আগে ধারণা করা হচ্ছিল, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার পরিষদীয় দলের মতো তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদীয় দল ১০ বা ১১ জুনের দিকে ভাঙনের মুখে পড়তে পারে। কিন্তু ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠক শুরুর দিন, ৮ জুন থেকেই সেই ভাঙনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সোমবার বেলা ১১টার দিকে ইস্তফাপত্র জমা দেন তৃণমূল কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা সুখেন্দু শেখর রায়। শুধু রাজ্যসভার সদস্যপদ নয়, তিনি দল থেকেও পদত্যাগ করেন।
ইস্তফার পর গণমাধ্যমের সামনে তিনি বলেন, দলের যেভাবে চলা উচিত ছিল, সেভাবে পরিচালিত হয়নি। এত বড় বিপর্যয়ের কারণ বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তা করা হয়নি। তাঁর অভিযোগ, জনতা দলের প্রতি আস্থা হারিয়েছে, আর ভোটের ফলই তার প্রমাণ। তাঁর মতে, দল এখন জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
সুখেন্দু শেখর রায়ের পদত্যাগের পরই তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশ বিক্ষুব্ধ সংসদ সদস্যরা দিল্লিতে নিজেদের মধ্যে বৈঠকে বসেন। এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে। দল ছাড়লেও সুখেন্দু শেখর রায় সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
এছাড়া বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বারাসাতের সংসদ সদস্য কাকলি ঘোষ দস্তিদার, হাওড়ার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, বীরভূমের অসিত মাল, বারাকপুরের পার্থ ভৌমিক, মথুরাপুরের বাপি হালদার, কোচবিহারের জগদীশ বাসুনিয়া, বর্ধমান পূর্বের শর্মিলা রায় এবং ঝাড়গ্রামের কালীপদ সোরেন।
তৃণমূলের পরিচিত মুখ এবং চলচ্চিত্র অঙ্গনের কয়েকজনও ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শতাব্দী রায়, জুন মালিয়া, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দেব অধিকারী। এছাড়া আবু তাহের, খলিলুর রহমান ও ইউসুফ পাঠানও সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যাচ্ছে।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভায় মোট সদস্য সংখ্যা ২৮ জন। বিক্ষুব্ধ পক্ষের দাবি, এর মধ্যে ১৯ জন বৈঠকে যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, ২৮ জনের মধ্যে ২১ জন ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, এই সংসদ সদস্যরা কি তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে আলাদা কোনো ব্লক গঠন করবেন, নাকি সরাসরি ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেবেন—তা এখনো পরিষ্কার নয়। দলত্যাগের ক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন, অর্থাৎ ২১ জনের সমর্থন জরুরি। তবে ভারতীয় জনতা পার্টির ভেতরে তৃণমূল নেতাদের সরাসরি দলে নেওয়ার বিষয়ে কিছু আপত্তির কথাও শোনা যাচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
দলটির একটি অংশের লক্ষ্য তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থন নিজের দিকে টেনে নেওয়া, যাতে লোকসভা ও রাজ্যসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন নিশ্চিত করা যায় এবং সংবিধান সংশোধনী বিল পাসে কোনো বাধা না থাকে।
এদিকে দিল্লিতে অবস্থান করছেন তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকের মধ্যেই এই রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ শুরু হওয়ায় জোটের জন্য তা বড় ধরনের অস্বস্তির কারণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও দিল্লিতে রয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে’ পশ্চিমবঙ্গ যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে রাজ্যের সাড়ে ছয় কোটি মানুষ কেন্দ্রীয় এই স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। উল্লেখ্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন এই স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পে রাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।

