রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চতুর্থ বছরে প্রবেশের পরও শান্তির কোনো সুস্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না। বরং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগও নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যুদ্ধ বন্ধে সরাসরি আলোচনার জন্য ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
পুতিন স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জেলেনস্কির সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকের প্রয়োজনীয়তা তিনি দেখছেন না। ফলে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সম্ভাব্য সংলাপের যে ক্ষীণ আশা তৈরি হয়েছিল, সেটিও আপাতত ভেস্তে গেছে।
গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) জেলেনস্কি এক খোলা চিঠির মাধ্যমে পুতিনকে সরাসরি আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। সেখানে তিনি যুক্তি দেন, ২০২২ সালে শুরু হওয়া যুদ্ধের অবসানে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কার্যকর ফল দিচ্ছে না। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ অন্যদিকে সরে যাচ্ছে, যার প্রভাব যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টার ওপরও পড়ছে।
জেলেনস্কির মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে শুধু ইউক্রেন বা রাশিয়াই নয়, গোটা ইউরোপীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই একটি বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খুঁজে বের করা জরুরি।
তবে মস্কোর অবস্থান ভিন্ন। শুক্রবার (৫ জুন) সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত রাশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য দিতে গিয়ে পুতিন জেলেনস্কির প্রস্তাবকে গুরুত্বহীন বলে ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে এমন বৈঠকের কোনো প্রয়োজন তিনি অনুভব করছেন না।
রুশ প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, জেলেনস্কির আহ্বান প্রকৃতপক্ষে আলোচনার পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টা ছিল কি না, তা নিয়েও তার সন্দেহ রয়েছে। বরং এটি বাস্তব আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার একটি রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
পুতিন আবারও তার পুরোনো অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তার মতে, কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগে শান্তি আলোচনার মৌলিক কাঠামো ও শর্ত নিয়ে সমঝোতা হওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ যুদ্ধ থামানোর আগে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমাধানের ভিত্তি নির্ধারণ করতে হবে।
অন্যদিকে পুতিনের এই প্রত্যাখ্যানের পর হতাশা প্রকাশ করেছেন জেলেনস্কি। তিনি বলেন, রাশিয়া আবারও যুদ্ধের পথই বেছে নিচ্ছে। তার মতে, পুতিনের বক্তব্য প্রমাণ করে যে ক্রেমলিন এখনো যুদ্ধ শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত নয়।
জেলেনস্কি আরও দাবি করেন, বিশ্বের বহু মানুষ এই প্রতিক্রিয়ায় হতাশ হয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংঘাতের অবসানে কূটনৈতিক উদ্যোগই ছিল সবচেয়ে প্রত্যাশিত পথ।
যুদ্ধ বন্ধের প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ধরনের দূরত্ব রয়েছে। রাশিয়া বরাবরই দাবি করে আসছে, ইউক্রেনকে দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও ঝাপোরিজ্জিয়া অঞ্চল থেকে সরে যেতে হবে। পাশাপাশি উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোটে যোগদানের প্রচেষ্টাও পরিত্যাগ করতে হবে।
কিন্তু কিয়েভ এসব শর্ত মানতে রাজি নয়। ইউক্রেনের নেতৃত্ব মনে করে, ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়া মানে ভবিষ্যতে আরও বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করা। তাদের আশঙ্কা, একবার ছাড় দেওয়া হলে রাশিয়া ভবিষ্যতে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে উৎসাহিত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষের অবস্থান এতটাই বিপরীতমুখী যে অচিরেই কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ। একদিকে রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত অবস্থানকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিতে চায়, অন্যদিকে ইউক্রেন নিজের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষার প্রশ্নে আপস করতে নারাজ।
ফলে যুদ্ধবিরতি কিংবা স্থায়ী শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা আপাতত দূরের বিষয় বলেই মনে হচ্ছে। বরং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও যুদ্ধের সমাপ্তি এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

