দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে রাশিয়া ও আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক সামরিক সহযোগিতা চুক্তি। মস্কো ও কাবুলের মধ্যে এই সমঝোতা স্বাক্ষরের পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এতে পাকিস্তানের নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক যখন ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে, তখন এই চুক্তি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
তবে পাকিস্তানের সরকারি ও নিরাপত্তা মহলের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। তাদের দাবি, এই চুক্তি আপাতত এমন কোনো সামরিক বাস্তবতা তৈরি করছে না, যা পাকিস্তানের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
কী রয়েছে চুক্তিতে?
গত ২৭ মে মস্কোতে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের সচিব সের্গেই শোইগু এবং আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা মোহাম্মদ ইয়াকুব মুজাহিদের মধ্যে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
মোল্লা ইয়াকুব আফগান তালেবান প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের ছেলে। এই চুক্তি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন রাশিয়া ইতোমধ্যে তালেবান সরকারকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৈধতা দেওয়ার পথে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর একটি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
চুক্তির আনুষ্ঠানিক বিবরণ পুরোপুরি প্রকাশ না করা হলেও আফগান সূত্রগুলো বলছে, এতে অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, সামরিক প্রশিক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আপাতত মূল গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে আফগানিস্তানের হাতে থাকা পুরোনো সোভিয়েত যুগের সামরিক সরঞ্জাম সচল করার দিকে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তি?
আফগানিস্তানের সামরিক বাহিনীর কাছে এখনো বিপুল পরিমাণ সোভিয়েত আমলের অস্ত্র, সাঁজোয়া যান, কামান ও হেলিকপ্টার রয়েছে। সেগুলোর অনেকগুলো দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার সহায়তায় যদি এসব সরঞ্জাম পুনরায় কার্যকর করা যায়, তাহলে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা কিছুটা বাড়বে। যদিও তা আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির সঙ্গে তুলনীয় নয়।
এই কারণেই অনেক বিশ্লেষক চুক্তিটিকে তাৎক্ষণিক সামরিক পরিবর্তনের বদলে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে দেখছেন।
পাকিস্তান কেন উদ্বিগ্ন নয়?
আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা ইয়াকুব সম্প্রতি দাবি করেছেন, এই চুক্তি কার্যকর হলে পাকিস্তান আর আফগান ভূখণ্ডে হামলা চালানোর সাহস পাবে না।
তার এই বক্তব্য মূলত পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকায় পরিচালিত বিমান হামলাগুলোর প্রেক্ষাপটে এসেছে। গত কয়েক বছরে পাকিস্তান একাধিকবার অভিযোগ করেছে যে আফগান ভূখণ্ডে অবস্থান নেওয়া তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি সদস্যরা পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালাচ্ছে।
এর জবাবে পাকিস্তান সীমান্তের ওপারে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে।
কিন্তু পাকিস্তানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মনে করেন, রাশিয়ার সঙ্গে এই চুক্তি আফগানিস্তানকে এমন কোনো আধুনিক সামরিক সক্ষমতা দেবে না, যা পাকিস্তানের বিমান বাহিনীকে প্রতিহত করতে পারবে।
তাদের মতে, চুক্তির বর্তমান কাঠামো মূলত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তাকেন্দ্রিক, কোনো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের বিষয় এতে নেই।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আফগানিস্তান হয়তো ভবিষ্যতে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অর্জনের আশা করছে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ভিন্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া বর্তমানে নিজেই দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চাপের মধ্যে রয়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মোকাবিলায় তাদের নিজেদেরও বিপুল পরিমাণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের প্রয়োজন হচ্ছে।
ফলে আফগানিস্তানকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে মস্কো রয়েছে বলে মনে করেন না অধিকাংশ পর্যবেক্ষক।
আর সে কারণেই ইসলামাবাদ এখনো এই চুক্তিকে কৌশলগত উদ্বেগের পরিবর্তে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছে।
রাশিয়ার লক্ষ্য কী?
রাশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে এই চুক্তির পেছনে আরও বড় একটি কারণ রয়েছে—আঞ্চলিক নিরাপত্তা।
মধ্য এশিয়া এবং আফগানিস্তানে সক্রিয় বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠন রাশিয়ার জন্যও উদ্বেগের বিষয়। মস্কো চায় আফগানিস্তানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না রেখে একটি নিয়ন্ত্রিত ও কার্যকর অংশীদারে পরিণত করতে।
এ কারণে তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে তারা নিজেদের নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে।
পাকিস্তান-আফগান সম্পর্ক কেন তলানিতে?
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর প্রথমদিকে দুই দেশের সম্পর্ক ভালো থাকলেও সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যায়।
পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছে যে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে টিটিপি সদস্যরা পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে আফগানিস্তান পাকিস্তানের সামরিক অভিযানকে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করে।
ফলে সীমান্তে সংঘর্ষ, বাণিজ্যিক অচলাবস্থা এবং কূটনৈতিক উত্তেজনা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান বাস্তবতায় রাশিয়া-আফগান সামরিক চুক্তি পাকিস্তানের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক হুমকি সৃষ্টি করছে বলে মনে হয় না। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে।
এই চুক্তি দেখিয়ে দিয়েছে যে তালেবান সরকার ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অংশীদার খুঁজে পাচ্ছে এবং দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে রাশিয়াও আফগানিস্তানে নিজের প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী। ফলে ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা যদি অস্ত্র, প্রশিক্ষণ বা বৃহত্তর প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বে রূপ নেয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
তবে আপাতত পাকিস্তানের দৃষ্টিতে এটি বড় কোনো সামরিক হুমকি নয়; বরং একটি প্রতীকী ও কৌশলগত সম্পর্কের সূচনা, যার প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে আগামী কয়েক বছরে।

