পাকিস্তানের অস্থির বেলুচিস্তান প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে অন্তত ১৭ জন সশস্ত্র সদস্য নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। ইসলামাবাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতরা এমন একটি গোষ্ঠীর সদস্য, যাদের পাকিস্তান ‘ভারত-সমর্থিত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক’ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে।
বুধবার (৩ জুন) আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বেলুচিস্তানের বিভিন্ন জেলায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানের লক্ষ্য ছিল অঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটি ও নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া।
সেনাবাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ মে কোয়েটায় একটি যাত্রীবাহী ট্রেনকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনার পর নিরাপত্তা বাহিনী আরও ব্যাপক অভিযান শুরু করে। ওই হামলাকে কেন্দ্র করেই মাস্তুঙ্গ, নুশকি, জেহরি, খুজদার এবং কেচ জেলায় ধারাবাহিক চিরুনি তল্লাশি ও সামরিক অভিযান চালানো হয়।
পাকিস্তানি বাহিনীর দাবি, অভিযানের সময় নিরাপত্তা সদস্যদের সঙ্গে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর তীব্র বন্দুকযুদ্ধ হয়। সেনাবাহিনী এই গোষ্ঠীকে ‘ফিতনা আল-হিন্দুস্তান’ নামে উল্লেখ করেছে। সংঘর্ষে গোষ্ঠীটির ১৭ সদস্য নিহত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সামরিক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এই অভিযান শুধু কয়েকজন সদস্যকে নির্মূল করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে সক্রিয় একটি সশস্ত্র নেটওয়ার্কের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানা সম্ভব হয়েছে। তাদের মতে, অভিযানের ফলে ভবিষ্যতে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হবে।
অভিযান শেষে বিভিন্ন আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কিছু প্রস্তুতকৃত বিস্ফোরক যন্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে, যেগুলো ভবিষ্যৎ হামলায় ব্যবহার করা হতে পারত বলে দাবি করেছে নিরাপত্তা বাহিনী।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর দাবি, নিহত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বেলুচিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় সহিংস কর্মকাণ্ড, নাশকতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, পরিবহন ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা চৌকিগুলোকে লক্ষ্য করে তারা নিয়মিত হামলা চালিয়ে আসছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এই অভিযানের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ২৪ মে কোয়েটার চামান ফটকের কাছে সংঘটিত একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা। ওই হামলায় ফ্রন্টিয়ার কর্পসের তিন সদস্যসহ অন্তত ১৪ জন নিহত হন। আহত হন নারী ও শিশুসহ আরও বহু মানুষ। সেই ঘটনার পর থেকেই নিরাপত্তা বাহিনী বেলুচিস্তানজুড়ে অভিযান জোরদার করে।
বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তান বহু বছর ধরেই পাকিস্তানের সবচেয়ে স্পর্শকাতর নিরাপত্তা অঞ্চলের একটি। প্রদেশটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং সীমান্তসংক্রান্ত জটিলতা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। ফলে সেখানে সহিংসতার ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়।
২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে হামলার সংখ্যা বেড়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে, কিছু স্থানীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী ভারতের সহায়তা পাচ্ছে। তবে ভারত বরাবরই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। ফলে বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।
সাম্প্রতিক অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সম্ভাব্য নতুন হামলা প্রতিরোধ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি এখন শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে এই অঞ্চলের প্রতিটি বড় সামরিক অভিযান এবং তার ফলাফল আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

