মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি বিরল ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আবারও বড় ধরনের সংঘাতে জড়ালে ইসরায়েলকে হয়তো একাই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন কয়েকদিনের সামরিক উত্তেজনার পর ইরান ও ইসরায়েল উভয়েই হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধবিরতির এই নাজুক পরিস্থিতির মধ্যেও ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের অবস্থানের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক বার্তাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ট্রাম্প এখন মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নন। বরং তিনি আলোচনার মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগোতে চান। সে কারণেই তিনি প্রকাশ্যে এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগে উভয় পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই শান্তির আহ্বান জানাননি, সরাসরি নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনেও কথা বলেছেন। সেখানে তিনি সতর্ক করে বলেন, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সমর্থন হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তার বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল—“সাবধান হও, নইলে খুব দ্রুতই তোমাকে একা হয়ে যেতে হবে।” এই একটি বাক্যই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান কূটনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়।
কেন বিরক্ত ট্রাম্প?
পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্পের প্রধান উদ্বেগ হলো তার যুদ্ধবিরতি উদ্যোগ বারবার সামরিক পদক্ষেপের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গত ৮ এপ্রিল ঘোষিত যুদ্ধবিরতি বড় আকারের সংঘাত কিছুটা থামাতে সক্ষম হলেও অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা কখনোই পুরোপুরি কমেনি।
বিশেষ করে বৈরুতে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার পর পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর জবাবে ইরান উত্তর ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এরপর উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের প্রশাসন চাইছে সংঘাতকে সীমিত রাখতে এবং আলোচনার পথ খোলা রাখতে। কারণ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে শুধু ইরান ও ইসরায়েল নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে।
ইসরায়েলের অবস্থান অপরিবর্তিত
অন্যদিকে নেতানিয়াহু তার অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসার ইঙ্গিত দেননি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ইসরায়েল আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে এবং প্রয়োজন হলে আরও শক্তিশালী জবাব দেবে।
তার বক্তব্যে বোঝা যায়, ইসরায়েল এখনো মনে করে সামরিক চাপই ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তাই ভবিষ্যতে নতুন হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রস্তুতিও তারা ধরে রাখছে।
তবে কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—যদি ওয়াশিংটন সত্যিই সংঘাত থেকে দূরে থাকতে চায়, তাহলে ভবিষ্যতে ইসরায়েল কতটা স্বাধীনভাবে সামরিক অভিযান চালাতে পারবে?
ইরানের বার্তা কী?
ইরানও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শন হিসেবে তুলে ধরছে। দেশটির শীর্ষ নেতারা দাবি করছেন, তাদের সামরিক অভিযান ইসরায়েলকে নতুন করে যুদ্ধবিরতির কথা ভাবতে বাধ্য করেছে।
তবে একই সঙ্গে তেহরান আলোচনার দরজাও খোলা রেখেছে। ইরানের নেতৃত্ব জানিয়েছে, তারা এখনো কূটনৈতিক সমাধানে আগ্রহী এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষ করে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগ চলার খবর নতুন করে আশাবাদ তৈরি করেছে। উভয় পক্ষই কোনো না কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা খুঁজছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে।
যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—বর্তমান যুদ্ধবিরতি কতদিন টিকে থাকবে?
একদিকে ট্রাম্প আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান চান। অন্যদিকে ইসরায়েল ও ইরান উভয়ই নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি বজায় রেখেছে। ফলে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত ভঙ্গুর।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা শুধু নেতানিয়াহুর উদ্দেশে নয়; এটি পুরো অঞ্চলের জন্য একটি রাজনৈতিক বার্তা। ওয়াশিংটন বোঝাতে চাইছে, নতুন করে বড় আকারের যুদ্ধ শুরু হলে তার দায় বহন করতে প্রস্তুত নয় যুক্তরাষ্ট্র।
তবে বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। কূটনীতি, আঞ্চলিক সমঝোতা এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাই এখন পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার একমাত্র কার্যকর পথ। আর সেই পথ কতটা সফল হবে, সেটিই আগামী কয়েক সপ্তাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
সিভি/এইচএম

