চীনের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত সামনে আসে রপ্তানি, উৎপাদনশক্তি, কারখানাভিত্তিক প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক বাজারে তার বিস্তৃত প্রভাব। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, আলোচনার কেন্দ্রে আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে: চীন যে বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত তৈরি করছে, সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে?
চীনের রপ্তানি ইঞ্জিন এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। ২০২৫ সাল শেষে দেশটির পণ্য বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ১.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পণ্য বাণিজ্য উদ্বৃত্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংখ্যাটি শুধু চীনের উৎপাদনক্ষমতার পরিচয় দেয় না; একই সঙ্গে দেখায় যে বৈশ্বিক শিল্প প্রতিযোগিতায় চীন এখনো অত্যন্ত শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
তবে এই ১.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অঙ্কটি যতটা বড় দেখায়, বাস্তব অর্থনৈতিক প্রবাহ বোঝার জন্য সেটি একা যথেষ্ট নয়। কারণ শুল্ক পরিসংখ্যানে পণ্য বাণিজ্যের হিসাব দেখা গেলেও দেশের বাসিন্দা ও বিদেশি পক্ষের সব ধরনের লেনদেন বুঝতে হলে লেনদেনের ভারসাম্যের দিকে তাকাতে হয়। সেই হিসাবে চীনের উদ্বৃত্ত কিছুটা কম, প্রায় ১.১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ, শিরোনামে যে বিশাল অঙ্ক দেখা যায়, বাস্তব অর্থনৈতিক হিসাবে সেটি কিছুটা সংকুচিত হয়।
আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, চীনের হাতে পুনর্বিনিয়োগের জন্য থাকা অর্থ আরও কম। পণ্য বাণিজ্যে দেশটির উদ্বৃত্ত খুব বড় হলেও সেবা খাতে চীনের ঘাটতি উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালে সেবা খাতে ঘাটতি ছিল ২৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ১৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছিল বিদেশে পর্যটন ব্যয়। অর্থাৎ, চীনা নাগরিক ও ব্যবসার একটি বড় ব্যয় দেশের বাইরে সেবা গ্রহণের মাধ্যমে বেরিয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রাথমিক আয় ঘাটতি, যা মূলত চীনে বিনিয়োগকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা ও লভ্যাংশ পরিশোধের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই সব হিসাব মিলিয়ে ২০২৫ সালে চীনের চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৭৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটিও রেকর্ড পর্যায়ের বড় অঙ্ক, কিন্তু পণ্য বাণিজ্যের ১.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের তুলনায় অনেক ছোট। এখানেই বোঝা যায়, কোনো দেশের প্রকৃত বৈদেশিক আর্থিক অবস্থান বুঝতে শুধু রপ্তানি ও আমদানির ব্যবধান দেখলেই চলে না। সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ আয়, বিদেশি মুনাফা প্রত্যাবাসন—সবকিছু একসঙ্গে বিচার করতে হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটেছে এই উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যবহারের ধরনে। দুই দশক আগেও চিত্র ছিল অনেক সরল। তখন চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিদেশি মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ করে উদ্বৃত্তের বড় অংশ শোষণ করত। সেই অর্থ পরে সরকারি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে জমা হতো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণপত্রসহ বিভিন্ন সার্বভৌম সম্পদে বিনিয়োগ করা হতো। ২০০২–১১ সময়ে চীনের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার করে বেড়েছিল। তখন বাণিজ্য উদ্বৃত্ত মানেই ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ বৃদ্ধি—এমন ধারণা অনেকটাই বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যেত।
কিন্তু ২০১২ সালের দিকে নীতিগত পরিবর্তন এই চিত্র বদলে দেয়। বাধ্যতামূলক বিদেশি মুদ্রা নিষ্পত্তি ও বিক্রয় ব্যবস্থা শেষ হওয়ার পর চীনা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকেরা বিদেশি আয় ধরে রাখার বেশি স্বাধীনতা পায়। আগে তাদের বিদেশি মুদ্রা আয়ের বড় অংশ নির্ধারিত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কাছে বিক্রি করতে হতো। সেই বাধ্যবাধকতা কমে যাওয়ায় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ও রিজার্ভ বৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক দুর্বল হতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে বড় রিজার্ভ থাকলেও বেসরকারি খাত ধীরে ধীরে বিদেশি মুদ্রা ব্যবস্থাপনার বড় অংশ নিতে শুরু করে।
২০১৫ সালের দিকে আরেকটি পরিবর্তন দেখা যায়। তখন রেনমিনবির দর কমতে পারে—এমন প্রত্যাশা বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে চীনা কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীরা নিজেদের বিদেশি মুদ্রা অবস্থান বদলাতে থাকে। অনেক প্রতিষ্ঠান ডলার আমানত বাড়ায়, বিদেশি মুদ্রায় নেওয়া ঋণ পরিশোধ করে এবং অর্থের একটি অংশ দেশের বাইরে সরিয়ে রাখে। সহজভাবে বললে, উদ্বৃত্ত অর্থ আগের মতো দেশে ফিরিয়ে স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর না করে বিদেশি মুদ্রা সম্পদ হিসেবে ধরে রাখার প্রবণতা বাড়ে।
তবে মহামারির পর পরিস্থিতি আবার নতুন দিকে মোড় নেয়। এখন বেসরকারি খাত উদ্বৃত্ত অর্থ বিদেশে পাঠালেও সেটি আগের মতো ভয়ের কারণে নয়। রেনমিনবি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হয়েছে এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে কিছু সময়ে শক্তিও দেখিয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণ এখন বেশি লাভের সন্ধানভিত্তিক। তারা শেয়ার, ঋণপত্র এবং অন্যান্য আর্থিক সম্পদের মাধ্যমে বেশি আয়ের সুযোগ খুঁজছে। অর্থাৎ, চীনের উদ্বৃত্ত অর্থ এখন শুধু নিরাপত্তার জন্য বাইরে রাখা হচ্ছে না; বরং বাজারভিত্তিক বিনিয়োগের মাধ্যমে বেশি মুনাফার সম্ভাবনা খোঁজা হচ্ছে।
লেনদেনের ভারসাম্যের মৌলিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশের আন্তর্জাতিক লেনদেনের মোট হিসাব শেষ পর্যন্ত সমান হতে হয়। যদি চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ হিসেবে জমা না হয়, তবে সেটি বিদেশি সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যমে বা বিদেশি দায় কমানোর মাধ্যমে অন্য কোথাও প্রতিফলিত হবে। ২০২৫ সালে চীনের রিজার্ভবহির্ভূত আর্থিক হিসাবে ঘাটতি ছিল প্রায় ৮২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই ঘাটতি মোটামুটি চলতি হিসাব উদ্বৃত্তের বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। অর্থাৎ, চীনের উপার্জিত উদ্বৃত্তের বড় অংশ এখন সরকারি রিজার্ভে না গিয়ে বেসরকারি আর্থিক প্রবাহে ধরা পড়ছে।
এই প্রবাহের সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে শেয়ার ও ঋণপত্রভিত্তিক বিনিয়োগ থেকে। যোগ্য দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী কর্মসূচি এবং মূল ভূখণ্ড ও হংকংয়ের শেয়ারবাজার সংযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগের পথ আরও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৫ সালে এই পথে নিট বহিঃপ্রবাহ দাঁড়ায় ৪২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে মূল ভূখণ্ডের বিনিয়োগকারীরা বিদেশি শেয়ার সম্পদে প্রায় ২০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বিদেশি ঋণপত্র সম্পদে ১৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যোগ করেন।
হংকং এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। চীনের ভেতরেও কিছু শেয়ারভিত্তিক বিনিয়োগ হচ্ছে, কিন্তু বিদেশমুখী শেয়ার প্রবাহের বড় অংশ হংকংয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে দক্ষিণমুখী শেয়ারবাজার সংযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাহ দাঁড়ায় হংকং ডলারে ১.৪ ট্রিলিয়ন, যা ১৭৮.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। আগের বছরের তুলনায় এটি ৭৪ শতাংশ বেশি। এই অঙ্ক চীনের লেনদেনের ভারসাম্যে দেখা শেয়ারভিত্তিক বহিঃপ্রবাহের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়।
এখানে হংকংয়ের গুরুত্ব শুধু একটি বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে নয়, বরং একটি আর্থিক সেতু হিসেবে। গভীর শেয়ারবাজার, উন্নত আর্থিক অবকাঠামো এবং মূল ভূখণ্ডের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকার কারণে হংকং চীনা উদ্বৃত্ত অর্থের বড় অংশ গ্রহণের উপযুক্ত অবস্থানে আছে। এতে হংকংয়ের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা আরও শক্তিশালী হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশে রেনমিনবি বাজার গড়ে তোলা এবং সীমান্তপারের আর্থিক সংযোগ গভীর করার চীনা কৌশলও এগিয়ে যাচ্ছে।
শুধু শেয়ার বা ঋণপত্র নয়, চীনা কোম্পানিগুলোর বিদেশে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগও বাড়ছে। ২০২৫ সালে বিদেশে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ ১৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পায়। যদিও এই খাতে নিট বহিঃপ্রবাহ ছিল ৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, তবু এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু আর্থিক সম্পদ কিনছে না; তারা বিদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বাজার দখল এবং সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করার পথও খুঁজছে।
এই পরিবর্তনের অর্থনৈতিক তাৎপর্য গভীর। এক সময় চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত মূলত রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত রিজার্ভ ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হতো। এখন সেই অর্থের বড় অংশ বাজারের মাধ্যমে চলাচল করছে। এতে বোঝা যায়, চীনের আর্থিক ব্যবস্থা আগের তুলনায় পরিণত হচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী, ব্যাংকিং প্রবাহ এবং হংকংয়ের পুঁজিবাজার এখন চীনের বৈদেশিক উদ্বৃত্ত ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিচ্ছে।
তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে ঝুঁকিও আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক স্থিতিশীলভাবে পরিচালিত হয়। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবাহ বাজারের পরিবেশের ওপর দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। সুদের ব্যবধান, মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ে প্রত্যাশা, বৈশ্বিক ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা এবং শেয়ারবাজারের ওঠানামা—এসব কারণে অর্থের প্রবাহ দ্রুত বাড়তে বা কমতে পারে। তাই চীনের উদ্বৃত্ত অর্থ এখন আগের তুলনায় বাজারের মনোভাবের সঙ্গে বেশি সংযুক্ত।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি আর আগের মতো নেই। আগে জানতে চাওয়া হতো—চীনের উদ্বৃত্ত কি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ হবে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সম্পদে যাবে, নাকি ব্যাংক আমানত হিসেবে থাকবে? এখন উত্তর অনেক পরিষ্কার। চীনের উদ্বৃত্ত অর্থ ক্রমেই শেয়ার ও ঋণপত্রভিত্তিক বিনিয়োগ, সীমান্তপারের ব্যাংকিং প্রবাহ এবং হংকংয়ের পুঁজিবাজারের মাধ্যমে পুনর্বিনিয়োগ হচ্ছে।
এই প্রবণতা একদিকে চীনের শিল্প শক্তি ও রপ্তানি সক্ষমতার ধারাবাহিকতা দেখায়, অন্যদিকে দেখায় যে চীনের অর্থনীতি আর শুধু রাষ্ট্রনির্ভর সঞ্চয় ও রিজার্ভ ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। বাজার, বিনিয়োগকারী এবং আর্থিক সংযোগ এখন চীনের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আরও বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে চীনের ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত শুধু একটি বাণিজ্যিক সংখ্যা নয়; এটি বৈশ্বিক পুঁজি প্রবাহের নতুন মানচিত্রও তৈরি করছে।

