দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে গণতন্ত্র, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং চীনকে ঘিরে অভিন্ন উদ্বেগের কথা বারবার বলা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, এই সম্পর্কের ভেতরে এখন এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে। বাইরে থেকে সম্পর্কটি এখনো সহযোগিতামূলক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের অবস্থান ক্রমেই আলাদা হয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে একদিকে চীনের প্রভাব ঠেকানোর গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে দেখতে চায়, অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একক প্রভাব প্রতিষ্ঠা নিয়েও সতর্ক। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়, কিন্তু ভারত যেন নিজের অঞ্চলে অতিরিক্ত প্রভাবশালী হয়ে না ওঠে, সেটিও নিশ্চিত করতে চায়। এখানেই দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারত সফরে গিয়ে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং নতুন শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পারস্পরিক অবস্থানের কথা বলেন। কূটনৈতিক ভাষায় এসব বক্তব্য ইতিবাচক শোনালেও বাস্তবতা এত সরল নয়। কারণ, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতিতে এমন কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যা ভারতের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি মিলছে না।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে বলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন। শুল্ককে চাপ প্রয়োগের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, প্রকাশ্য কূটনৈতিক তির্যক মন্তব্য এবং লেনদেনভিত্তিক সম্পর্কের প্রবণতা ভারতের মতো বড় অংশীদার দেশের জন্যও নতুন অস্বস্তির কারণ হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কে চাপ তৈরি হওয়ার শুরু কেবল ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর নয়। এর আগেই দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাবের জায়গায় চীনের বিস্তার এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বতন্ত্র আঞ্চলিক পদক্ষেপ দিল্লির নীতিনির্ধারকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের সামরিক সমর্থিত ক্ষমতাচ্যুতির পর যুক্তরাষ্ট্র যে অবস্থান নিয়েছিল, তা ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। ভারতের আশঙ্কা ছিল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা তার পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। লেখকের মূল্যায়নে, পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে সহিংসতা ও ধর্মীয় উগ্রতার আশঙ্কা বেড়েছে, যা ভারতের পূর্ব সীমান্তকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
মিয়ানমার নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের অবস্থানের পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী বেসামরিক সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র জান্তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। নিষেধাজ্ঞা, চাপ এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সামরিক নয় এমন সহায়তার নীতি যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকারভিত্তিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু ভারতের জন্য বিষয়টি অনেক বেশি নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক। কারণ মিয়ানমারের অস্থিরতা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত নিরাপত্তা, বিদ্রোহ, পাচার এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
মার্চ মাসে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এক যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিককে গ্রেপ্তারের ঘটনাও এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে। অভিযোগ ছিল, তারা অনুমতি ছাড়া ভারতে প্রবেশ করে মিয়ানমারে গিয়ে জান্তাবিরোধী যোদ্ধাদের ড্রোনযুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সহায়তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ ধরনের ঘটনা ভারতের কাছে শুধু আইনি বা সীমান্ত লঙ্ঘনের বিষয় নয়; বরং এটি তার নিরাপত্তা পরিসরে বাইরের শক্তির সক্রিয় উপস্থিতির ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হতে পারে।
নেপাল প্রসঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল পরিবর্তনের আভাস দেখা যায়। নেপাল ঐতিহাসিকভাবে ভূগোল, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নেপালকে ভারতের নীতির অংশ হিসেবে না দেখে স্বাধীন কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে। উচ্চপর্যায়ের যুক্তরাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের কাঠমান্ডু সফর বেড়েছে, এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা দিল্লিতে না থেমেই সরাসরি নেপালে গেছেন। ভারতের কাছে এটি একটি প্রতীকী পরিবর্তন, কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় তার ঐতিহ্যগত প্রভাবের জায়গাগুলো এখন আলাদা করে আন্তর্জাতিক শক্তির নজরে আসছে।
সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হলো পাকিস্তান। ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর দিকে এগিয়েছে বলে আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয়, সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির গত নভেম্বর সাংবিধানিক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন। এসব প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও ট্রাম্পের পরিবার ও ব্যবসায়িক সহযোগীদের পাকিস্তানে লাভজনক চুক্তির প্রসঙ্গ যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে আরও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি দক্ষিণ এশিয়ায় পুরোনো ভারসাম্যের রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে চাইছে? যদি যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে, নেপালকে আলাদা কৌশলগত ক্ষেত্র হিসেবে ধরে, মিয়ানমার ইস্যুতে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে কম গুরুত্ব দেয় এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ভিন্ন চোখে দেখে, তাহলে ভারতের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। কারণ তখন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে শুধু অংশীদার হিসেবে নয়, বরং একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবেও সীমিত রাখতে চাইছে—এমন ধারণা তৈরি হতে পারে।
চীন প্রসঙ্গটি এই সমীকরণকে আরও জটিল করেছে। এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের গুরুত্বের বড় কারণ ছিল চীনের বিরুদ্ধে ভারসাম্য তৈরি করা। ভারতকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে গণতান্ত্রিক শক্তি, সামরিক ভারসাম্যকারী এবং চীনা প্রভাব প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক চীন-নীতি যদি কিছু ক্ষেত্রে সমঝোতামুখী হয়, তাহলে ভারতের কৌশলগত মূল্যায়নও বদলে যেতে পারে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত কমিয়ে কিছু বিষয়ে সমঝোতায় যায়, তাহলে ভারতকে ঘিরে তার প্রয়োজনীয়তাও নতুনভাবে নির্ধারিত হতে পারে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশল—কোনো একক শক্তি যেন কোনো অঞ্চলে অতিরিক্ত প্রভাবশালী না হয়। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সমীর পল কাপুরের বক্তব্যেও এ ধরনের মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো একক শক্তির অতিরিক্ত প্রভাব ঠেকানোর কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেও আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় তার একক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
এটি ভারতের জন্য একটি বড় কৌশলগত শিক্ষা। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রাখলেই দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অবস্থান শক্তিশালী থাকবে—এমন ধারণা আর নিরাপদ নয়। ভারতকে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ধরন নতুনভাবে ভাবতে হবে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা এবং রাজনৈতিক শ্রদ্ধাবোধ—এসব ক্ষেত্রেই ভারতকে আরও কার্যকর হতে হবে। ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো যদি ভারতের কাছ থেকে বাস্তব সুবিধা না পায়, তাহলে তারা সহজেই চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য শক্তির দিকে ঝুঁকতে পারে।
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। দক্ষিণ এশিয়ায় বড় শক্তি হিসেবে ভারত স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব রাখতে চাইবে। কিন্তু সেই প্রভাব যদি প্রতিবেশীদের কাছে চাপ, নিয়ন্ত্রণ বা একতরফা সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরা পড়ে, তাহলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে। এ কারণে ভারতের প্রয়োজন এমন এক আঞ্চলিক নীতি, যেখানে ক্ষমতার প্রদর্শনের চেয়ে আস্থা গঠন বেশি গুরুত্ব পায়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রেরও ভাবার জায়গা আছে। চীনকে মোকাবিলা করতে গিয়ে ভারতকে প্রয়োজনীয় অংশীদার হিসেবে ব্যবহার করা, আবার একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অবস্থান দুর্বল করে দেওয়া—এই দুই নীতি একসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্থিতিশীলতা চায়, তাহলে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে উপেক্ষা করা তার নিজের কৌশলগত স্বার্থের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে বহুকেন্দ্রিক আঞ্চলিক ব্যবস্থা স্থিতিশীলতার জন্য ভালো হতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা গড়তে গিয়ে যদি ভারতের সঙ্গে আস্থার সংকট তৈরি হয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়া আরও বেশি প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হবে। তখন চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়বে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক এখন এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে তারা এখনো অংশীদার—বিশেষ করে চীন, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা ইস্যুতে। কিন্তু আঞ্চলিক পর্যায়ে তারা ক্রমেই প্রতিযোগী হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত চীনকে ঠেকাতে সাহায্য করুক, কিন্তু ভারত যেন দক্ষিণ এশিয়ায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হয়ে না ওঠে। ভারত চায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে, কিন্তু নিজের অঞ্চলে প্রভাব কমে যাওয়া মেনে নিতে চায় না।
এই দ্বন্দ্বের ফলাফল শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক মানচিত্রকেও নতুনভাবে গড়ে দিতে পারে। সামনে বড় প্রশ্ন হলো—ওয়াশিংটন ও দিল্লি কি তাদের পারস্পরিক সন্দেহ সামলে বাস্তববাদী সম্পর্ক বজায় রাখতে পারবে, নাকি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা তাদের বৈশ্বিক অংশীদারিত্বকেও দুর্বল করে দেবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি, নিরাপত্তা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

