যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ইরান ও লেবানন ইস্যুতে সামরিক ক্ষমতা সীমিত করার দুটি পৃথক উদ্যোগে বড় ধরনের বিভাজন দেখা গেছে। একদিকে ইরান বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা কমাতে একটি প্রস্তাব অল্প ব্যবধানে পাস হলেও, লেবানন নিয়ে একই ধরনের উদ্যোগ বিপুল ভোটে ব্যর্থ হয়েছে। বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে প্রতীকী হলেও এটি আবারও সামনে এনেছে—ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট যুদ্ধ বা সংঘাতে মার্কিন কংগ্রেস কতদূর পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত।
ওয়াশিংটনে বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে লেবাননে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা বন্ধের একটি প্রস্তাব ভোটে তোলা হয়। মিশিগানের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান রাশিদা তালিব এই উদ্যোগটি উত্থাপন করেন। তিনি এটিকে “লেবাননের বিরুদ্ধে গণহত্যামূলক যুদ্ধ” বলে উল্লেখ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি ও গোয়েন্দা সহায়তার মাধ্যমে ইসরায়েলকে সমর্থনের সমালোচনা করেন। তবে এই প্রস্তাব ব্যাপক ব্যবধানে নাকচ হয়ে যায়। মোট ৩২৪ জন আইনপ্রণেতা এর বিরুদ্ধে ভোট দেন, আর মাত্র ৯২ জন সমর্থন করেন।
তালিব এক বিবৃতিতে বলেন, চলতি মার্চের শুরু থেকে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১২৮ জন অ্যাম্বুলেন্সকর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীও রয়েছেন। তার অভিযোগ, হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে অ্যাম্বুলেন্স, হাসপাতাল ও বসতবাড়ি, যার ফলে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তিনি এসব ঘটনাকে সরাসরি “যুদ্ধাপরাধ” বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে একই দিনে প্রতিনিধি পরিষদের আর্মড সার্ভিসেস কমিটি আগামী বছরের মার্কিন সামরিক বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু করে। সেখানে এমন একটি প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অস্ত্র উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও গবেষণা কার্যক্রম একীভূত করার কথা বলা হয়েছে।
এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় “এ নিউ পলিসি” নামের একটি থিংক ট্যাংক, যার প্রতিষ্ঠাতা দুইজন সাবেক বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তা। তারা বলেন, এই পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াতে পারে, প্রতিরক্ষা শিল্পে প্রতিযোগিতা দুর্বল করতে পারে এবং ইসরায়েলের সামরিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলবে।
অন্যদিকে রিপাবলিকানদের বড় অংশ, বিশেষ করে যারা ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে দ্বন্দ্বে যেতে চান না, তারা ইসরায়েলকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সহায়তা সীমিত করার যেকোনো উদ্যোগে খুব একটা আগ্রহ দেখাবেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একসময় বলেছিলেন, ইসরায়েল না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রকে সেটি তৈরি করতে হতো—যা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় ইসরায়েলের ভূমিকার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
এর আগের দিন বুধবার, মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ইরান বিষয়ে ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করার একটি প্রস্তাব ২১৫-২০৮ ভোটে পাস করে। চারজন রিপাবলিকান এই ভোটে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দেন। তাদের একজন কেন্টাকির রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসি, যিনি আগামী জানুয়ারিতে কংগ্রেস ছাড়ছেন। তিনি সাম্প্রতিক রিপাবলিকান প্রাইমারিতে পরাজিত হয়েছেন, যেখানে ইসরায়েলপন্থী লবিং গোষ্ঠীর সমর্থিত প্রার্থী জয়ী হন।
তবে ভোটে আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল—বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান অনুপস্থিত ছিলেন, যার ফলে তারা কোনো পক্ষেই ভোট দিতে পারেননি। এই ভোটকে ট্রাম্পের ইরান নীতির প্রতি একটি বড় দ্বিদলীয় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এটি এখন সিনেটে যাবে, যেখানে একই ধরনের একটি প্রস্তাব আগেই অগ্রগতি পেয়েছিল।
তবুও আশঙ্কা করা হচ্ছে, ট্রাম্প এটি ভেটো দিতে পারেন—যেমন তিনি ২০১৯ সালে ইয়েমেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে করেছিলেন। তখন কংগ্রেস যুদ্ধ ক্ষমতা আইনের আওতায় মার্কিন অংশগ্রহণ সীমিত করতে চেয়েছিল, কিন্তু ভেটো অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি।
ডেমোক্র্যাট নেতা গ্রেগরি মিক্স বলেন, ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এটি কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরও কঠিন করেছে এবং ইরানকে কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করেছে। তার মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানি তেলের দামও ৫০ শতাংশ বেড়েছে এবং জনগণের বিপুল বিরোধিতা সত্ত্বেও এই যুদ্ধ চালানো হচ্ছে।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের সভাপতি জামাল আবদি বলেন, এই ভোট মার্কিন আইনপ্রণেতাদের একটি স্পষ্ট বার্তা। তার মতে, যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও বাড়বে।
যুদ্ধক্ষমতা আইন কী বলে:
১৯৭৩ সালের যুদ্ধক্ষমতা আইন অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কোনো যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করা যায়। সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা আইনসভার, নির্বাহী বিভাগের নয়। তবে আইনটিতে প্রেসিডেন্টকে ৬০ দিন পর্যন্ত সামরিক অভিযান চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে, পরে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয় বা অভিযান বন্ধ করতে হয়। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই বিধান অস্পষ্টভাবে লেখা।
৯/১১ হামলার পর থেকে “সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ” ধারণার কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা বিভিন্ন দেশে কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক যুদ্ধঘোষণা ছাড়াই সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছেন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা এবং তার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে জটিল করে তুলেছে।

