যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানে আবারও ভয়াবহ সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের নর্থ কর্দোফান অঙ্গরাজ্যের রাজধানী এল-ওবেইদে টানা দুই দিনের ড্রোন হামলায় অন্তত ২৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও কমপক্ষে ১৯ জন। বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন ‘ইমার্জেন্সি লইয়ার্স গ্রুপ’ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) এ তথ্য জানিয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) শহরের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার বেশিরভাগই আবাসিক এলাকা ও বেসামরিক মানুষের অবস্থানকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বুধবার গভীর রাতে চালানো প্রথম হামলায় পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন এবং আহত হন ১২ জন। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেনি সহিংসতা। নিহতদের জানাজা ও দাফনের জন্য কবরস্থানে জড়ো হওয়া মানুষের ওপরও পরবর্তীতে আরেকটি ড্রোন হামলা চালানো হয়।
এই হামলায় আরও চারজন প্রাণ হারান এবং আহত হন সাতজন। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শোকাহত মানুষের সমাবেশকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা সংঘাতের ভয়াবহতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবারও এল-ওবেইদ শহরে নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটে। আল-মুওয়াজ্জাফিন ও আল-মাতার এলাকার কয়েকটি বাড়িঘর এবং সুদানের সেনাবাহিনীর পঞ্চম পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তরের আশপাশের অঞ্চল লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
এই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত আবাসিক এলাকার আশপাশে থাকা অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া শহরের দক্ষিণ প্রবেশপথে খাদ্যসামগ্রী বহনকারী একটি ট্রাকের ওপর পৃথক হামলায় একজন চালক নিহত হন।
ইমার্জেন্সি লইয়ার্স গ্রুপের মতে, সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে বেসামরিক মানুষ, আবাসিক এলাকা, খাদ্য পরিবহন এবং এমনকি উদ্ধার ও দাফন কার্যক্রমকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের শামিল।
সংগঠনটি পুরো ঘটনার জন্য আরএসএফকে দায়ী করেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত আরএসএফ কিংবা সুদানের সরকারি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
কর্দোফান অঞ্চলে ড্রোন হামলার সংখ্যা ও তীব্রতা নিয়ে জাতিসংঘ আগেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। গত ১২ মে প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় সংস্থাটি জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে বিভিন্ন ড্রোন হামলায় অন্তত ৮৮০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ড্রোন এখন সংঘাতের অন্যতম প্রধান অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। ফলে সামনের সারির যোদ্ধাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে বিপর্যস্ত সুদান
সুদানে সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে সংঘাত নতুন নয়। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে দুই পক্ষের মধ্যে ক্ষমতা ও সামরিক কাঠামো নিয়ে বিরোধের জেরে যুদ্ধ শুরু হয়। মূলত আরএসএফকে জাতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনা ঘিরে মতবিরোধ থেকেই সংঘাতের সূত্রপাত।
এরপর থেকে দেশটি এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্যে পড়ে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
সাম্প্রতিক এল-ওবেইদের হামলা আবারও প্রমাণ করছে যে সুদানের সংঘাত এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। শান্তি আলোচনার উদ্যোগ থাকলেও মাঠের বাস্তবতা বলছে, সহিংসতার চক্র থেকে দেশটি এখনো অনেক দূরে।

