ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকটকে নতুন করে সামনে আনেনি, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্পর্কের ভেতরের টানাপোড়েনও স্পষ্ট করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দুই নেতাকে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ মনে করা হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, তাদের স্বার্থ সব সময় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। বরং ইরান, লেবানন, গাজা এবং আঞ্চলিক যুদ্ধনীতির প্রশ্নে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের হিসাব এখন অনেকটাই আলাদা পথে হাঁটছে।
ট্রাম্প কি সত্যিই নেতানিয়াহুর ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করতে পারেন? আর যদি পারেন, তাহলে তিনি কি সেই ক্ষমতা ব্যবহার করতে প্রস্তুত? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইসরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে যত বেশি বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, কূটনৈতিক ও আর্থিক সহায়তার ওপর তার নির্ভরতা ততই বাড়ছে। কিন্তু সেই নির্ভরতা থাকা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু মাঝে মাঝে এমন পদক্ষেপ নিচ্ছেন, যা ওয়াশিংটনের প্রকাশ্য অবস্থানের সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করছে।
দুই নেতার সম্পর্ক একসময় অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরা হতো। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইসরায়েলের জন্য হোয়াইট হাউসে থাকা সবচেয়ে বড় বন্ধুদের একজন হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ট্রাম্পও প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর প্রশংসা করেছেন। ২০২৫ সালে ইসরায়েলে এক অনুষ্ঠানে তিনি নেতানিয়াহুকে কঠিন কিন্তু কার্যকর নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই প্রকাশ্য সৌহার্দ্যের জায়গায় এসেছে বিরক্তি, অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক চাপের ভাষা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে এক ফোনালাপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অভিযোগ ছিল, ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উদ্যোগকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। এই উত্তেজনা আরও স্পষ্ট হয় যখন ৭ জুন বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলার পর রবিবার ইরান উত্তর ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। অথচ এর কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে না।
এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল দুই মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর ইরানের প্রথম সরাসরি হামলা। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা আলোচনার ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়ে। যদিও পরবর্তী সময়ে ইরান ও ইসরায়েল একে অপরের ওপর হামলা বন্ধ করে, তবু মূল প্রশ্ন থেকে যায়: যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া নেতানিয়াহু কি ইরান ও লেবাননকে ঘিরে তার সামরিক কৌশল চালিয়ে যেতে পারবেন?
ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি হলে নেতানিয়াহুর তা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ওয়াশিংটনের হাতে। এই বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত রাগের প্রকাশ নয়; এর ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক কর্তৃত্বের দাবিও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। কারণ নেতানিয়াহু নিজের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জোট সরকার, আসন্ন নির্বাচন এবং ব্যক্তিগত আইনি ঝুঁকির হিসাব থেকে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতবিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে দুই নেতার ভিন্ন রাজনৈতিক প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রে ইরান যুদ্ধ জনপ্রিয় নয়। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন ট্রাম্পের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। ফলে তিনি দ্রুত একটি কূটনৈতিক সমাধান চান। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর জন্য যুদ্ধের ধারাবাহিকতা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সুবিধা এনে দিতে পারে। ইসরায়েলের ভেতরে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের প্রতি ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানে হামলার পক্ষে জনসমর্থন প্রায় ৯৩ শতাংশ।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যৌথভাবে ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরুর পর থেকেই দুই পক্ষের লক্ষ্য আলাদা হতে শুরু করে। ইসরায়েলের নেতৃত্ব মনে করেছিল, এই সংঘাত দ্রুত সাফল্য আনতে পারে। তাদের ধারণা ছিল, ইরানের সরকার দুর্বল হতে পারে, এমনকি ক্ষমতা পরিবর্তনের পথও খুলে যেতে পারে। পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বড় ধাক্কা খাবে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, সেই হিসাব বাস্তবে পূরণ হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, ইসরায়েল যে দ্রুত বিজয়ের ধারণা নিয়ে এগিয়েছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধটি সংক্ষিপ্ত ও সফল হবে বলে যে অনুমান করা হয়েছিল, বাস্তবে তা ঘটেনি। ইরানের সরকার টিকে গেছে, তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি, আর সংঘাত উল্টো আঞ্চলিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে আরও অস্থির করেছে।
এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও ট্রাম্পের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ইরান যখন কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লাগে। শান্তিকালে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং জ্বালানির চাপ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
এই জায়গায় ট্রাম্পের স্বার্থ স্পষ্ট। তিনি দীর্ঘায়িত যুদ্ধ চান না, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। তাই ইরানের সঙ্গে দ্রুত সমঝোতা তার জন্য কৌশলগতভাবে লাভজনক। কিন্তু নেতানিয়াহুর জন্য একই সমঝোতা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ ইরানকে ঘিরে কঠোর সামরিক অবস্থান তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়।
ইসরায়েলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুললে প্রথমেই সামরিক সহায়তার বিষয়টি সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ থেকে ২০২৮ পর্যন্ত ১০ বছর মেয়াদি সামরিক সহায়তা চুক্তির আওতায় ইসরায়েলকে বছরে অন্তত ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেয়। এর মধ্যে ৩.৩ বিলিয়ন ডলার আসে বিদেশি সামরিক অর্থায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে এবং ৫০০ মিলিয়ন ডলার যায় যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতে। আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলে প্রবেশ করা অস্ত্রের ৪২ শতাংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, ওয়াশিংটনের হাতে বাস্তব চাপ প্রয়োগের উপায় রয়েছে। অস্ত্র, অর্থ, কূটনৈতিক সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাজনৈতিক ঢাল—এসব ক্ষেত্রেই ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। গাজায় যুদ্ধ, পশ্চিম তীর দখলের চেষ্টা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে ইসরায়েল যখন আরও বেশি আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা তার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলি সাংবাদিক ও লেখক গিদিয়ন লেভির মতে, বর্তমান বাস্তবতায় ইসরায়েলের পক্ষে ট্রাম্পকে সরাসরি অস্বীকার করা সহজ নয়। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসরায়েলের যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা এখন নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরানের বিরুদ্ধে বড় সামরিক সংঘাত চালাতে গেলে ইসরায়েলের যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা প্রয়োজন। তাই ওয়াশিংটন যদি সত্যিকারের চাপ দেয়, নেতানিয়াহুর পক্ষে তা উপেক্ষা করা কঠিন।
তবুও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহু মাঝে মাঝে ট্রাম্পের সীমা পরীক্ষা করছেন। এর কারণ খুঁজতে হলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিকে তাকাতে হয়। অক্টোবরের শেষের আগে ইসরায়েলে নির্বাচন হওয়ার কথা। এমন পরিস্থিতিতে ইরানবিরোধী সামরিক অবস্থান নেতানিয়াহুর জন্য জনসমর্থন ধরে রাখার হাতিয়ার হতে পারে। ইসরায়েলি রাজনীতিতে যুদ্ধ অনেক সময় কূটনৈতিক সমঝোতার চেয়ে দ্রুত জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নেতানিয়াহুর জোট সরকার। তার সরকার টিকে আছে কট্টর ডানপন্থী শক্তির সমর্থনের ওপর। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের মতো নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইসরায়েলের নিজস্ব সীমারেখা টানার কথা বলছেন। তাদের বক্তব্য হলো, লেবানন বা ইরান থেকে হামলা হলে ইসরায়েলকে অবশ্যই পাল্টা জবাব দিতে হবে। এই চাপ নেতানিয়াহুকে আরও কঠোর অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে।
ইরান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় ইসরায়েল সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। আলোচনা হচ্ছে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে, পরোক্ষভাবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তিতে ইরানের সরকার অক্ষত থাকতে পারে এবং সীমিত হলেও তার পারমাণবিক কর্মসূচি চালু থাকতে পারে। ইসরায়েলের দৃষ্টিতে এটি বড় কৌশলগত উদ্বেগ। কারণ নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই ঠেকাতে হবে।
তেহরানের আরেকটি দাবি ইসরায়েলের জন্য আরও অস্বস্তিকর হতে পারে। বলা হচ্ছে, সম্ভাব্য চুক্তিতে এমন শর্ত থাকতে পারে যাতে ইসরায়েল ভবিষ্যতে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে না পারে। যদি এমন হয়, তাহলে বৈরুতে ইসরায়েলি হামলা ইরানি প্রতিক্রিয়া উসকে দিতে পারে, অথচ সেই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন নিশ্চিত নাও থাকতে পারে। নেতানিয়াহুর জন্য এটি সামরিক ও রাজনৈতিক দুই দিক থেকেই কঠিন পরিস্থিতি।
নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত আইনি অবস্থাও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তার দুর্নীতির বিচার ষষ্ঠ বছরে গড়িয়েছে। পাশাপাশি গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তার ওপর ঝুলছে। ক্ষমতা হারালে তিনি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক আইনি চাপে আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়তে পারেন। তাই বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, ক্ষমতায় থাকা এখন নেতানিয়াহুর প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য, আর সামরিক সিদ্ধান্তও সেই লক্ষ্য থেকে পুরোপুরি আলাদা নয়।
তবে এই টানাপোড়েনকে কতটা বাস্তব বলা যায়, সেটিও বিতর্কের বিষয়। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কের ভেতরে প্রকাশ্য অস্বস্তি থাকলেও তা এখনো কাঠামোগত পরিবর্তনে রূপ নেয়নি। কারণ ট্রাম্পের কঠোর কথার পরও যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়া বন্ধ করেনি, আন্তর্জাতিক আদালতগুলোতে চাপ কমায়নি এবং অস্ত্র সরবরাহে বড় বাধা দেয়নি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক ফিলিস বেনিসের মতে, কথা তখনই অর্থবহ হয় যখন তা বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়। তার মূল্যায়ন হলো, ট্রাম্প সতর্কবার্তা দিলেও সেই সতর্কবার্তার সঙ্গে এখনো কার্যকর চাপ যুক্ত হয়নি। তিনি আগের মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, গাজা যুদ্ধের সময়ও প্রকাশ্যে সংযমের আহ্বান জানানো হয়েছিল, কিন্তু একই সঙ্গে অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা অব্যাহত ছিল। অর্থাৎ কথার ভাষা বদলালেও নীতির কাঠামো বদলায়নি।
এই জায়গাতেই ট্রাম্পের দ্বিধা স্পষ্ট। একদিকে তিনি দেখাতে চান, মধ্যপ্রাচ্যের বড় সিদ্ধান্তে শেষ কথা তার। অন্যদিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোকেও উপেক্ষা করতে পারেন না। ফলে নেতানিয়াহুকে চাপ দেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও সেই ক্ষমতা কতদূর ব্যবহার করবেন, সেটিই আসল প্রশ্ন।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, ট্রাম্পের হাতে নেতানিয়াহুর ওপর চাপ প্রয়োগের যথেষ্ট উপায় আছে। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা, অস্ত্র সরবরাহ, কূটনৈতিক সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা থাকা আর তা বাস্তবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। ট্রাম্প যদি শুধু কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন কিন্তু সহায়তা বা কূটনৈতিক সুরক্ষায় পরিবর্তন না আনেন, তাহলে নেতানিয়াহু সীমা পরীক্ষা চালিয়ে যেতে পারেন।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুও সম্পূর্ণ স্বাধীন নন। তিনি জানেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চালানো কঠিন। কিন্তু নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, জোট সরকারের চাপ, নির্বাচন এবং আইনি ঝুঁকি তাকে সংঘাতমুখী অবস্থান ধরে রাখতে উৎসাহিত করছে। ফলে দুই নেতার সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা নয়, বরং স্বার্থের সংঘর্ষই মূল বাস্তবতা।
এই সংকট তাই শুধু ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত সম্পর্কের গল্প নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের সীমা, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক জোটনীতির ভবিষ্যৎ এবং যুদ্ধ বনাম কূটনীতির বড় প্রশ্নকে সামনে এনেছে। ট্রাম্প যদি সত্যিই ইরানের সঙ্গে সমঝোতা চান, তাহলে তাকে প্রমাণ করতে হবে যে তার কথার পেছনে নীতিগত পদক্ষেপ আছে। আর নেতানিয়াহু যদি যুক্তরাষ্ট্রের সীমা অতিক্রম করতে থাকেন, তাহলে সামনে আরও বড় কূটনৈতিক সংঘাত দেখা দিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নির্ভর করবে এক জায়গায়: ওয়াশিংটন কি শুধু অসন্তোষ প্রকাশ করবে, নাকি বাস্তব চাপ প্রয়োগ করবে? কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতায় কথার চেয়ে সিদ্ধান্তের মূল্য অনেক বেশি।
সিভি/এইচএম

