ভারত দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর একটি হিসেবে আলোচনায় ছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা, শহরের চাপ, গ্রামীণ দরিদ্রতা, খাদ্য ও কর্মসংস্থানের সংকট—এসব বিষয় ঘিরে ভারতের নীতি ও রাজনীতি বহু দশক ধরে গড়ে উঠেছে। কিন্তু ৯ জুন ২০২৬ প্রকাশিত নতুন আলোচনায় ভারতের সামনে এক ভিন্ন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যে দেশকে এতদিন জনসংখ্যা বৃদ্ধির উদাহরণ হিসেবে দেখা হতো, সেই ভারতেই এখন সন্তান জন্মদানের হার প্রতিস্থাপন মাত্রার নিচে নেমে গেছে।
নতুন সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে এখন প্রতি নারীর গড় সন্তানসংখ্যা ১.৯। দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশের জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে সাধারণত এই হার ২.১ হওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ, ভারতের বর্তমান প্রজনন হার সেই মাত্রার নিচে চলে গেছে। এই পরিবর্তন শুধু একটি সংখ্যাগত ঘটনা নয়; এটি ভারতের সমাজ, অর্থনীতি, শ্রমবাজার, প্রবীণ জনগোষ্ঠী এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার জন্য একটি বড় বার্তা।
২০০০-এর দশকে ভারতের মোট প্রজনন হার ছিল প্রায় ৩.৩। সেই জায়গা থেকে ১.৯-এ নেমে আসা দেখায়, ভারতীয় সমাজে পরিবার, সন্তান, শিক্ষা, ব্যয়, নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। একসময় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ছিল ভারতের নীতিনির্ধারকদের বড় লক্ষ্য। এখন সেই একই দেশকে ভাবতে হচ্ছে, ভবিষ্যতে কম জন্মহার কীভাবে কর্মসংস্থান, উৎপাদন, কর আদায় এবং প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রভাব ফেলবে।
ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ইতিহাসের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নীতির সম্পর্ক গভীর। ১৯৭০-এর দশক থেকে ভারতীয় সরকারগুলো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নানা উদ্যোগ নেয়। তখন যুক্তি ছিল, মানুষ বেশি, সম্পদ কম। দরিদ্র ও উন্নয়নশীল একটি দেশের পক্ষে দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও কাজ দেওয়া কঠিন। এই ভাবনা থেকে পরিবার পরিকল্পনা, জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং কখনও বিতর্কিত পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছিল। ১৯৭০-এর দশকে জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণের ঘটনাও ভারতের জনসংখ্যা নীতির ইতিহাসে একটি অস্বস্তিকর অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।
তারপরও বহু বছর ধরে ভারতের জনসংখ্যা বাড়তেই থাকে। ২০১৯ সালেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জনসংখ্যা বিস্ফোরণ নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু ২০২২ সালের দিকে প্রথম পরিষ্কার ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ভারতের প্রজনন হার দ্রুত কমছে। তখন জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য জরিপে দেখা যায়, বিভিন্ন সম্প্রদায় ও অঞ্চলে সন্তান জন্মদানের হার নিচের দিকে নামছে। কিন্তু ২০২৩ সালে ভারত যখন চীনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ হয়ে ওঠে, তখন কমতে থাকা প্রজনন হার নিয়ে আলোচনাটি অনেকটাই চাপা পড়ে যায়।
এখন নতুন পরিসংখ্যান বলছে, বিষয়টি আর উপেক্ষা করার মতো নয়। জনসংখ্যা বিশাল হলেও জন্মহার কমে গেলে ভবিষ্যতের জনসংখ্যা কাঠামো বদলে যায়। আজ যে শিশু জন্মাচ্ছে না, আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছর পর সে আর কর্মক্ষম জনশক্তির অংশ হবে না। ফলে বর্তমানের কম জন্মহার ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে ঘাটতি তৈরি করতে পারে।
ভারতে প্রজনন হার কমার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ আছে। প্রথমত, নারীর শিক্ষার প্রসার। শিক্ষিত নারী সাধারণত বিয়ে, সন্তান, কাজ ও পরিবারের বিষয়ে তুলনামূলক বেশি সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির প্রাপ্যতা বেড়েছে। তৃতীয়ত, পরিবারে নারীর মতামতের গুরুত্ব আগের চেয়ে বেড়েছে। চতুর্থত, সন্তান লালন-পালনের ব্যয় অনেক বেড়েছে। শহরাঞ্চলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও দৈনন্দিন জীবনের খরচ এত বেশি যে অনেক পরিবার কম সন্তান নেওয়াকে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত মনে করছে।
এর সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ যুক্ত হয়েছে—শিশুমৃত্যুর হার কমেছে। আগে অনেক পরিবার বেশি সন্তান নিত, কারণ শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বেশি ছিল। এখন স্বাস্থ্যসেবা উন্নত হওয়ায় শিশু বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়েছে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ভারতে শিশুমৃত্যুর হার ২০১৯ সালে প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে ৩০ থেকে কমে ২০২৪ সালে ২৪ হয়েছে। শিশুমৃত্যু কমলে অনেক পরিবার বেশি সন্তান নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে না।
তবে ভারতের সব অঞ্চলে প্রজনন হার একইভাবে কমেনি। এখানে আঞ্চলিক বৈষম্য খুব স্পষ্ট। উত্তর ভারতের দরিদ্র ও কম শিক্ষিত রাজ্যগুলোতে সন্তান জন্মদানের হার এখনো তুলনামূলক বেশি। বিহারে প্রজনন হার ২.৯, যা দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। উত্তর প্রদেশে এই হার ২.৬। এসব এলাকায় শিক্ষা, নারীর সামাজিক অবস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিশুমৃত্যুর পরিস্থিতি এখনো উন্নত রাজ্যগুলোর তুলনায় পিছিয়ে।
অন্যদিকে রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রজনন হার মাত্র ১.২। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু ও কেরালায় এই হার ১.৩। এসব রাজ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নারীর অংশগ্রহণ এবং সামাজিক উন্নয়ন তুলনামূলকভাবে এগিয়ে। ফলে পরিবার ছোট রাখার প্রবণতা সেখানে অনেক আগে থেকেই দৃশ্যমান। অন্ধ্র প্রদেশে প্রজনন হার ১.৪। এই সংখ্যাগুলো দেখায়, ভারতের জনসংখ্যা পরিবর্তন একই গতিতে হচ্ছে না; বরং অঞ্চলভেদে এর গতি ও প্রভাব আলাদা।
এই আঞ্চলিক পার্থক্য ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নও তৈরি করতে পারে। যেসব রাজ্যে জন্মহার বেশি, সেসব রাজ্যের জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে দ্রুত বাড়বে। আর যেসব রাজ্যে জন্মহার কম, সেসব রাজ্যের জনসংখ্যার অংশ ভবিষ্যতে কমতে পারে। ভারতের মতো একটি বিশাল ফেডারেল ব্যবস্থায় এটি শুধু সামাজিক বিষয় নয়; অর্থ বণ্টন, সংসদীয় আসন, কেন্দ্রীয় বরাদ্দ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গেও যুক্ত।
ভারতে চলতি বছরের শুরুতে নতুন জনসংখ্যা গণনা শুরু হয়েছে, যা ২০২৭ সালে শেষ হওয়ার কথা। এর পর সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসের প্রশ্ন সামনে আসবে। এই প্রক্রিয়ায় জনসংখ্যার ভিত্তিতে রাজ্যভিত্তিক আসন নির্ধারণ করা হলে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে পারে। তাদের যুক্তি হলো, তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনায় তুলনামূলক ভালো করেছে, তাই কম জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কমে গেলে সেটি এক ধরনের শাস্তি হয়ে দাঁড়াবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও কম জন্মহার ভারতের জন্য জটিল বার্তা বহন করে। ২০০৫ সালে ভারত এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করে, যেখানে কর্মক্ষম বয়সী মানুষের সংখ্যা শিশু ও প্রবীণদের তুলনায় বেশি ছিল। এই পর্যায়কে অর্থনৈতিক সুযোগের সময় হিসেবে দেখা হয়। কারণ, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি হলে উৎপাদন বাড়ে, কর আদায় বাড়ে, সঞ্চয় বাড়ে এবং অর্থনীতি দ্রুত এগোনোর সুযোগ পায়। ভারতের এই সুযোগ ২০৫৫ সাল পর্যন্ত থাকার কথা বলা হয়েছে।
জাপান, সিঙ্গাপুর ও হংকং ১৯৬০-এর দশকে এই ধরনের সুবিধাজনক জনসংখ্যা কাঠামো কাজে লাগিয়ে দ্রুত উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হয়। চীন ১৯৮০-এর দশকে একই সুযোগের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংস্কার মিলিয়ে দ্রুত বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ভারতও তার তরুণ জনশক্তিকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশটি কি সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পেরেছে?
ভারতে এখনো কোটি কোটি মানুষ বেকার বা অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত। অনেক তরুণের শিক্ষা আছে, কিন্তু দক্ষতা নেই। অনেকের দক্ষতা আছে, কিন্তু মানসম্মত কাজ নেই। ফলে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়া সত্ত্বেও অর্থনীতির সম্ভাবনা পুরোপুরি বাস্তবে রূপ নেয়নি। এখন জন্মহার কমতে শুরু করলে ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাবে, কিন্তু প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়বে। তখন অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠী বাড়লে রাষ্ট্রকে স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন, সামাজিক সুরক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং নিরাপদ বার্ধক্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। ভারতের মতো দেশে, যেখানে অনেক মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন এবং সবার জন্য শক্তিশালী পেনশন ব্যবস্থা নেই, সেখানে প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। পরিবার ছোট হলে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখভালের সামাজিক কাঠামোও বদলে যায়। আগে যেখানে একাধিক সন্তান প্রবীণ বাবা-মায়ের দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারত, ভবিষ্যতে এক সন্তান বা নিঃসন্তান পরিবারে সেই দায়িত্ব আরও জটিল হতে পারে।
ধর্মীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রজনন হার নিয়ে ভারতে দীর্ঘদিন বিতর্ক আছে। ভারতের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে যুক্ত অনেক গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায় এনেছে। হিন্দুদের মধ্যে এমন আশঙ্কা ছড়ানো হয়েছে যে মুসলিমরা বেশি সন্তান নেওয়ায় একসময় তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যান সেই ভয়ের পক্ষে দাঁড়ায় না।
২০১১ সালের শেষ জনসংখ্যা গণনায় ভারতে মুসলিম জনগোষ্ঠী ছিল ১৩ শতাংশ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মুসলিমদের প্রজনন হার অন্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর তুলনায় দ্রুত কমেছে। ১৯৯২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মুসলিমদের প্রজনন হার ৪.৪১ থেকে ২.৩৬-এ নেমেছে। একই সময়ে হিন্দুদের হার ৩.৩ থেকে ১.৯৪-এ কমেছে। অর্থাৎ প্রজনন হার কমার প্রবণতা শুধু একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভারতীয় সমাজের বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ।
এই বাস্তবতার মধ্যেও কিছু সংগঠন হিন্দু পরিবারগুলোকে বেশি সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভাগবত হিন্দু দম্পতিদের অন্তত তিন থেকে চার সন্তান নেওয়ার কথা বলেন, যাতে দীর্ঘমেয়াদে সমাজের সংখ্যাগত অবস্থান দুর্বল না হয়। কিন্তু জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার পরিকল্পনা ও সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। শুধু রাজনৈতিক আহ্বান দিয়ে জন্মহার বাড়ানো যায় না।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এখনো কম প্রজনন হার মোকাবিলায় কোনো সর্বভারতীয় নীতি ঘোষণা করেনি। তবে কিছু রাজ্য নিজ নিজভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে। গত মাসে অন্ধ্র প্রদেশ ঘোষণা করেছে, তৃতীয় সন্তান জন্মালে পরিবারকে ৩০ হাজার রুপি এবং চতুর্থ সন্তান জন্মালে ৪০ হাজার রুপি দেওয়া হবে। অথচ অন্ধ্র প্রদেশের নিজস্ব প্রজনন হার ১.৪। অর্থাৎ রাজ্যটি বুঝতে পারছে, ভবিষ্যতে জনসংখ্যা কাঠামো বদলে গেলে শ্রম, রাজস্ব ও সামাজিক ভারসাম্যে প্রভাব পড়তে পারে।
গোয়া, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানার মতো রাজ্যগুলো প্রথমবার বাবা-মা হতে আগ্রহী দম্পতিদের জন্য সরকারি অর্থায়নে সহায়ক প্রজনন চিকিৎসা কেন্দ্র চালু করেছে। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো, যারা সন্তান নিতে চান কিন্তু চিকিৎসাগত কারণে পারছেন না, তাদের সহায়তা করা। তবে প্রশ্ন হলো, শুধু অর্থ সহায়তা বা চিকিৎসা কেন্দ্র দিয়ে কি জন্মহার বাড়ানো সম্ভব? অনেক ক্ষেত্রে পরিবার সন্তান কম নেয় কারণ জীবনের ব্যয়, কাজের চাপ, বাসস্থানের সংকট, শিশুর শিক্ষার খরচ এবং নারীর কর্মজীবন—সব মিলিয়ে সন্তান নেওয়া কঠিন সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠে।
ভারতের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো ভারসাম্যপূর্ণ জননীতি তৈরি করা। একদিকে মানুষের ব্যক্তিগত সন্তান নেওয়ার অধিকারকে সম্মান করতে হবে। অন্যদিকে কম জন্মহার ও বার্ধক্যজনিত ভবিষ্যৎ চাপের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। সরকার চাইলে পরিবারবান্ধব কর্মনীতি, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন সহায়তা, সাশ্রয়ী শিশুসেবা, মানসম্মত সরকারি শিক্ষা, নারীর কর্মসংস্থান এবং প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে পারে।
এশিয়ার অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ভারতের জন্য সতর্কবার্তা। চীনের প্রজনন হার ১.০, যা প্রতিস্থাপন মাত্রা ২.১-এর অনেক নিচে। তাইওয়ানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের মোট প্রজনন হার প্রায় ০.৮৬ এবং আরও কমতে পারে। জাতিসংঘের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ায় এই হার প্রায় ০.৭৫, যা বিশ্বে সবচেয়ে কম। এসব দেশ এখন শ্রমঘাটতি, বৃদ্ধ জনগোষ্ঠী, কম জন্মহার এবং সামাজিক সুরক্ষার বড় চাপের মুখে রয়েছে।
ভারত এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছেনি, কিন্তু সতর্কবার্তা স্পষ্ট। আজকের ১.৯ প্রজনন হার আগামী দিনের কর্মক্ষম জনশক্তি, প্রবীণ সুরক্ষা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই বিষয়টিকে শুধু সন্তান কম জন্মানোর ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ভারতের উন্নয়ন মডেল, সামাজিক পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য এক গভীর প্রশ্ন।
ভারতের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে তাকে তরুণ জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দ্রুত করতে হবে। অন্যদিকে ভবিষ্যতের কম জন্মহার ও বাড়তে থাকা প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। সময় থাকতে এই প্রস্তুতি না নিলে আজকের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন আগামী দিনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
সব মিলিয়ে ভারতের প্রজনন হার ১.৯-এ নেমে আসা একটি ঐতিহাসিক বাঁক। জনসংখ্যা বিস্ফোরণের ভয় থেকে ভারত এখন ধীরে ধীরে জনসংখ্যা ভারসাম্যের নতুন চিন্তায় প্রবেশ করছে। প্রশ্ন এখন আর শুধু কত মানুষ আছে তা নয়; প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে কত মানুষ কাজ করবে, কত মানুষ বার্ধক্যে সহায়তা চাইবে, আর রাষ্ট্র সেই পরিবর্তনের জন্য কতটা প্রস্তুত।
সিভি/এইচএম

