চার মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে রাখা সংঘাতের পর নতুন এক মোড়ের ইঙ্গিত দিল যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, ইরানের ভেতরে পরিচালিত ধারাবাহিক সামরিক অভিযান এখন আর অব্যাহত রাখা হবে না। মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের মূল লক্ষ্য পূরণ হয়েছে এবং এখন কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি দেশটির আইনপ্রণেতাদের সামনে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে যে অভিযান চালানো হচ্ছিল, তা এখন সমাপ্ত হয়েছে। তার দাবি, দীর্ঘ এই সামরিক অভিযানের ফলে ইরানের প্রতিরক্ষা-শিল্প অবকাঠামোর একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতা এবং ড্রোন মজুতেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে।
রুবিওর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। যদিও যুদ্ধবিরতি বলবৎ আছে, তবুও পুরো অঞ্চল এখনো উত্তেজনামুক্ত নয়। বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা এবং নিরাপত্তা সংকটের খবর সামনে আসছে, যা পরিস্থিতিকে এখনো অস্থিতিশীল করে রেখেছে।
সম্প্রতি কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সংঘটিত একটি ড্রোন হামলা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ওই হামলায় বিমানবন্দরের একটি যাত্রী টার্মিনাল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাণ হারান একজন ভারতীয় নাগরিক এবং আহত হন আরও বহু মানুষ। ঘটনার পর সাময়িকভাবে বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
চলতি বছরের শুরুতে শুরু হওয়া সংঘাত এখন চতুর্থ মাসে প্রবেশ করেছে। এই সময়ের মধ্যে শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালি এখনো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে।
ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর নিজের সামরিক প্রভাব বজায় রেখেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে। ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা পুরোপুরি শেষ হয়নি।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন যাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা যায়। তার মতে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি।
তবে সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যেতে চায়। রুবিও বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং ভবিষ্যতে কোনো সমঝোতা হলে সেটি অতীতের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর ও কার্যকর হতে হবে।
তিনি বিশেষভাবে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ভবিষ্যতের কোনো সমঝোতা আগের চুক্তির পুনরাবৃত্তি হবে না। যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি কাঠামো চায়, যা তাদের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সামরিক অভিযান বন্ধের এই ঘোষণা একদিকে যেমন উত্তেজনা প্রশমনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে এটি কূটনৈতিক আলোচনার জন্য নতুন সুযোগও তৈরি করতে পারে। তবে যুদ্ধবিরতি এখনো ভঙ্গুর, আঞ্চলিক উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি এবং উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস রয়ে গেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ এখনো দীর্ঘ এবং জটিল বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
আগামী কয়েক সপ্তাহে কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই সংঘাত সত্যিই শেষের পথে কি না, নাকি এটি সাময়িক বিরতির পর আবারও নতুন রূপে ফিরে আসবে।

