দাতব্য অনুদানের ওপর নির্ভর না করে সামাজিক পরিবর্তনমুখী তহবিলে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগ সমাজে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং সম্পদের কেন্দ্রীভবন কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল আগামী জুন মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য ‘সামাজিক ব্যবসা দিবস’-এ প্যারিসের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ। এ উপলক্ষে মেয়র এমানুয়েল গ্রিগোয়ার তার প্রতিনিধি হিসেবে ডেপুটি মেয়র অড্রে পুলভার এবং প্যারিস কাউন্সিলের সদস্য এলিসা ইয়াভশিৎজকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটি বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে সামাজিক উদ্ভাবনভিত্তিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য, পরিবেশগত সংকট এবং কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ বাড়ছে, তখন সামাজিক ব্যবসার মতো ধারণা নতুন সমাধানের পথ দেখাতে পারে। প্যারিসের মতো একটি বিশ্বনগরী যদি এই মডেলকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়নের পথে এগোয়, তবে তা অন্য শহরগুলোর জন্যও অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
বৈঠকের শেষ দিকে উভয় পক্ষ প্যারিসকে সামাজিক উদ্ভাবনের একটি মডেল শহর হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাদের বিশ্বাস, মানবকল্যাণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ ভবিষ্যতের পৃথিবীকে আরও ন্যায়সঙ্গত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই করে তুলতে সহায়তা করবে।

