হরমুজ প্রণালি আবার আংশিকভাবে খুলে যেতে পারে—এমন সম্ভাবনা এখন সামনে আসছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতে কি সত্যিই পারস্য উপসাগর অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি হবে, নাকি এটি শুধু অস্থায়ী স্বস্তি? বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি এখন আর শুধু একটি সামুদ্রিক পথ নয়; এটি হয়ে উঠেছে তেল, নিরাপত্তা, পরমাণু কর্মসূচি, চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং রাশিয়ার কৌশলগত লাভের কেন্দ্রবিন্দু।
এই সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আগের মতো একক নিয়ন্ত্রণ আর নেই। একসময় পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে শেষ কথা বলত ওয়াশিংটন। কিন্তু এখন বাস্তবতা বদলে গেছে। ইরান এমন এক চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা অর্জন করেছে, যা আগে এত স্পষ্টভাবে তার হাতে ছিল না। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করার হুমকি এখন ইরানের জন্য বড় কৌশলগত অস্ত্র।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে এই মুহূর্তে তিনটি বড় লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি থামানো বা পিছিয়ে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালিকে স্থায়ীভাবে খোলা রাখা। তৃতীয়ত, তাইওয়ান প্রশ্নে চীনের কাছে দুর্বল বা পরাজিত নেতা হিসেবে দেখা না দেওয়া। সমস্যা হলো, এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। বাস্তব রাজনৈতিক সমীকরণ বলছে, ট্রাম্প সর্বোচ্চ দুটি লক্ষ্য পূরণ করতে পারেন, কিন্তু তিনটি নয়।
চীনের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সি চিন পিংয়ের সাম্প্রতিক বৈঠকের পর ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র চায় চীন পারস্য উপসাগর সংকটে আরও সরাসরি ভূমিকা নিক। চীন চাইলে ইরানের সঙ্গে এমন একটি সমঝোতার পথ তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কিছু আশ্বাস পাবে এবং ইরান পাবে ব্যাপক অবকাঠামো বিনিয়োগ ও হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা।
কিন্তু চীন বিনা মূল্যে এমন ভূমিকা নেবে—এমন ভাবার সুযোগ নেই। চীনের নিজস্ব হিসাব অনেক গভীর। চীন প্রতিদিন ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল আমদানি করে, তাই জ্বালানির দাম কম থাকুক, সেটি অবশ্যই তার স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। তবু চীনের হাতে বড় মজুত রয়েছে, ফলে বর্তমান দামের ধাক্কা সামলানোর আত্মবিশ্বাসও তাদের আছে। একই সঙ্গে চীন কাতার থেকে তার তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কিনত, কিন্তু চলমান সংঘাত ও অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে সেই সরবরাহও চাপে পড়েছে।
তবু চীনের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত জ্বালানি নয়, তাইওয়ান। পারস্য উপসাগরে সাহায্যের বিনিময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কৌশলগত ছাড় চাইতে পারে। চীন এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইবে, যেখানে সে একদিকে শান্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে দেখাবে, অন্যদিকে তাইওয়ানকে বোঝানোর চেষ্টা করবে যে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য বেইজিংয়ের সঙ্গে থাকা তাদের জন্য ভালো। চীনের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক কৌশল হলো যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি উদ্ধার না করা, বরং ধীরে ধীরে সহায়তা দেওয়া। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক দুর্বলতা দৃশ্যমান হয় এবং চীনের আঞ্চলিক শক্তি আরও বড় হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় সম্ভাব্য পথ হলো সামরিক উত্তেজনা বাড়ানো। ট্রাম্প চাইলে ইরানের স্থলপথের রপ্তানি পথ, সেতু, রাস্তা, ভবন বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর আরও হামলা চালাতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি যে ব্যাপক ধ্বংস ঘটাতে পারে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু ধ্বংস আর সমাধান এক জিনিস নয়। কোনো দেশকে অশাসনযোগ্য করে তোলা যায়, কিন্তু তাতে সশস্ত্র প্রতিরোধ শেষ হয়ে যায় না।
এখানে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো হরমুজ প্রণালির ওপর সস্তা ও সহজে চালানো যায় এমন চালকবিহীন উড়োজাহাজের হুমকি। ইরান যদি ভেঙে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে হুমকি কমবে না বরং বাড়তেও পারে। কারণ তখন কোনো একক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করা কঠিন হয়ে যাবে। তেলবাহী জাহাজের মালিক, নাবিক এবং বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু বাস্তব হামলা দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না; তারা হুমকির বিশ্বাসযোগ্যতাও বিবেচনা করে। যদি সামান্য সহিংসতাই জাহাজ চলাচল কমিয়ে দিতে পারে, তাহলে বড় যুদ্ধ ছাড়াই হরমুজ প্রণালি কার্যত অস্থির হয়ে থাকবে।
এই পরিস্থিতিতে পারস্য উপসাগরের প্রতিবেশী দেশগুলোও বড় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। সংঘাত শুধু ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং অঞ্চলজুড়ে অবকাঠামো, জ্বালানি সরবরাহ, বন্দর, বাণিজ্যপথ এবং বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বিশ্ববাজারেও পড়বে। তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, কৃত্রিম পলিমারজাত পণ্য ও সারের দামে চাপ তৈরি হতে পারে।
তৃতীয় পথ হলো যুক্তরাষ্ট্রের হাত গুটিয়ে নেওয়া। ট্রাম্প চাইলে বলতে পারেন, পারস্য উপসাগরের দেশগুলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা অন্য কেউ দায়িত্ব নিক। বাইরে থেকে দেখলে এতে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে যেতে পারে। কিন্তু সেটি হলে শর্ত নির্ধারণ করবে মূলত ইরান ও চীন। এতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে প্রায় কোনো অগ্রগতি পাবে না। বরং যুদ্ধ ও উত্তেজনার এত মূল্য দেওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র খালি হাতে ফিরে আসবে। এমন পরিস্থিতিকে জয় হিসেবে তুলে ধরা হোয়াইট হাউসের জন্য খুব কঠিন হবে।
সবকিছু মিলিয়ে সবচেয়ে সম্ভাব্য নিকটবর্তী বাস্তবতা হলো এক ধরনের অস্বস্তিকর যুদ্ধবিরতি। অর্থাৎ, উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ হবে না, আবার সম্পূর্ণ যুদ্ধও স্থায়ী রূপ নেবে না। যুক্তরাষ্ট্র যখন কম আক্রমণাত্মক থাকবে, তখন জাহাজ চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার কঠোর পদক্ষেপ নেয়, ইরানও সমানুপাতিকভাবে হরমুজ প্রণালিতে চাপ তৈরি করতে পারে।
এই ওঠানামার পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে অস্থায়ী স্বস্তি আনতে পারে। কিছু সময়ের জন্য তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, কৃত্রিম পলিমারজাত পণ্য ও সারের দামে চাপ কমতে পারে। সেই সুযোগে সীমিত আস্থার পরিবেশ তৈরি হতে পারে এবং পরমাণু আলোচনার নতুন পথও খুলতে পারে। কিন্তু এই পথ অত্যন্ত সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য ভুল পদক্ষেপেই সবকিছু আবার ভেঙে পড়তে পারে।
এই সংকটে রাশিয়ার লাভের সুযোগ সবচেয়ে বেশি। তেলের দাম বাড়লে এবং রুশ তেলশিল্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কার্যত শিথিল থাকলে ভ্লাদিমির পুতিন বেশি বৈদেশিক মুদ্রা পেতে পারেন। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে এই অর্থ রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পুতিন চাইবেন যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে আটকে থাকুক, বারবার বিব্রত হোক এবং রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর চাপ কমিয়ে রাখুক।
রাশিয়া একই সঙ্গে ইরানকে চালকবিহীন উড়োজাহাজ ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেও লাভবান হতে পারে। এটি শুধু সামরিক সহায়তা নয়, মস্কোর জন্য লাভজনক ব্যবসায়িক পথও। ফলে রাশিয়া এই সংকটের সমাধানকারী নয়, বরং সম্ভাব্য বাধাদাতা হিসেবে কাজ করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালির সংকট বিশ্বরাজনীতির একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের যুগ সম্ভবত শেষের পথে। এর জায়গায় আসছে এক জটিল, বিভক্ত ও অনিশ্চিত শক্তির ভারসাম্য, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, চীন ও রাশিয়া প্রত্যেকেই নিজের স্বার্থে হিসাব করছে।
হরমুজ প্রণালি হয়তো খুলবে, কিন্তু শর্তহীনভাবে নয়। জাহাজ চলাচল চলবে, কিন্তু নিশ্চিন্তে নয়। জ্বালানির দাম কমতে পারে, কিন্তু স্থায়ীভাবে নয়। এই সংকট তাই শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিরও সংকট। বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও এর অর্থ হলো অনিশ্চিত খরচ, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে নতুন চাপের আশঙ্কা।
অতএব, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এখন শুধু একটি সমুদ্রপথের নিরাপত্তা প্রশ্ন নয়। এটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার পরীক্ষা, যেখানে সামরিক শক্তি, কূটনীতি, জ্বালানি বাজার এবং ভূরাজনৈতিক দরকষাকষি একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এই সংকটের শেষ কোথায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—হরমুজ প্রণালি খোলা থাকলেও বিশ্ব আর আগের মতো নিরাপদ ও স্থিতিশীল অবস্থায় নেই।

