চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর একসময় মূলত সড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বড় অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে আলোচনায় ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইসলামাবাদ ও বেইজিং হয়তো এখন এই প্রকল্পকে নতুন ভাষায়, নতুন কাঠামোতে এবং নতুন ব্যবসায়িক বাস্তবতায় উপস্থাপন করতে চাইছে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগনির্ভর পুরোনো মডেলের জায়গায় এবার গুরুত্ব পাচ্ছে সরাসরি বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং বেসরকারি খাতের ভূমিকা।
২৪ মে চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের হাংচৌ শহরে পাকিস্তান–চীন ব্যবসা–ব্যবসা বিনিয়োগ সম্মেলনে দুই দেশের সরকারি প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নেতারা একত্র হন। ওই সম্মেলনে দুই দেশের পাঁচ শতাধিক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ ও বেইজিং কয়েকটি নতুন স্মারক সমঝোতায় স্বাক্ষর করে। এই সম্মেলনকে শুধু আরেকটি কূটনৈতিক আয়োজন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের ভবিষ্যৎ দিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে।
চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে ব্যবসা–ব্যবসা বিনিয়োগ সম্মেলনগুলোর লক্ষ্য হলো দুই দেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করা। বিশেষ করে প্রযুক্তি, উৎপাদন, জ্বালানি, কৃষি এবং আর্থিক খাতের মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অংশীদারত্ব বাড়ানো। প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৪ সালের জুন মাসে শেনঝেনে। সেই সম্মেলন থেকে কয়েকটি বাণিজ্যিক চুক্তি হয়। এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দ্বিতীয় সম্মেলনে ছয় শতাধিক চীনা কোম্পানি অংশ নেয়। ওই সময় দুই দেশ ২১টি যৌথ চুক্তি, ১৪৮টি স্মারক সমঝোতা এবং বিভিন্ন খাতে ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় পৌঁছায়।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক তৃতীয় সম্মেলনের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল প্রযুক্তি। আলোচনার তালিকায় ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, টেলিযোগাযোগ, কৃষি, আর্থিক প্রযুক্তি এবং জ্বালানি সংরক্ষণ। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা এই উদ্যোগকে চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের অধীনে অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ধাপ হিসেবে তুলে ধরছেন। তাদের ভাষায়, এটি শুধু বিনিয়োগের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নতুন বাণিজ্যিক ভাষা কি বাস্তবে পাকিস্তানের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে পারবে?
পাকিস্তান বর্তমানে কঠিন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটি ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কর্মসূচির অধীনে রয়েছে। একই সঙ্গে ঋণের চাপ, দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি দেশটির অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতের কারণে বাণিজ্য ব্যাঘাত ও উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাবও পাকিস্তানের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। এই অবস্থায় চীনা বিনিয়োগ ও নতুন অংশীদারত্ব ইসলামাবাদের কাছে স্বস্তির সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
তবে এই আশার সঙ্গে বড় উদ্বেগও আছে। পাকিস্তানের চীনা বিনিয়োগনির্ভরতা দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনার মুখে। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা যাকে অর্থনৈতিক কূটনীতি বলছেন, সমালোচকেরা সেটিকে অনেক সময় ঋণনির্ভর কূটনীতি হিসেবে দেখেন। কারণ চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। কোন অর্থ ঋণ, কোনটি সরাসরি বিনিয়োগ, কোনটি বাণিজ্যিক সহায়তা এবং কোন শর্তে অর্থ দেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা সবসময় পাওয়া যায় না।
চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর প্রথমে ৪৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রকল্প হিসেবে সামনে এসেছিল। পরে এর মূল্যমান আনুমানিক ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু এসব প্রকল্প কীভাবে অর্থায়ন করা হচ্ছে, পাকিস্তান কতটা ঋণ জমাচ্ছে এবং সেই ঋণ পরিশোধের সময়সীমা কী—এসব প্রশ্ন এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তাই ব্যবসা–ব্যবসা সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ এলে সেটি উন্নয়নের সুযোগ হবে, নাকি আরেক দফা আর্থিক দায় তৈরি করবে—এ প্রশ্ন উপেক্ষা করা যায় না।
তবুও পাকিস্তানের জন্য নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ঋণে জর্জরিত, রাজনৈতিকভাবে অস্থির এবং নিরাপত্তা সংকটে থাকা একটি অর্থনীতির জন্য বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ অত্যন্ত জরুরি। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো পাকিস্তানে প্রকল্প বিলম্ব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে বহুবার অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে বেলুচিস্তান প্রদেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় উদ্বেগ। এসব কারণে চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের আগের গতি অনেকটাই কমেছে। তারপরও ইসলামাবাদ ও বেইজিং কেউই এই প্রকল্পকে অপ্রাসঙ্গিক হতে দিতে চায় না।
এর পেছনে দুই পক্ষের স্বার্থ আলাদা হলেও পরস্পরসম্পর্কিত। পাকিস্তানের প্রধান লক্ষ্য চীনা বিনিয়োগ ধরে রাখা এবং অর্থনৈতিক চাপ সামলানো। অন্যদিকে চীনের কাছে এই করিডরের গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগতও। গোয়াদার বন্দরের ভৌগোলিক অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তীতা চীনের দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক হিসাবের সঙ্গে যুক্ত। এই অঞ্চল জ্বালানি, সমুদ্রবাণিজ্য ও ভূরাজনীতির দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে করিডরভিত্তিক সংযোগ বজায় রাখা চীনের জন্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে পাকিস্তান নিজেকে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও তুলে ধরতে চাইছে। এটি শুধু কূটনৈতিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা নয়; এর অর্থনৈতিক তাৎপর্যও আছে। আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকা গেলে পাকিস্তান চীন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। অর্থাৎ চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের নতুন পর্যায় শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, কূটনীতি এবং নিরাপত্তা রাজনীতিও জড়িয়ে আছে।
তবে ব্যবসা–ব্যবসা মডেলের একটি বড় পার্থক্য হলো, এটি আগের মতো পুরোপুরি রাষ্ট্রনির্ভর অবকাঠামো বিনিয়োগ নয়। এবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব এবং বাজারভিত্তিক প্রকল্পের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই পরিবর্তন পাকিস্তানের জন্য সুযোগও হতে পারে, আবার ঝুঁকিও হতে পারে। সুযোগ হলো—প্রযুক্তি, উৎপাদন, কৃষি ও আর্থিক খাতে নতুন দক্ষতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। ঝুঁকি হলো—যদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না হয়, তবে এসব সমঝোতা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
সাম্প্রতিক সম্মেলনে প্রযুক্তি খাতের ওপর জোর দেওয়াকে অনেকেই বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করছেন। কারণ পাকিস্তান একদিকে তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল বাণিজ্যকে এগিয়ে নিতে চীনা কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্ব করছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে ডিজিটাল পরিবেশ ক্রমেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠছে। ইন্টারনেট বন্ধ, ডিজিটাল নজরদারি এবং অনলাইন পরিসরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি খাতে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীদের জন্য বড় বাধা তৈরি করছে। এমন পরিবেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আর্থিক প্রযুক্তি বা ডিজিটাল বাণিজ্যে বড় অগ্রগতি অর্জন সহজ নয়।
এখানেই পাকিস্তানের মূল চ্যালেঞ্জ। শুধু সম্মেলন আয়োজন বা স্মারক সমঝোতা স্বাক্ষর করলেই অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসে না। বিনিয়োগকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং বাজারভিত্তিক বাস্তব পরিকল্পনা। পাকিস্তান যদি এসব জায়গায় উন্নতি করতে না পারে, তবে নতুন ব্যবসায়িক সম্মেলনগুলো পুরোনো প্রতিশ্রুতির নতুন মোড়ক ছাড়া আর কিছু নাও হতে পারে।
অন্যদিকে চীনও জানে, পাকিস্তানে বিনিয়োগ মানে শুধু বাণিজ্যিক লাভের হিসাব নয়। সেখানে নিরাপত্তা, কূটনীতি, জনমত, ঋণঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক চাপ সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক কোন দিকে যায়, সেটিও পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাকিস্তান একদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল, অন্যদিকে চীনা বিনিয়োগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই দ্বৈত নির্ভরতা ইসলামাবাদকে জটিল কূটনৈতিক ভারসাম্যের মধ্যে রাখছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ব্যবসা–ব্যবসা সম্মেলনের মাধ্যমে চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরকে নতুনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। এটি পুরোনো অবকাঠামোকেন্দ্রিক করিডরকে প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও বেসরকারি বিনিয়োগকেন্দ্রিক নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা। তবে এই পরিবর্তন কতটা বাস্তব ফল দেবে, তা নির্ভর করবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগ বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর।
চীন ও পাকিস্তান এখনো এই করিডরকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত হলেও দুই দেশই প্রকল্পটিকে জীবিত রাখতে আগ্রহী। কিন্তু সম্মেলনের ভাষা যতই আশাবাদী হোক, বাস্তব প্রশ্ন রয়ে গেছে—এটি কি পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য কার্যকর নতুন পথ, নাকি পুরোনো নির্ভরতার নতুন নাম?

