Close Menu
Citizens VoiceCitizens Voice
    Facebook X (Twitter) Instagram YouTube LinkedIn WhatsApp Telegram
    Citizens VoiceCitizens Voice বুধ, আগস্ট 26, 2026
    • প্রথমপাতা
    • অর্থনীতি
    • বাণিজ্য
    • ব্যাংক
    • পুঁজিবাজার
    • বিমা
    • কর্পোরেট
    • বাংলাদেশ
    • আন্তর্জাতিক
    • আইন
    • অপরাধ
    • মতামত
    • অন্যান্য
      • খেলা
      • শিক্ষা
      • স্বাস্থ্য
      • প্রযুক্তি
      • ধর্ম
      • বিনোদন
      • সাহিত্য
      • বিশ্ব অর্থনীতি
      • ভূ-রাজনীতি
      • জলবায়ু ও পরিবেশ
      • লাইফস্টাইল
      • বিশ্লেষণ
      • ভিডিও
    Citizens VoiceCitizens Voice
    Home » যেভাবে ইরানের প্রযুক্তি স্বপ্ন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে গেল
    আন্তর্জাতিক

    যেভাবে ইরানের প্রযুক্তি স্বপ্ন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে গেল

    নিউজ ডেস্কজুন 6, 2026
    Facebook Twitter Email Telegram WhatsApp Copy Link
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Telegram WhatsApp Email Copy Link

    ইরানে একসময় এমন একটি প্রযুক্তি খাত গড়ে উঠেছিল, যা দেশটির তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন আশার দরজা খুলে দিয়েছিল। নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতি—এই তিনটি বিষয় এক অদ্ভুত বাস্তবতা তৈরি করেছিল। বহুজাতিক ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানে সহজে কাজ করতে না পারায় স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সামনে তৈরি হয়েছিল বিশাল এক খোলা মাঠ। সেই মাঠে ইরানি তরুণেরা নিজেরাই তৈরি করতে শুরু করেন অনলাইন কেনাকাটা, যাতায়াত, পেমেন্ট, বিজ্ঞাপন, ভিডিও ভাগাভাগি ও নানা ধরনের ডিজিটাল সেবা।

    কিন্তু যে খাতটি ইরানের বেসরকারি অর্থনীতির সাফল্যের প্রতীক হতে পারত, সেটিই ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা সংস্থার চাপ, রাজনৈতিক সন্দেহ ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক স্বার্থের ভেতরে আটকে পড়ে। ফলে প্রযুক্তি খাতের এই উত্থান শেষ পর্যন্ত শুধু ব্যবসার গল্প থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে ইরানের রাষ্ট্র, অর্থনীতি, নজরদারি ও স্বাধীন উদ্যোক্তা সংস্কৃতির সংঘাতের একটি গভীর উদাহরণ।

    এই গল্পের কেন্দ্রে ছিলেন সাঈদ রহমানি। তিনি ইরানে জন্মেছিলেন, বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান, উচ্চশিক্ষা নেন এবং প্রযুক্তি খাতে সফল পেশাজীবন গড়েন। পরে তিনি আবার ইরানে ফিরে আসেন। উদ্দেশ্য ছিল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি উদ্যোগ এবং নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য একটি শক্তিশালী পরিবেশ তৈরি করা। ২০১১ সালে তিনি ইরানে বিনিয়োগের সম্ভাবনা খুঁজতে শুরু করেন। এরপর গড়ে তোলেন সারাভা নামে একটি উদ্যোগ পুঁজি তহবিল।

    সারাভার সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ডিগিকালা। এটি শুরু করেছিলেন হামিদ ও সাঈদ মোহাম্মাদি নামে দুই যমজ ভাই। তাঁদের বাবা ছিলেন রুটি বিক্রেতা। ২০০৬ সালে ডিগিকালা শুরু করার সময় একজন ভাই নিজের গাড়ি বিক্রি করেছিলেন, আরেকজন ব্যবহার করেছিলেন বিয়ের জন্য রাখা টাকা। শুরুটা ছিল ছোট, কিন্তু স্বপ্ন ছিল বড়। প্রথমে এটি ছিল ইলেকট্রনিক পণ্যের ওয়েবসাইট। পরে ধীরে ধীরে এটি ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন কেনাকাটার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

    সারাভা ডিগিকালায় বড় বিনিয়োগ করে এবং প্রতিষ্ঠানের ৫১ শতাংশ অংশীদারিত্ব নেয়। সেই বিনিয়োগ ডিগিকালাকে দ্রুত বদলে দেয়। প্রতিষ্ঠানটি দেশজুড়ে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করে, পরদিন পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সেবা চালু করে এবং ইরানের সাধারণ মানুষকে অনলাইনে কেনাকাটার অভ্যাসের সঙ্গে পরিচিত করে। ২০১৪ সালের শেষ নাগাদ ডিগিকালা প্রতিদিন প্রায় ৩,০০০ অর্ডার পাচ্ছিল এবং এর মূল্যমান দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১৫ কোটি ডলার।

    ডিগিকালার গল্প শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য ছিল না। এটি দেখিয়েছিল, ইরানে জন্মপরিচয়, পারিবারিক প্রভাব বা রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ছাড়াও দক্ষতা, পরিশ্রম ও প্রযুক্তি জ্ঞান দিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। এই সম্ভাবনাই তরুণ উদ্যোক্তাদের অনুপ্রাণিত করেছিল। সারাভা শুধু ডিগিকালায় নয়, আরও অনেক উদ্যোগে বিনিয়োগ করে। তারা আভাটেক নামে একটি ত্বরক কর্মসূচিকেও সহায়তা করে, যেখানে নতুন উদ্যোক্তারা কাজের জায়গা, দিকনির্দেশনা ও প্রাথমিক অর্থায়ন পেতেন।

    তবে ইরানের প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের পথ সহজ ছিল না। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা বিদেশি সেবা, ক্রেডিট কার্ড, সার্ভার বা সফটওয়্যার সরঞ্জাম সহজে ব্যবহার করতে পারত না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব বিকল্প তৈরি করতে হয়েছে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাই আবার স্থানীয় উদ্ভাবনকে উসকে দেয়। ইরানের তরুণ প্রকৌশলীরা সীমাবদ্ধতার ভেতর থেকেই নিজেদের ডিজিটাল অবকাঠামো দাঁড় করাতে শুরু করেন।

    ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি ইরানের রাজনৈতিক পরিবেশে একটি আশাবাদের মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল। হাসান রুহানির সরকার পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির দিকে এগোচ্ছিল। অনেকের ধারণা ছিল, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে এবং ইরানের অর্থনীতি নতুনভাবে খুলে যাবে। প্রযুক্তি খাতও সেই আশার বড় অংশ হয়ে ওঠে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট সোরেনা সাত্তারি নিজেকে প্রযুক্তি সমর্থক হিসেবে তুলে ধরেন এবং খাতটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।

    এই সময় সারাভা আরও বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করে। সাঈদ রহমানির ধারণা ছিল, ডিগিকালাকে বড় আকারে রূপান্তর করতে ১০ কোটি ডলার প্রয়োজন। তিনি তারও বেশি অর্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। প্রযুক্তি খাত তখন ইরানের সবচেয়ে আলোচিত নতুন ক্ষেত্র। কিন্তু এই সাফল্যই একসময় সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

    ২০১৫ সালের শেষ দিক থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সামনে বক্তৃতায় বিদেশি অনুপ্রবেশের বিষয়ে সতর্ক করেন। তিনি অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে বাইরের প্রভাবের কথা বলেন। আরেকটি বক্তৃতায় তিনি অনুপ্রবেশ শব্দটি ৫৪ বার ব্যবহার করেন। পারমাণবিক চুক্তির পর ইরান বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে আরও যুক্ত হতে পারে—এই সম্ভাবনাই ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে।

    প্রযুক্তি খাতের সম্মেলন, বিদেশি বিনিয়োগকারী, পশ্চিমা ধাঁচের কর্মসংস্কৃতি, তরুণ উদ্যোক্তা ও মুক্ত ডিজিটাল যোগাযোগ—এসব কিছু নিরাপত্তা কাঠামোর চোখে সন্দেহজনক হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রের একাংশের কাছে প্রযুক্তি উদ্যোগ আর শুধু ব্যবসা ছিল না; এটি হয়ে ওঠে সম্ভাব্য সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্র।

    প্রায় ২০১৬ সালের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাবনামেহ নামে একটি রহস্যময় প্রচারমাধ্যম সক্রিয় হয়। এটি প্রযুক্তি খাতকে পশ্চিমা প্রভাব ও শাসন পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করে প্রচারণা চালাতে থাকে। সাঈদ রহমানি, সারাভা, ডিগিকালা ও আভাটেককে সন্দেহের কেন্দ্রে আনা হয়। ২০১৬ সালের শেষ দিকে একটি নাট্যধর্মী প্রচারচিত্র প্রকাশ করা হয়, যেখানে প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে পশ্চিমা সংযোগের ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

    এরপর সাঈদ রহমানির ওপর চাপ বাড়তে থাকে। তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় প্রতি সপ্তাহে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। নিরাপত্তা সংস্থার সন্দেহ, প্রচারমাধ্যমের আক্রমণ এবং রাজনৈতিক চাপ তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তিনি বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে সারাভা ইরানের অর্থনীতির জন্য কাজ করছে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু সেই ব্যাখ্যা সন্দেহ কমায়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।

    ইরানের প্রযুক্তি খাত কখনো তেল, ইস্পাত বা বড় রাষ্ট্রীয় শিল্পের মতো বিপুল অর্থবহ ছিল না। কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে এর বিশেষ মূল্য ছিল অন্য জায়গায়—তথ্য। অনলাইন কেনাকাটা, যাতায়াত, পেমেন্ট ও অন্যান্য সেবার মাধ্যমে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের দৈনন্দিন আচরণ, চলাচল, পছন্দ, লেনদেন ও যোগাযোগের বিপুল তথ্য সংগ্রহ করত। ফলে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর আগ্রহ শুধু অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ ছিল না; নাগরিক নজরদারির ক্ষেত্রেও এই খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

    অনেক প্রতিষ্ঠান কখনো আদালতের চিঠি, কখনো অদৃশ্য কর্তৃপক্ষের অনুরোধের মুখে ব্যবহারকারীর তথ্য দিতে বাধ্য হয়েছে। উদ্যোক্তাদের সামনে কঠিন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছিল—তারা কি ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা রক্ষা করবে, নাকি প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের বাঁচাতে রাষ্ট্রের চাপে সাড়া দেবে? এই দ্বন্দ্ব প্রযুক্তি খাতের নৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে।

    ইরানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যে ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিল, তা ছিল প্রতিযোগিতা, উদ্ভাবন, ব্যবহারকারী-কেন্দ্রিক সেবা ও দ্রুত পরিবর্তনের সংস্কৃতি। কিন্তু ইরানের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সেখানে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রিত, বাজারে রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের প্রভাব প্রবল, আর আইন প্রয়োগ অনেক সময় অনির্দেশ্য। কোন অ্যাপ দেখা যাবে, কোন ওয়েবসাইট চালু থাকবে, কোন সেবা অনুমতি পাবে—এসবের ওপর আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংস্থার বড় প্রভাব ছিল।

    এই পরিস্থিতিতে অনেক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের সঙ্গে আপসের পথ বেছে নেয়। কেউ নিরাপত্তা ঘনিষ্ঠ বিনিয়োগ গ্রহণ করে, কেউ রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের কাছে শেয়ার বিক্রি করে, কেউ আবার অনলাইন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করে। সারাভার ক্ষেত্রেও এমন প্রস্তাব আসে। এক পর্যায়ে সাঈদ রহমানিকে বলা হয়, তিনি যদি নিজের শেয়ারের ১৫ শতাংশ ছেড়ে দেন, তাহলে সমস্যার সমাধান হতে পারে। তিনি জানতে চান, প্রস্তাবটি কার পক্ষ থেকে এসেছে। স্পষ্ট উত্তর না পেয়ে তিনি রাজি হননি। কিন্তু বার্তাটি পরিষ্কার ছিল—নিরাপদ থাকতে হলে ব্যবসার অংশ ছাড়তে হবে।

    ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সারাভার কয়েকজন কর্মকর্তা ইরানের কেশম দ্বীপে একটি করপোরেট সফরে যান। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ইমাদ শারগি, একজন ইরানি-আমেরিকান ব্যবসায়ী, যিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে সারাভাকে পরামর্শ দিতেন। সফরের শেষ দিনে তাঁদের মিনিবাস ভাঙচুর করা হয় এবং কয়েকটি ব্যাগ চুরি যায়। শারগির ব্যাগে তাঁর আমেরিকান ও ইরানি পাসপোর্ট ছিল। ঘটনাটি সাধারণ চুরির মতো দেখালেও পরে অনেকেই এটিকে নিরাপত্তা সংস্থার সতর্কবার্তা হিসেবে দেখেন।

    ২০১৮ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে সাঈদ রহমানি ইরানে ফেরার পর বিমানবন্দরে তাঁর পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। কর্তৃপক্ষ সারাভার বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে অভিযোগ তোলে। এরপর ২০১৮ সালের ১৮ মার্চ ইমাদ শারগি ইরানে ফিরে আসেন নববর্ষ উদ্‌যাপনের জন্য। ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল রাত প্রায় ২টার দিকে বিপ্লবী গার্ডের সদস্যরা তাঁকে নিয়ে সারাভার কার্যালয়ে অভিযান চালায়। তারা অফিসে ঢুকে নথি, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যায় এবং কার্যালয় সিলগালা করে। শারগিকে পরে কারাগারে নেওয়া হয়।

    পরবর্তী আট মাসে তাঁকে শত শত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের বড় অংশই ছিল সারাভার বিনিয়োগকারী, কাঠামো ও সাঈদ রহমানির ভূমিকা ঘিরে। এই ঘটনা প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের কাছে স্পষ্ট বার্তা পাঠায়—রাষ্ট্র চাইলে কোনো প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী বা পরামর্শককে নিরাপত্তা প্রশ্নে টেনে আনতে পারে।

    এরপর একে একে অনেক প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় চলে যান। ডিগিকালার মোহাম্মাদি ভাইরা দেশে থেকে গেলেও তাঁদের আগের আশাবাদ আর ছিল না। ইরানে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার যে আত্মবিশ্বাস একসময় তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়।

    ২০১৯ সালের মে মাসে সাঈদ রহমানি যুক্তরাজ্যে যান। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল পরে ইরানে ফিরে আসা। কিন্তু তিনি জানতে পারেন, একটি সরকারি মন্ত্রণালয় সারাভার একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে বলা হয়, সাঈদ রহমানিকে পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরানো না হলে ওই প্রতিষ্ঠান কিছু সরকারি সেবা ব্যবহার করতে পারবে না। আরেকটি চিঠিতে তেহরানের পৌর প্রশাসনের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সারাভা ও তার বিনিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেন।

    ২০১৯ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি সাঈদ রহমানি সারাভার প্রধান নির্বাহী ও পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ান। তাঁর আশা ছিল, তিনি সরে গেলে অন্তত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম চলতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল রাষ্ট্রীয় চাপের কাছে এক বড় পরাজয়। নতুন পর্ষদ ও নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।

    এরপরও সমস্যার শেষ হয়নি। ২০১৯ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সাঈদ রহমানি গোয়েন্দা মন্ত্রী মাহমুদ আলাভি, বিপ্লবী গার্ডের গোয়েন্দা শাখার প্রধান হোসেইন তাইয়েব এবং সোরেনা সাত্তারির কাছে চিঠি লেখেন। তিনি জানতে চান, সারাভা বা তিনি এমন কী করেছেন যে তাঁদের এমন আচরণের মুখে পড়তে হলো। কিন্তু ২০১৯ সালের ২১ আগস্ট হোসেইন তাইয়েব একটি শক্তিশালী বোনিয়াদের প্রধানকে চিঠি লিখে সারাভা ও তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি না করতে বলেন। এর মধ্যে ডিগিকালার নামও ছিল।

    এতে পরিষ্কার হয়ে যায়, সারাভাকে ইরানের প্রযুক্তি খাত থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রচার আক্রমণ, জিজ্ঞাসাবাদ, গ্রেপ্তার, কার্যালয়ে অভিযান এবং পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকে ভেঙে দেয়।

    ২০২০ সালে ডিগিকালার নতুন অর্থের প্রয়োজন হয়। একটি বড় টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়, যার মালিকানার কাঠামোর সঙ্গে খামেনি নিয়ন্ত্রিত একটি বোনিয়াদের সম্পর্ক ছিল। ডিগিকালা ও সারাভা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তারা শেয়ারবাজারে যাওয়ার চেষ্টা করে, অন্য বিনিয়োগকারীর সঙ্গে আলোচনা করে, কিন্তু প্রতিটি পথেই বাধা আসে। আগ্রহী ক্রেতাদেরও নিরাপত্তা সংস্থার পক্ষ থেকে দূরে থাকতে বলা হয়।

    ২০২৪ সালের শুরুতে সেই টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান আবার ডিগিকালার শেয়ারের বড় অংশ কেনার প্রস্তাব দেয়। প্রায় একই সময়ে তেহরানের কৌঁসুলি ডিগিকালার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে মামলা করেন। অভিযোগ ছিল, ওয়েবসাইটে এমন কিছু মগ বিক্রি হয়েছে, যেখানে সাধারণ ইরানি নাম লেখা ছিল—যার কিছু নাম ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নামের সঙ্গে মিলে যায়। মামলাটি দুর্বল মনে হলেও একজন ডিগিকালা কর্মকর্তা কিছু সময়ের জন্য আটক হন এবং আরও কয়েকজনকে পুলিশের সঙ্গে বৈঠকে ডাকা হয়।

    এই চাপের মধ্যে ডিগিকালার প্রতিষ্ঠাতারা বুঝতে পারেন, বিক্রি না করলে আরও বড় বিপদ আসতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোম্পানির একটি অংশ বিক্রি করা হয়। চুক্তিতে ডিগিকালার মূল্য নির্ধারণ করা হয় প্রায় ৫৫ কোটি ডলার। কিন্তু সংশ্লিষ্ট অনেকে মনে করেন, এটি প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অনেক কম। তার ওপর অর্থ পরিশোধের সময়ের মধ্যে ইরানি মুদ্রার মূল্য প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যায়, ফলে ক্রেতার জন্য চুক্তিটি আরও লাভজনক হয়ে ওঠে।

    এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ দেখায়, ইরানের প্রযুক্তি খাতকে শুধু বাজার প্রতিযোগিতা দিয়ে বোঝা যায় না। এখানে উদ্যোক্তা, রাষ্ট্র, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ক্ষমতাকাঠামো, তথ্য নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা—সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িত। ইরানি উদ্যোক্তারা নিষেধাজ্ঞার ভেতর থেকেও উদ্ভাবন করেছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরের ক্ষমতাকাঠামো সেই উদ্ভাবনকে স্বাধীনভাবে বাড়তে দেয়নি।

    ইরানের প্রযুক্তি খাতের উত্থান তাই একই সঙ্গে আশা ও হতাশার গল্প। এটি দেখায়, প্রতিভা থাকলেও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রযুক্তি খাত টেকসই হয় না। বিনিয়োগ থাকলেও আইনের সুরক্ষা না থাকলে উদ্যোক্তা নিরাপদ থাকে না। আর ডিজিটাল ব্যবসা যত বড় হয়, নাগরিক তথ্যের কারণে রাষ্ট্রের আগ্রহও তত বাড়ে।

    ডিগিকালা, সারাভা ও সাঈদ রহমানির গল্প শুধু একটি দেশের ব্যবসায়িক ইতিহাস নয়। এটি এমন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে তরুণ উদ্যোক্তারা ভবিষ্যৎ বানাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ক্ষমতার কাঠামো সেই ভবিষ্যৎকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছে। ইরানের প্রযুক্তি স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়নি, কিন্তু এই গল্প দেখিয়ে দিয়েছে—স্বাধীন উদ্ভাবনের জন্য শুধু মেধা ও পুঁজি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আইনের শাসন, নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ, নাগরিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের সীমিত হস্তক্ষেপ।

    Share. Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    সম্পর্কিত সংবাদ

    আন্তর্জাতিক

    নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা, নিহত ৯৫; নিখোঁজ ৩৮৪ পর্যটক

    আগস্ট 26, 2026
    আন্তর্জাতিক

    কেন বেসরকারি কোম্পানির হাতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি তুলে দিচ্ছে ভারত

    আগস্ট 26, 2026
    আন্তর্জাতিক

    যেভাবে বিরল খনিজের বিশ্ববাজার দখল করল চীন

    আগস্ট 26, 2026
    একটি মন্তব্য করুন Cancel Reply

    সর্বাধিক পঠিত

    ইস্পাত শিল্প তীব্র সংকটে উৎপাদন বন্ধের পথে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    আইএমএফের রিপোর্টে ঋণের নতুন রেকর্ড পৌছালো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    নতুন বাণিজ্য কৌশলে আরসেপে যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024
    সংযুক্ত থাকুন
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • YouTube
    • Telegram

    EMAIL US

    contact@citizensvoicebd.com

    FOLLOW US

    Facebook YouTube X (Twitter) LinkedIn
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement

    WhatsApp

    01339-517418

    Copyright © 2026 Citizens Voice All rights reserved

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.