ভারতকে ঘিরে বৈশ্বিক কূটনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তাঁর মতে, ভারতের ওপর নিষেধাজ্ঞা কিংবা রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের যেকোনো প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফল দেবে না, বরং উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
শুক্রবার (৫ জুন) সেন্ট পিটার্সবার্গে আয়োজিত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পুতিন ভারতের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত অবস্থানের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ভারত এমন একটি দেশ, যা দীর্ঘদিন ধরেই নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আসছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
পুতিনের বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে—ভারত যদি রাশিয়ার উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করে, তাহলে পশ্চিমা বিশ্বের কিছু দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, নতুন ধরনের চাপ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে কি না।
এই প্রসঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রকে তার প্রতিরক্ষা বা অর্থনৈতিক অংশীদার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাইরের শক্তি নির্দেশ দিতে পারে না। ভারতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। দেশটি নিজেদের প্রয়োজন, সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে।
পুতিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্বাধীনতা। আন্তর্জাতিক চাপ বা হুমকির মুখেও নয়াদিল্লি সাধারণত নিজের অবস্থান থেকে সরে আসে না। ফলে নিষেধাজ্ঞার ভয় দেখিয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করানোর চেষ্টা বাস্তবসম্মত হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের এই মন্তব্য শুধু ভারতের প্রতি সমর্থনের বার্তা নয়, বরং এটি বর্তমান বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গেও প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সহযোগিতা বজায় রেখেছে। এই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাশিয়া-ভারত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রসঙ্গ টেনে পুতিন বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক কোনো সাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়। দীর্ঘদিনের পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাই কোনো তৃতীয় পক্ষের আপত্তির কারণে মস্কো তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবে না।
তিনি আরও বলেন, রাশিয়া তার অংশীদারদের সঙ্গে করা চুক্তি ও অঙ্গীকারকে গুরুত্ব দেয়। বিশেষ করে ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের ক্ষেত্রে সেই প্রতিশ্রুতি আরও দৃঢ়ভাবে রক্ষা করা হবে।
আলোচনার একপর্যায়ে উঠে আসে রাশিয়ার অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সু-৫৭-এর বিষয়টি। পুতিন জানান, একসময় ভারতকে সঙ্গে নিয়ে যৌথভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। যদিও সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি, পরে রাশিয়া নিজস্ব উদ্যোগেই প্রকল্পটি সম্পন্ন করে।
তিনি দাবি করেন, সু-৫৭ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি। রাশিয়া এখন এই যুদ্ধবিমান ভারতের কাছে সরবরাহ করতে প্রস্তুত এবং এ বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট।
পুতিনের বক্তব্য থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—রাশিয়া ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে কেবল অস্ত্র বিক্রির বাজার হিসেবে দেখে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে ভারতও বহু বছর ধরে এমন একটি নীতি অনুসরণ করছে, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হয়।
ফলে ভবিষ্যতে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কিনুক বা অন্য কোনো কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিক, সেটি মূলত দেশের নিজস্ব স্বার্থ ও প্রয়োজনের ভিত্তিতেই হবে—এমন বার্তাই দিয়েছেন ভ্লাদিমির পুতিন।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় তাঁর এই মন্তব্য শুধু ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের গুরুত্বই তুলে ধরেনি, বরং এটাও মনে করিয়ে দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্রমেই প্রভাব বাড়ছে স্বাধীন ও বহুমাত্রিক কূটনীতির।

