মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক ঘিরে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর সামনে এসেছে। ইরানের জব্দ করা ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড় দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্মতি জানিয়েছেন বলে দাবি করেছে ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্র।
শুক্রবার (১২ জুন) ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম ফার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে দাবি করেন যে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে ইরানের অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং এর ফলেই যুক্তরাষ্ট্র এখন কিছু বিষয়ে নমনীয় অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছে।
তবে একই দিনে আরেকটি বিষয় নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাধ্যমে ইরানে অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছে এবং এর মধ্যে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার স্থানান্তরের বিষয়ও রয়েছে। কিন্তু এসব দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে আমিরাত সরকার।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, আমিরাত থেকে ইরানে কোনো ধরনের জব্দ বা স্থগিত অর্থ স্থানান্তর করা হয়নি এবং এ ধরনের খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, ইরানের কোনো অর্থ মুক্ত করা কিংবা স্থানান্তরে সহায়তা করার অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।
অন্যদিকে ফার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মোহসেন রেজায়ি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর দেজফুলে এক স্মরণসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় বলেন, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সামরিক সক্ষমতা আন্তর্জাতিকভাবে নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে। তার মতে, ইরান এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে তেহরানকে উপেক্ষা করে কোনো আঞ্চলিক সমীকরণ তৈরি করা কঠিন।
রেজায়ি আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে ইসরাইলের প্রভাব আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। তার ভাষ্যে, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের কারণে ওয়াশিংটনের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও শুক্রবার (১২ জুন) একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে, তা স্বাক্ষরিত হলে ইরানকে ঘিরে চলমান একাধিক বিরোধের আনুষ্ঠানিক অবসানের পথ তৈরি হতে পারে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়েও নতুন করে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, জব্দ অর্থ ছাড়ের বিষয়টি কেবল আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দুই দেশের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক উত্তেজনা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের কারণে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। ফলে ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্তির সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিলে সেটি কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
তবে এখনো পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত ঘোষণা আসেনি। ফলে ইরানের দাবি কতটা বাস্তবায়িত হবে এবং আলোচনার পরবর্তী ধাপ কী হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার মধ্যে এই অর্থ ছাড়ের সম্ভাবনা একদিকে যেমন উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে এটি ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনা ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন দেখার বিষয়, কূটনৈতিক এই অগ্রগতি বাস্তব সমঝোতায় রূপ নেয় কি না।

