মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আবারও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। সাম্প্রতিক সামরিক হামলা, পাল্টা হামলা এবং একের পর এক হুঁশিয়ারির মধ্যে এবার দৃঢ় অবস্থানের কথা জানালেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ইরান কখনোই আত্মসমর্পণ করবে না। দেশটির মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো আঘাত এলে তার জবাব দেওয়া হবে এবং চাপের মুখে পিছু হটার প্রশ্নই আসে না।
মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুদ্ধ কোনো দেশের জন্যই কাম্য নয়। সংঘাত কখনো মানুষের কল্যাণ বয়ে আনে না। তবে কেউ যদি মনে করে সামরিক চাপ সৃষ্টি করে অথবা হামলার মাধ্যমে ইরানকে নতি স্বীকার করানো যাবে, তাহলে সেটি একটি ভুল হিসাব।
তার ভাষায়, ইরান এমন একটি রাষ্ট্র নয়, যা হুমকি বা শক্তি প্রদর্শনের কারণে নিজের অবস্থান বদলে ফেলবে। দেশের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে তেহরান আপস করবে না।
নিজের বক্তব্যে পেজেশকিয়ান গাজার পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে অবরোধ, হামলা ও সামরিক চাপ প্রয়োগ করা হলেও একটি ছোট ভূখণ্ডকে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব হয়নি।
তার মতে, যদি এত দীর্ঘ সংঘাতের পরও গাজার মানুষ নিজেদের অবস্থানে অটল থাকতে পারে, তাহলে বৃহৎ রাষ্ট্র ইরানকে চাপ দিয়ে নত করা আরও কঠিন।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত বোঝাতে চেয়েছেন যে সামরিক শক্তি সবসময় রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের নিশ্চয়তা দেয় না। অনেক সময় প্রতিরোধের মানসিকতা এবং জাতীয় ঐক্য যুদ্ধক্ষেত্রের সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
পেজেশকিয়ানের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের একাধিক স্থানে সামরিক হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এটি ছিল ইরানের ধারাবাহিক আগ্রাসনের জবাব।
অন্যদিকে তেহরান দাবি করেছে, তারা বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং হরমুজ প্রণালিতে কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এখন শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; তা সরাসরি সামরিক সংঘাতের রূপ নিতে শুরু করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পেজেশকিয়ানের বক্তব্য শুধু অভ্যন্তরীণ জনগণের জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিও একটি রাজনৈতিক বার্তা।
এর মাধ্যমে ইরান জানিয়ে দিতে চেয়েছে যে তারা আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করছে না, তবে সামরিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করতেও প্রস্তুত নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি হামলার পর পাল্টা হামলা সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে। এমন অবস্থায় উভয় পক্ষের কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতে সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো সংঘাতের বিস্তার। হরমুজ প্রণালি, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
বিশ্ব জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিও এর প্রভাব অনুভব করতে পারে।
এমন বাস্তবতায় পেজেশকিয়ানের বক্তব্য একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—ইরান আপাতত সমঝোতার চেয়ে প্রতিরোধের বার্তাকেই সামনে আনছে। আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান এই টানাপোড়েন কোন দিকে মোড় নেবে, সেটাই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি।

