ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক এক ব্যঙ্গাত্মক ছাত্র আন্দোলন এমন এক বিতর্ক তৈরি করেছে, যা শুধু একটি অনলাইন রসিকতা বা বিদ্রূপের ঘটনা নয়। এটি দেখিয়েছে, ক্ষমতা যখন নিজের সমালোচনা সহ্য করতে পারে না, তখন সবচেয়ে নিরীহ ব্যঙ্গও তার কাছে বিপদের সংকেত হয়ে ওঠে। “তেলাপোকা জনতা পার্টি” নামে এক ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগকে ঘিরে ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা দেশটির তরুণ প্রজন্ম, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং শাসকের আত্মবিশ্বাস—সবকিছুর ওপর নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
ঘটনার শুরু হয় ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এক মন্তব্য থেকে। তিনি বেকার তরুণদের একটি অংশ, যারা সাংবাদিকতা বা আন্দোলনের দিকে ঝুঁকছে, তাদের সঙ্গে তেলাপোকা ও পরজীবীর তুলনা করেন। মন্তব্যটি অনেকের কাছে অপমানজনক মনে হয়। এরপর তরুণদের একটি অংশ সেই অপমানকেই ব্যঙ্গের অস্ত্রে পরিণত করে। তারা “তেলাপোকা জনতা পার্টি” নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন উপস্থিতি তৈরি করে। উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ব্যর্থতা, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং তরুণদের অবহেলার বিরুদ্ধে কৌতুকের ভাষায় প্রতিবাদ জানানো।
প্রথমে এটি ছিল একটি রসিকতা। কিন্তু অল্প সময়েই তা ছড়িয়ে পড়ে। ইনস্টাগ্রাম ও এক্স, আগে যার নাম ছিল টুইটার, সেখানে এই ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ লাখো মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি, সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান ও ফ্রান্স টোয়েন্টি ফোর বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ফলে যে ব্যঙ্গ প্রথমে তরুণদের অনলাইন প্রতিবাদের ভাষা ছিল, সেটি দ্রুত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।
এখানেই ভারতের ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্যঙ্গের জবাব ব্যঙ্গ দিয়ে, যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে বা তরুণদের অসন্তোষের কারণ বুঝে নেওয়ার বদলে মোদি সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও ভারতের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। এই প্রতিক্রিয়া অনেকের কাছে অস্বাভাবিকভাবে কঠোর মনে হয়েছে। কারণ একটি ছাত্রনেতৃত্বাধীন ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত করা যেন তেলাপোকা মারতে কামান ব্যবহারের মতোই অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া।
এরপর একাধিক পদক্ষেপ দেখা যায়। দেশটির ভেতরে ওই ব্যঙ্গাত্মক পাতায় প্রবেশের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তাদের ওয়েবসাইট সরিয়ে দেওয়া হয়। সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে উদ্যোগটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের বিরুদ্ধে বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ তোলা হয়। সুপ্রিম কোর্টে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদনও করা হয়। প্রশ্ন হলো, একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক উদ্যোগকে এত শক্ত হাতে দমন করার প্রয়োজন কেন অনুভব করল রাষ্ট্র?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ভারতের তরুণ সমাজের বর্তমান বাস্তবতা বুঝতে হবে। অনেক তরুণ এমন এক চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে, যেখানে সুযোগ সীমিত, প্রতিযোগিতা ভয়াবহ এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র গরম, দূষিত বাতাস, জলবায়ুগত চাপ, শিক্ষাব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং বারবার আত্মত্যাগের ভাষণে ক্লান্ত হয়ে পড়া একটি প্রজন্ম। তারা শুনছে ধৈর্য ধরতে, কম খরচ করতে, বেশি কাজ করতে, কিন্তু তাদের সামনে স্থিতিশীল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা কম।
শিক্ষাক্ষেত্রের সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারিও ক্ষোভ বাড়িয়েছে। গত মাসেই স্নাতক পর্যায়ের চিকিৎসা শিক্ষায় প্রবেশের জাতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসে। একই সময়ে স্কুল শিক্ষার্থীদের নম্বর মূল্যায়ন নিয়েও আলাদা বিতর্ক তৈরি হয়। যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশা প্রকাশ করেছে, তাদের কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ভাষ্যে “পাকিস্তানি” বলে আখ্যা পেয়েছে। নিজের দেশের শিক্ষার্থীদের উদ্বেগকে যদি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হয়, তবে সেটি শুধু রাজনৈতিক ভাষার সমস্যা নয়; এটি নাগরিক সম্পর্কের সংকটও।
পরীক্ষা কেলেঙ্কারির কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এত গভীর মানবিক সংকটের পরও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে সান্ত্বনামূলক বক্তব্য না আসার অভিযোগ উঠেছে। এই নীরবতা সমালোচকদের কাছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তারা মনে করেন, দেশের ভেতরের কষ্টের চেয়ে বিদেশের ঘটনায় শোক প্রকাশে মোদি বেশি তৎপর। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, তেলেঙ্গানায় এক দিনে তাপপ্রবাহে ৬৭ জনের মৃত্যুর বিষয়ে তিনি নীরব থাকলেও চীনের শানসি প্রদেশে খনি দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় শোক জানিয়েছেন।
এই সমালোচনার কেন্দ্রে আছে নেতৃত্বের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন। একজন প্রধানমন্ত্রী যখন দেশের তরুণদের হতাশা, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, তাপপ্রবাহে মৃত্যু বা বেকারত্বের মতো বিষয়ে যথেষ্ট সহানুভূতি দেখান না, অথচ নাগরিকদের কাছ থেকে ক্রমাগত সংযম ও ত্যাগ দাবি করেন, তখন অসন্তোষ জমাট বাঁধে। ব্যঙ্গ তখন শুধু হাসির মাধ্যম থাকে না; সেটি ক্ষোভের ভাষা হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি মোদির পক্ষ থেকে জনগণকে বাড়ি থেকে কাজ করা, অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যয় না করা, বিদেশ ভ্রমণ এড়িয়ে চলা, রান্নার তেল কম ব্যবহার করা, সোনা না কেনা, বেশি কাজ করা, কম খরচ করা এবং ধৈর্য ধরার আহ্বান জানানোর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সমালোচকদের মতে, এমন আহ্বান তখনই বেশি গ্রহণযোগ্য হতো, যদি শাসক নিজেও একই ধরনের সংযমের উদাহরণ দিতেন। কিন্তু নাগরিকদের মিতব্যয়িতার ভাষণ দেওয়ার পর ইউরোপ সফরে যাওয়া রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর বার্তা দেয়।
এই ইউরোপ সফরও বিতর্কের বাইরে থাকেনি। নরওয়েতে হেলে লিং স্বেনসেন নামের এক সাংবাদিক মোদিকে প্রশ্ন করেন, তিনি কেন বিশ্বের সবচেয়ে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের প্রশ্ন নেন না। মোদি সেই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সামনে এগিয়ে যান। ভারতের ভেতরে বহু মানুষের কাছে দৃশ্যটি ছিল অস্বাভাবিক। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় সাংবাদিকতার বড় অংশ এমন পরিবেশে কাজ করছে, যেখানে সরাসরি প্রশ্ন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। তাই নরওয়ের এক সাংবাদিকের সরাসরি প্রশ্ন যেন ভারতীয় বাস্তবতার সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নরওয়ে বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে প্রথম স্থানে, আর ভারত ১৫৭তম অবস্থানে। এই পরিসংখ্যান নিজেই একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। এটি শুধু সাংবাদিকতার অবস্থান নয়, ক্ষমতার জবাবদিহির অবস্থাও বোঝায়। যে দেশে সাংবাদিকের প্রশ্ন শাসকের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে, সেখানে ব্যঙ্গাত্মক ছাত্র আন্দোলনের ওপরও কঠোর প্রতিক্রিয়া আসা অপ্রত্যাশিত নয়।
নরওয়ের ঘটনাটির পর অসলোতে ভারতীয় দূতাবাস সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দেয়। সেখানে কূটনীতিক সিবি জর্জ ১৩ মিনিট ধরে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তার বক্তব্যে ১৪০ কোটি মানুষ, ৫,০০০ বছরের সভ্যতা, যোগ ও গান্ধীর মতো পরিচিত শব্দবন্ধ ঘুরেফিরে আসে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এসব বৃহৎ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক উল্লেখ ভারতের সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার বা রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর নয়।
হেলে লিং স্বেনসেনের অভিজ্ঞতাও এখানেই শেষ হয়নি। তাকে বিদেশি গুপ্তচর বলা হয়, ভারতীয় ডানপন্থী অনলাইন গোষ্ঠীগুলো তার ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেয়। তার ঠিকানা ও ফোন নম্বর প্রকাশ করা হয়। শেষ পর্যন্ত ইনস্টাগ্রাম থেকেও তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একটি প্রশ্ন করার পর একজন বিদেশি সাংবাদিককে এমন আক্রমণের মুখে পড়তে হওয়া ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য উদ্বেগজনক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনাগুলো একসঙ্গে দেখলে একটি ধারাবাহিক চিত্র দেখা যায়। অনলাইনে ব্যঙ্গ হোক বা বিদেশে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্ন—দুটির ক্ষেত্রেই ক্ষমতার প্রতিক্রিয়া অতিরিক্ত রক্ষামূলক এবং আক্রমণাত্মক। যেন স্বাধীন চিন্তা, ঠাট্টা, প্রশ্ন বা কৌতুক—সবকিছুই রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তির জন্য হুমকি। অথচ গণতন্ত্রে ব্যঙ্গ ও প্রশ্নকে শত্রু হিসেবে দেখার কথা নয়। এগুলো বরং সমাজের চাপ কমানোর একটি পথ। মানুষ যখন সরাসরি প্রতিবাদ করতে পারে না, তখন ব্যঙ্গের আশ্রয় নেয়। সেই ব্যঙ্গ দমন করলে ক্ষোভ মুছে যায় না; বরং আরও গভীরে জমা হয়।
মোদি সরকারের সমালোচকেরা মনে করেন, গত কয়েক বছরে ভারতের ভেতরে একের পর এক নীতিগত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা মানুষের বিশ্বাস কমিয়েছে। নোটবন্দি, কাশ্মীরে অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল, করোনা মোকাবিলা—এসব বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র বিতর্ক আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আরও দৃশ্যমান ব্যর্থতাও আছে—সেতু ধসে পড়া, পানির সংকট, প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থা। এসবই তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করছে।
এই প্রেক্ষাপটে তেলাপোকা জনতা পার্টি শুধু একটি ব্যঙ্গাত্মক নাম নয়। এটি এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতীক। যে তরুণদের উপেক্ষা করা হয়েছে, অপমান করা হয়েছে বা তুচ্ছ করা হয়েছে, তারা সেই অপমানকেই নিজের পরিচয়ে পরিণত করেছে। “তেলাপোকা” শব্দটি তাই দুর্বলতার নয়, টিকে থাকার প্রতীক হয়ে উঠছে। তেলাপোকা যেমন সহজে মরে না, তেমনি দমন-পীড়নেও তরুণদের ক্ষোভ সহজে নিশ্চিহ্ন হয় না—এমন প্রতীকী বার্তা এতে আছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মোদি বর্তমানে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অজনপ্রিয় এবং তার সরকার শক্ত জনসমর্থন ছাড়া চলছে—এমন দাবি বিরোধী দল, সাংবাদিক ও স্বচ্ছতা আন্দোলনের কর্মীরা করেছেন। শেষ দুই নির্বাচনের ফল নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন। ভারতকে “নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র” হিসেবে বর্ণনা করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মূল্যায়ন বিতর্কিত হতে পারে, কিন্তু এগুলো ভারতের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উদ্বেগের অংশ।
ভারতীয় জনতা পার্টিকে প্রতিবেদনে এমন এক নির্বাচনী যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়েছে, যা নির্বাচন জিততে দক্ষ হলেও জটিল শাসন, সামাজিক সংলাপ ও রাজনৈতিক সহনশীলতায় দুর্বল। এই সমালোচনার মূল কথা হলো—নির্বাচনে জয়লাভই গণতন্ত্রের শেষ কথা নয়। গণতন্ত্রে প্রয়োজন জবাবদিহি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিরোধী কণ্ঠের জায়গা এবং তরুণদের অভিযোগ শোনার সক্ষমতা।
সাম্প্রতিক বিশ্বপরিস্থিতিও মোদির ভাবমূর্তিকে চাপে ফেলেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, এইচ-ওয়ান-বি ভিসার সীমাবদ্ধতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক—এসব বিষয় ভারতের অর্থনীতি ও মধ্যবিত্তের আকাঙ্ক্ষার ওপর চাপ তৈরি করছে। বহু বছর ধরে যে প্রচারযন্ত্র মোদিকে অপ্রতিরোধ্য নেতা হিসেবে তুলে ধরেছে, বাস্তব সংকট সেই ভাবমূর্তির ওপর দাগ ফেলেছে। ফলে ছোট ব্যঙ্গ, ছোট প্রশ্ন বা ছোট অনলাইন রসিকতাও ক্ষমতার কাছে বড় আঘাতের মতো মনে হচ্ছে।
এখানে একটি বড় রাজনৈতিক শিক্ষা আছে। কোনো সরকার যদি একটি কৌতুক, একটি ব্যঙ্গচিত্র, একটি প্রশ্ন বা একটি ছাত্র-উদ্যোগকে জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে, তবে সেটি সরকারের শক্তির নয়, দুর্বলতার পরিচয় দেয়। আত্মবিশ্বাসী ক্ষমতা সমালোচনা সহ্য করে। অনিরাপদ ক্ষমতা সমালোচনাকে শত্রু বানায়।
দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, তরুণদের ক্ষোভকে ছোট করে দেখা বিপজ্জনক। অনেক দেশেই তরুণ প্রজন্মের প্রতিবাদ প্রথমে হালকা, ব্যঙ্গাত্মক বা অনলাইনভিত্তিক মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে তা বড় রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। কারণ ব্যঙ্গের পেছনে যদি বাস্তব বেকারত্ব, দুর্নীতি, অবিচার, শিক্ষাগত অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎহীনতা থাকে, তবে সেটি শুধু হাসির বিষয় থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক আগুনের প্রাথমিক স্ফুলিঙ্গ।
তেলাপোকা জনতা পার্টির ঘটনাও সেই অর্থে শুধু একটি অনলাইন পাতা বন্ধ হওয়া বা একটি ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা নয়। এটি ভারতের তরুণদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের পরীক্ষা। রাষ্ট্র কি তাদের কথা শুনবে, নাকি তাদের কণ্ঠ বন্ধ করবে? সরকার কি ব্যঙ্গের পেছনের হতাশা বুঝবে, নাকি ব্যঙ্গকারীকেই অপরাধী বানাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিবেশ নির্ধারণ করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, এই বিতর্ক ভারতের গণতন্ত্রের সামনে একটি আয়না ধরেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে—ক্ষমতা যত বড়ই হোক, ব্যঙ্গের সামনে তা কখনো কখনো অস্বস্তিতে পড়ে। কারণ ব্যঙ্গ এমন ভাষা, যা সরাসরি আঘাত না করেও ক্ষমতার দুর্বল জায়গা প্রকাশ করে। তেলাপোকা জনতা পার্টি হয়তো সামরিক শক্তি বা সংগঠিত রাজনৈতিক দলের মতো কোনো বড় শক্তি নয়। কিন্তু এটি তরুণদের ক্ষোভ, হতাশা ও বিদ্রূপের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
যে রাষ্ট্র নিজের তরুণদের হাসিকে ভয় পায়, সে রাষ্ট্রের সংকট গভীর। কারণ হাসি দমন করা যায়, কিন্তু তার পেছনের কারণ মুছে ফেলা যায় না। প্রশ্ন বন্ধ করা যায়, কিন্তু প্রশ্নের জন্ম দেওয়া বাস্তবতা বন্ধ করা যায় না। ব্যঙ্গের পাতা সরানো যায়, কিন্তু ব্যঙ্গের ভাষা মানুষের মনে ছড়িয়ে গেলে তাকে থামানো কঠিন।
মোদির ভারতের জন্য তেলাপোকা জনতা পার্টির বার্তা তাই স্পষ্ট: তরুণদের ছোট করে দেখলে তারা নতুন ভাষায় ফিরে আসবে। অপমান করলে তারা অপমানকেই প্রতীকে বদলে ফেলবে। আর ক্ষমতা যদি প্রতিটি কৌতুকের বিরুদ্ধে কামান তাক করে, তাহলে মানুষ বুঝে যাবে—কামান বড় হলেও ভয়টা আসলে ক্ষমতার ভেতরেই আছে।

