মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে নতুন করে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। কয়েকদিন ধরে চলা পাল্টাপাল্টি হামলা ও উত্তেজনার পর ইরান ও ইসরায়েল উভয় পক্ষই সামরিক অভিযান থেকে আপাতত সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি সরাসরি উভয় পক্ষকে সব ধরনের হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানান।
সোমবার (৮ জুন) ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানায়, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের চলমান সামরিক অভিযান সমাপ্তির ঘোষণা দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে দিয়েছে, ভবিষ্যতে যদি লেবাননের ভূখণ্ডে নতুন করে হামলা চালানো হয়, তাহলে ইরান আবারও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাতে দ্বিধা করবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই অবস্থান একদিকে যেমন উত্তেজনা কমানোর ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে এটি একটি স্পষ্ট বার্তাও বহন করে—তেহরান এখনো তার আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা প্রশ্নে আপস করতে প্রস্তুত নয়।
এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ইরান ও ইসরায়েলকে সংঘাত বন্ধ করে কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তার এই আহ্বানের কিছুক্ষণ পরই কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়তে শুরু করে।
ইসরায়েলি সূত্রের দাবি, হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্তের আগে ট্রাম্পের সঙ্গে দেশটির প্রেসিডেন্টের টেলিফোনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। ওই আলোচনায় বর্তমান পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সংঘাত বিস্তার রোধের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায় বলে জানা গেছে।
পরবর্তীতে এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্পের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালানোর পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি ইসরায়েলি শহরগুলো লক্ষ্য করে হিজবুল্লাহর হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে আবারও সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে।
গত রবিবার গভীর রাতে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়, যখন ইরান ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তেহরানের দাবি ছিল, বৈরুতের উপকণ্ঠে ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়াতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর জবাবে ইসরায়েলও ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা পরিচালনা করে। ফলে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এই উত্তেজনা শুধু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লেবানন, সিরিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থ। ফলে সামান্য একটি সামরিক পদক্ষেপও বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে হামলা বন্ধের এই সম্মতি স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা নয়। বরং এটি সংঘাতের মধ্যে একটি সাময়িক বিরতি মাত্র। কারণ উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ অব্যাহত রেখেছে।
তবে তা সত্ত্বেও সামরিক উত্তেজনা কমানোর এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে পারলে শুধু ইরান ও ইসরায়েল নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যই একটি বড় ধরনের সংঘাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।
এখন নজর থাকবে আগামী কয়েক দিনের পরিস্থিতির দিকে। হামলা স্থগিতের এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয় এবং উভয় পক্ষ কতদিন সংযম বজায় রাখে, সেটিই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শান্তির সম্ভাবনা তৈরি হবে নাকি অঞ্চলটি আবারও ভয়াবহ সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাবে।

