যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বহু দশক ধরে ঘনিষ্ঠ মিত্র। সামরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং কৌশলগত স্বার্থ—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের সম্পর্ক গভীর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই সম্পর্কের ভেতরেই এক ধরনের অস্বস্তি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কৌশল, লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়ছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য ইসরায়েলি গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে পেন্টাগনের নতুন সতর্কতা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েলকে ঘিরে পাল্টা গোয়েন্দা হুমকির মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেছে। দুই বর্তমান ও এক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানানো হয়েছে, সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে ইসরায়েল সম্পর্কিত হুমকিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এর অর্থ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা মহল মনে করছে—ইসরায়েল শুধু সাধারণ কূটনৈতিক তথ্য জানার চেষ্টা করছে না; বরং ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আলোচনাও তাদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা, নীতিগত দ্বিধা এবং ভবিষ্যৎ সামরিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে ইসরায়েল। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র আবার বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেবে কি না, নাকি কূটনৈতিক সমাধানের পথেই এগোবে—এই প্রশ্নে তেল আবিবের গভীর আগ্রহ রয়েছে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।
একজন বর্তমান মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নের সঙ্গে সাত পৃষ্ঠার একটি নথি ও একটি চার্ট যুক্ত ছিল। সেখানে ইসরায়েলের মানবভিত্তিক গোয়েন্দা সংগ্রহ এবং প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য আহরণের সক্ষমতাকে অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই নথিতে কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনার কথাও বলা হয়েছে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে ঠিক কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই সতর্কতা এতটা বাড়ানো হয়েছে, তা প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।
অন্যদিকে ইসরায়েল এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেছেন, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করে—এ দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের গোয়েন্দা কার্যক্রম মিত্রদের বিরুদ্ধে নয়, শত্রুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। এ ধরনের অভিযোগকে তিনি ভুল তথ্যনির্ভর অথবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিয়েছেন।
পেন্টাগন এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তাও প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, পুরো বিষয়টিই মিথ্যা এবং এমন এক সূত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যিনি আসলে কী ঘটছে সে সম্পর্কে অবগত নন। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদারকি প্রতিষ্ঠানও এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
তবে কূটনৈতিক বাস্তবতা হলো, মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ একেবারে অস্বাভাবিক নয়। বিশ্ব রাজনীতিতে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও প্রতিটি রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা, স্বার্থ ও কৌশলগত অবস্থান সম্পর্কে আগাম ধারণা পেতে চায়। কিন্তু বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের তৎপরতা স্বাভাবিক কূটনৈতিক আগ্রহের সীমা ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এ কারণেই বিষয়টি শুধু নিরাপত্তা উদ্বেগ নয়, বরং দুই মিত্রের পারস্পরিক আস্থার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
এই সতর্কতা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে ইরান যুদ্ধ এবং লেবানন ইস্যুতে মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এক ফোনালাপ দুই নেতার মধ্যে বেশ উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প স্বীকার করেন, তিনি ওই আলাপে নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এই মন্তব্য শুধু ব্যক্তিগত বিরক্তির প্রকাশ নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে দুই দেশের ভিন্ন অবস্থানের ইঙ্গিতও বহন করে।
এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হলো সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নতুন করে বড় যুদ্ধের ঝুঁকি কমানো। কিন্তু ইসরায়েল এ বিষয়ে সন্দিহান। তেল আবিব মনে করে, তেহরান কোনো চুক্তি বা সমঝোতা কতটা মেনে চলবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন আছে।
নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে আবারও ব্যাপক বিমান হামলা শুরুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান সীমিত করার যে আহ্বান ট্রাম্প জানিয়েছেন, সেটির সঙ্গেও তিনি একমত নন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের দিকে যেতে চাইছে, ইসরায়েল সেখানে আরও আক্রমণাত্মক সামরিক অবস্থানের পক্ষে থাকতে পারে—এমন ধারণা তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিগত আলোচনার ওপর নজর রাখার চেষ্টা করে থাকে, তাহলে তা তাদের কৌশলগত উদ্বেগ থেকেই হতে পারে। ইসরায়েলের জন্য ইরান শুধু আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় হুমকি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ইরান নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, তা জানা তেল আবিবের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে, মিত্র হলেও কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের এমন নজরদারি গ্রহণযোগ্য নয়।
এই নতুন মূল্যায়নের তাৎক্ষণিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে মার্কিন কর্মকর্তাদের সফর ও বৈঠকের নিরাপত্তা ব্যবস্থায়। বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, ইসরায়েল সফরে গেলে মার্কিন কর্মকর্তারা আগেও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। এখন সেই সতর্কতা আরও বাড়তে পারে। সংবেদনশীল বৈঠক, ব্যক্তিগত যোগাযোগ, ফোন ব্যবহার, কম্পিউটার ব্যবহার এবং হোটেল কক্ষে আলোচনা—সবকিছুতে বাড়তি নজরদারি এড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তারা ইসরায়েল সফরের সময় অনেক ক্ষেত্রে অস্থায়ী ফোন বা অস্থায়ী কম্পিউটার ব্যবহার করেন। কারণ তারা ধরে নেন, সফরের সময় তাদের যোগাযোগ বা আলোচনার বিষয়ে আগ্রহী পক্ষ থাকতে পারে। হোটেল কক্ষেও সংবেদনশীল আলোচনা না করার মতো সতর্কতা নেওয়া হয়। এই আচরণ দেখায়, প্রকাশ্যে যতই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকুক, নিরাপত্তা মহলে অবিশ্বাসের জায়গা পুরোপুরি অনুপস্থিত নয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এমিলি হার্ডিং বলেছেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এবং যুক্তরাষ্ট্র কী করছে, তা জানার বিষয়ে তাদের আগ্রহ খুব বেশি। তাঁর মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি নতুন নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিরাপত্তা মহলে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে সতর্কতা রয়েছে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ অতীতেও বড় বিতর্ক তৈরি করেছে। ১৯৮০-এর দশকে মার্কিন নৌবাহিনীর গোয়েন্দা বিশ্লেষক জনাথন পোলার্ড ইসরায়েলের জন্য গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। গোপন নথি ইসরায়েলের কাছে সরবরাহের অভিযোগে তাঁকে ৩০ বছর কারাভোগ করতে হয়। সেই ঘটনা ওয়াশিংটন–তেল আবিব সম্পর্কে বড় ধাক্কা দিয়েছিল এবং আজও মার্কিন নিরাপত্তা মহলে সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেও মিত্র দেশগুলোর ওপর নজরদারি চালিয়েছে—এ কথাও অস্বীকার করা যায় না। ২০১৩ সালে সাবেক গোয়েন্দা ঠিকাদার এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা নথিতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির তৎকালীন চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলসহ ইউরোপীয় নেতাদের ফোনে আড়িপাতার কাজ করেছিল। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্ব ও নজরদারি অনেক সময় পাশাপাশি চলে। কিন্তু যখন কোনো সংবেদনশীল যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মিত্রের ওপর সন্দেহ তৈরি হয়, তখন সেটি কূটনৈতিক আস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে দৈনন্দিন উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা সহযোগিতা আপাতত বন্ধ হয়নি। দুই দেশের সামরিক ও গোয়েন্দা সম্পর্ক এখনও কার্যকর আছে। কিন্তু নতুন সতর্কতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, সম্পর্কের ভেতরে অস্বস্তি বাড়ছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল যদি ইসরায়েলের প্রত্যাশার সঙ্গে না মেলে, তাহলে এই অবিশ্বাস আরও গভীর হতে পারে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগ এবং ইসরায়েলের সম্ভাব্য নজরদারি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ—দুটিই একই সংকটের দুই দিক। ইরান প্রশ্নে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের লক্ষ্য এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও কূটনৈতিক সমঝোতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, আর ইসরায়েল তার সরাসরি নিরাপত্তা হুমকির জায়গা থেকে সামরিক পদক্ষেপকে বেশি কার্যকর মনে করছে।
ফলে পেন্টাগনের এই সতর্কতা শুধু একটি গোয়েন্দা মূল্যায়ন নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্কের বর্তমান জটিল অবস্থার প্রতিফলন। প্রকাশ্যে দুই দেশ এখনও মিত্র, কিন্তু পর্দার আড়ালে কৌশলগত সন্দেহ, নীতিগত দূরত্ব এবং নিরাপত্তাজনিত অস্বস্তি বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, এই ধরনের সন্দেহ ততই বড় আকার নিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়—ইসরায়েল কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত জানার জন্য অতিরিক্ত গোয়েন্দা তৎপরতা চালাচ্ছে, নাকি এটি ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ নীতিগত দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ? উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এতটুকু নিশ্চিত, ইরান যুদ্ধ ও লেবানন পরিস্থিতি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। আর সেই সংবেদনশীলতার মাঝেই পেন্টাগনের সর্বোচ্চ সতর্কতা দুই দেশের দীর্ঘদিনের আস্থার সম্পর্ককে নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

