যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই সন্দেহ, চাপ, পাল্টা চাপ এবং অবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কখনও পারমাণবিক কর্মসূচি, কখনও নিষেধাজ্ঞা, কখনও আঞ্চলিক প্রভাব, আবার কখনও আটক নাগরিকদের মুক্তি—প্রতিটি ইস্যুই দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে। কিন্তু ০৯ জুন ২০২৬-এর বর্তমান বাস্তবতায় এই অচলাবস্থার কেন্দ্রে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হলো জিম্মি সংকটের পুরোনো কৌশল। শুধু মানুষ নয়, এবার জিম্মি হিসেবে সামনে এসেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন একসঙ্গে দুটি বড় লক্ষ্য সামনে রেখে এগোতে চাইছেন। একদিকে তিনি হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করতে চান, অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, দুই পক্ষ আলোচনা করছে এবং কোনো একটি সমঝোতার পথ খুঁজছে। কিন্তু বাস্তবতা আরও গভীর। আলোচনার টেবিলে ওয়াশিংটন ও তেহরান একই বিষয়ে কথা বললেও তাদের চিন্তার কাঠামো সম্পূর্ণ আলাদা।
যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিকে দেখছে শক্তি, চাপ ও প্রভাবের জায়গা থেকে। তাদের ধারণা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, বন্দর অবরোধ এবং তেল রপ্তানির ওপর চাপ তৈরি করলে ইরান শেষ পর্যন্ত নরম হতে বাধ্য হবে। অন্যদিকে ইরান বিষয়টিকে দেখছে নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি হিসেবে। তেহরানের হিসাব হলো, কোনো মূল্যবান সম্পদ নিজেদের হাতে ধরে রাখলে এবং দ্রুত ছাড় না দিলে প্রতিপক্ষের ওপর উল্টো চাপ সৃষ্টি করা যায়। এই জায়গাতেই জিম্মি সংকটের পুরোনো ছায়া নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
জিম্মি সংকটের মূল শক্তি হলো ক্ষমতার স্বাভাবিক ভারসাম্যকে উল্টে দেওয়া। সাধারণ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তিতে ইরানের তুলনায় অনেক এগিয়ে। কিন্তু যখন তেহরান এমন কিছু ধরে রাখে, যা ওয়াশিংটন ফেরত পেতে মরিয়া, তখন পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন শক্তিশালী রাষ্ট্রও আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। কারণ, যার হাতে জিম্মি থাকে, সে সময়কে নিজের পক্ষে ব্যবহার করতে পারে।
এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত দেখা যায় ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। সে সময় এভিন কারাগার থেকে পাঁচ মার্কিন নাগরিকের মুক্তির বিনিময়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা ইরানের ৬০০ কোটি ডলার কাতারে স্থানান্তরের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর ওয়াশিংটন আবার সেই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করে দেয়। সেই অবরুদ্ধ অর্থের বিষয়টি এখনো ইরানের রাজনৈতিক হিসাবের অংশ হিসেবে রয়ে গেছে।
বর্তমান সংকটে ইরান একই কৌশল আরও বড় পরিসরে ব্যবহার করছে বলে মনে করা হচ্ছে। এবার জিম্মি কোনো ব্যক্তি নয়, বরং হরমুজ প্রণালি। এটি শুধু একটি সামুদ্রিক পথ নয়; এটি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনি। বিশ্ব খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ধাক্কা পড়ে জ্বালানি বাজারে, পরিবহন ব্যয়ে, পণ্যমূল্যে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর।
ইরান ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামরিক সতর্কতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিকে কার্যত চাপ প্রয়োগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। তেহরানের দৃষ্টিতে হরমুজ এখন তাদের হাতে থাকা সবচেয়ে মূল্যবান দরকষাকষির উপকরণ। অতীতে আটক নাগরিকদের বিনিময়ে অর্থ বা ছাড় আদায়ের কৌশল ব্যবহৃত হয়েছিল। এবার সেই কৌশল আরও বড় আকারে প্রয়োগ করা হচ্ছে, যেখানে জিম্মি হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চলাচলপথ।
সম্প্রতি ইরানের সামরিক উপদেষ্টা মহসেন রেজাই বলেছেন, ওয়াশিংটন যতক্ষণ না তাদের অবরুদ্ধ করে রাখা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ফেরত দেবে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে। এই অর্থের মধ্যে ২০২৩ সালের সেই ৬০০ কোটি ডলারও রয়েছে। অর্থাৎ, ইরানের দৃষ্টিতে বর্তমান সংকট শুধু নিরাপত্তা বা সামরিক অবস্থানের প্রশ্ন নয়; এটি অর্থ, মর্যাদা এবং চাপের জবাব চাপ দিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন।
এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। কারণ, ওয়াশিংটন যদি ইরানের দাবি মেনে নেয়, তাহলে তা তেহরানের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা হবে। আবার দাবি না মানলে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় অচল বা অনিরাপদ থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে তেলের দাম বাড়তে পারে, বিশ্ববাজার অস্থির হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তার মিত্রদের চাপও বাড়তে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে। ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ, তেল রপ্তানি সীমিত করা এবং রাজস্ব আয়ে আঘাত হানার মাধ্যমে ওয়াশিংটন তেহরানকে দুর্বল করতে চাইছে। এই চাপের ফলে ইরান অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়েছে। তবে এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। কারণ, ইরানের কট্টরপন্থি নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্ভোগকে সব সময় নীতিগত ছাড় দেওয়ার কারণ হিসেবে বিবেচনা করে না।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোও এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। জনগণের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও শাসকগোষ্ঠী যদি মনে করে হরমুজ ধরে রাখাই তাদের কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে, তাহলে তারা দ্রুত পিছু হটবে না। বরং সময়ক্ষেপণ তাদের জন্য একটি কার্যকর অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। কারণ, প্রতিদিন হরমুজ অচল থাকলে চাপ শুধু ইরানের ওপর নয়, বিশ্ববাজারের ওপরও বাড়ে।
সামরিক পথও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ নয়। হরমুজ প্রণালি সামরিকভাবে উন্মুক্ত করার চেষ্টা করলে তা সরাসরি সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি করবে। ট্রাম্প যদি আবার সামরিক পদক্ষেপ নেন, তাহলে ইরান যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করার হুমকি দিয়েছে। মহসেন রেজাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, অবরোধ না তুললে তারা সংঘাতকে ভারত মহাসাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং লোহিত সাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ, এক জিম্মির বদলে আরও নতুন জিম্মি তৈরির হুমকিই এখানে মূল বার্তা।
এই হুমকির গভীর তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও লোহিত সাগরও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি সংঘাত এসব পথে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে জ্বালানি পরিবহন, পণ্য পরিবহন, বীমা ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ শুধু ইরানকে লক্ষ্য করে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা দ্রুত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
এখানে ওয়াশিংটনের সামনে মূলত তিনটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথম পথ হলো ধৈর্য ধরা। অর্থাৎ, তেলের দাম বৃদ্ধি, বাজারের অস্থিরতা এবং মিত্রদের চাপ সহ্য করে ইরানের ভেতরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতার অপেক্ষা করা। কিন্তু এই পথ দীর্ঘ, অনিশ্চিত এবং ব্যয়বহুল। বিশ্ববাজার কত দিন এই চাপ সহ্য করতে পারবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
দ্বিতীয় পথ হলো ইরানের দাবির কিছু অংশ মেনে নেওয়া। এতে হরমুজ প্রণালি খুলতে পারে এবং তাৎক্ষণিক চাপ কমতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি ট্রাম্পের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর হবে। কারণ, ইরানকে কোটি কোটি ডলার ছাড় দেওয়া বা অবরুদ্ধ সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ওয়াশিংটনের দুর্বলতা হিসেবে তুলে ধরা হতে পারে। ইরানও একে নিজেদের কৌশলের বিজয় হিসেবে প্রচার করবে।
তৃতীয় পথ হলো সর্বাত্মক সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাওয়া। এটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ। সামরিক শক্তি দিয়ে হরমুজ উন্মুক্ত করার চেষ্টা হয়তো অল্প সময়ের জন্য দৃঢ় বার্তা দিতে পারে, কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ইরান যদি সংঘাতকে ছড়িয়ে দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে একসঙ্গে একাধিক সামুদ্রিক পথ, আঞ্চলিক মিত্র, জ্বালানি বাজার এবং সামরিক ঘাঁটি রক্ষার হিসাব করতে হবে। এতে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানের হিসাব তুলনামূলকভাবে সরল। তাদের হাতে আছে একটি মূল্যবান চাপের উপকরণ। তারা সেটি ধরে রেখে অপেক্ষা করছে। যত সময় যাবে, তত বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বাড়বে, তেলের দাম নিয়ে উদ্বেগ বাড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সমঝোতার চাপ বাড়বে। এই কৌশলে তেহরান দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য নয়; বরং ওয়াশিংটনকেই দ্রুত সমাধানের প্রয়োজন বেশি অনুভব করতে হতে পারে।
তবে ইরানের জন্যও ঝুঁকি কম নয়। দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা ইরানের অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে পারে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান তৈরি হতে পারে। এমনকি মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও অস্বস্তি দেখা দিতে পারে, যদি হরমুজ সংকটের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ক্ষতির মুখে পড়ে।
এই সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় বিরোধ নয়। হরমুজ প্রণালি জড়িয়ে যাওয়ার কারণে বিষয়টি এখন বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তেলের বাজার, জাহাজ চলাচল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি—সবকিছুই এই অচলাবস্থার প্রভাব অনুভব করছে। তাই এটি শুধু সামরিক শক্তির প্রশ্ন নয়; এটি ধৈর্য, দরকষাকষি, সময় নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক মর্যাদার লড়াই।
যুক্তরাষ্ট্র চাইছে চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে নমনীয় করতে। ইরান চাইছে মূল্যবান সম্পদ ধরে রেখে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে। এই দুই অবস্থানের মাঝখানে আটকে আছে আলোচনা। কেউ পিছু হটতে চাইছে না, আবার কেউ সম্পূর্ণ সংঘাতেও যেতে চাইছে না। ফলে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
শেষ পর্যন্ত এই সংকটের সমাধান নির্ভর করবে দুই পক্ষের হিসাব বদলায় কি না তার ওপর। যদি যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে, সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে দ্রুত ফল পাওয়া কঠিন, তাহলে তারা কোনো ধরনের সীমিত সমঝোতার পথ খুঁজতে পারে। আবার যদি ইরান মনে করে, হরমুজ ধরে রাখার মূল্য তার নিজের জন্যই বেশি হয়ে যাচ্ছে, তাহলে তারাও কৌশল পরিবর্তন করতে পারে।
কিন্তু আপাতত বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালি ইরানের হাতে একটি শক্তিশালী দরকষাকষির অস্ত্র হয়ে উঠেছে। আর যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সংকটে পড়েছে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তেরই বড় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক মূল্য আছে। জিম্মি সংকটের পুরোনো ছায়া তাই নতুন রূপে ফিরে এসেছে—এবার একজন নাগরিক নয়, বরং একটি সামুদ্রিক পথকে কেন্দ্র করে। এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অচলাবস্থার মূল জায়গায় এখন জিম্মি কূটনীতির যুক্তিই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

