যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে নতুন এক ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চলমান সংঘাতের অবসান ঘটেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র যে প্রধান শর্তগুলো সামনে রেখেছিল, তার সবই মেনে নিতে সম্মত হয়েছে ইরান।
শুক্রবার (১২ জুন) এক নির্বাচনী টেলি-সমাবেশে অংশ নিয়ে ট্রাম্প এ দাবি করেন। মার্কিন সিনেট নির্বাচনে প্রার্থী ব্যারি মুরের সমর্থনে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে তিনি ইরান ইস্যুতে নিজের প্রশাসনের অর্জনের কথা তুলে ধরেন।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ আলোচনার পর এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানো গেছে, যার ফলে ইরান ভবিষ্যতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোবে না। তিনি এটিকে তার প্রশাসনের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন।
সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সংঘাত চলছিল, সেটির এখন চূড়ান্ত সমাধান হয়ে গেছে। তার দাবি, এই সমঝোতার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সব গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পথ আরও সুগম হয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, তেহরান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির আড়ালে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। যদিও ইরান বারবার দাবি করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক ও জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রিক।
তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, নতুন সমঝোতায় ইরান এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার ফলে দেশটি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে যাবে না।
ট্রাম্প আরও জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাদের একটি অংশ ধীরে ধীরে নিজ দেশে ফিরতে শুরু করতে পারে।
তার মতে, দীর্ঘ সময় ধরে ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। নতুন সমঝোতা কার্যকর হলে সেই চাপও অনেকটা কমে আসবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি সত্যিই সংঘাতের অবসান ঘটে থাকে, তাহলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হরমুজ প্রণালি, ওমান উপকূল এবং পারস্য উপসাগর ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলেছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমে এলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তি ফিরতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল পরিবহন হরমুজ প্রণালি দিয়ে হওয়ায় ওই অঞ্চলে যেকোনো সামরিক সংঘাত বিশ্ববাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তেলের দামে অস্থিরতা দেখা গেলেও সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির খবর বাজারে ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
তবে ট্রাম্পের ঘোষণার পরও ইরানের পক্ষ থেকে সমঝোতার বিস্তারিত শর্ত কিংবা যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক মহল এখন তেহরানের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের দিকে নজর রাখছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি উভয় পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করে, তাহলে এটি চলতি বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে।
অন্যদিকে, সমঝোতা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া, পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর নজরদারি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভবিষ্যতে কোন দিকে যায়, সেটিও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

