কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি চলছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কথাও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। একদিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, অন্যদিকে পাল্টা বিমান অভিযান—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, ইরান ও ইসরায়েলের চলমান উত্তেজনা কি শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে?
সোমবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানায়, ইরানের সঙ্গে সংঘাত আরও কয়েক দিন চলতে পারে। এমনকি তারা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছে যে পরিস্থিতি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে গড়ানোর সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজন হলে সব ফ্রন্টে আরও বড় পরিসরের প্রতিশোধমূলক অভিযান চালাতে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ফলে দুই পক্ষের বক্তব্যই ইঙ্গিত দিচ্ছে, আপাত যুদ্ধবিরতির আড়ালে সামরিক উত্তেজনা কমার পরিবর্তে আরও বাড়ছে।
গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের পর বর্তমানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখলে সেই যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রোববার রাত থেকে ইসরায়েলের দিকে অন্তত ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। যদিও ইসরায়েল দাবি করছে, অধিকাংশ হামলাই প্রতিহত করা হয়েছে অথবা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো জনবসতিহীন এলাকায় গিয়ে পড়েছে।
তবে হামলার সংখ্যা এবং ধারাবাহিকতা দেখেই বোঝা যায়, পরিস্থিতি এখনও অস্থির এবং বিস্ফোরণমুখী।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইসরায়েলও দ্রুত পাল্টা পদক্ষেপ নেয়। রোববার রাতে পশ্চিম ও মধ্য ইরানের নয়টি প্রতিরক্ষা স্থাপনায় বিমান হামলা চালানো হয়। এরপর সোমবার সকালে দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সের তিনটি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে নতুন হামলা পরিচালনা করা হয়।
ইসরায়েলের দাবি, এসব অভিযান তারা নিজেরাই পরিচালনা করেছে। তবে একই সঙ্গে স্বীকার করা হয়েছে যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখা হয়েছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের বড় সামরিক পদক্ষেপের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নীরব সমর্থন থাকে।
সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইও একই ধরনের মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় ছাড়া ইসরায়েল এত বড় সামরিক পদক্ষেপ নেবে—এটা বিশ্বাস করা কঠিন।
এই বক্তব্য শুধু কূটনৈতিক অভিযোগ নয়; বরং এটি ভবিষ্যৎ সংঘাতের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সংঘাতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ইরান এবার তাদের সামরিক অভিযানের নাম দিয়েছে ‘নাসর’। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মতে, গত বছরের জুনে সংঘটিত ১২ দিনের যুদ্ধে নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই নামকরণ করা হয়েছে।
তাদের দাবি, দেশের তিনটি রাডার স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান শুরু করা হয়েছে। অভিযানের আওতায় ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান প্রকাশ্যে জানিয়েছে যে ভবিষ্যতের জন্য তাদের সব সামরিক ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ তেহরান আপাতত সংঘাত কমানোর নয়, বরং প্রয়োজন হলে আরও বড় জবাব দেওয়ার বার্তাই দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে না গেলেও ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। কারণ দুই পক্ষই এখন প্রতিরোধ নয়, প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলছে।
একদিকে ইরান তার আঞ্চলিক প্রভাব ও সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করতে চায়। অন্যদিকে ইসরায়েলও দেখাতে চাইছে যে তারা যেকোনো হামলার জবাব দিতে প্রস্তুত।
এই অবস্থায় একটি ভুল হিসাব, একটি বড় হামলা কিংবা কোনো উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যুর মতো ঘটনা দ্রুত পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার আলোচনার আহ্বান জানালেও মাঠের বাস্তবতা এখনো কূটনীতির পক্ষে যাচ্ছে না। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, বিমান হামলা এবং পাল্টা অভিযানের মধ্য দিয়ে উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে।
ফলে আপাতত মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধবিরতির চেয়ে যুদ্ধের আশঙ্কাই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইরান ও ইসরায়েল কেউই এখন পিছু হটার ইঙ্গিত দিচ্ছে না। আর সেই কারণেই অঞ্চলজুড়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—এই সংঘাত কি সীমিত উত্তেজনার মধ্যেই আটকে থাকবে, নাকি খুব শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্য আরেকটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সাক্ষী হতে যাচ্ছে?

