যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে সবচেয়ে পরিচিত ও দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত যুদ্ধবিমানগুলোর একটি বি-৫২ বোমারু বিমান। সেই বিমানই এবার ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় বিমানবাহিনীর একটি বি-৫২ বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত আটজন নিহত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শোক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
সোমবার, ১৫ জুন, স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ২০ মিনিটের দিকে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার এডওয়ার্ডস বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই দুর্ঘটনাটি ঘটে। বিমানবাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি আকাশে ওঠার অল্প সময় পর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিধ্বস্ত হয়।
দুর্ঘটনার পর আকাশজুড়ে বিশাল কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। কয়েক মাইল দূর থেকেও সেই ধোঁয়া স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও ছবিতে দেখা গেছে, দুর্ঘটনাস্থল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ধোঁয়া বের হতে থাকে।
বিমানঘাঁটি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। তবে দুর্ঘটনাটি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে বিমানটিতে থাকা অন্তত আটজনের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধার অভিযান ও তদন্ত কার্যক্রম এখনো অব্যাহত রয়েছে।
এই দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানির কারণেই আলোচনায় আসেনি, বরং বিমানটির গুরুত্বের কারণেও আন্তর্জাতিক মনোযোগ কাড়ছে। বি-৫২ বিশ্বের অন্যতম পরিচিত কৌশলগত বোমারু বিমান। প্রায় সাত দশক ধরে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
উনিশশো পঞ্চাশের দশক থেকে মার্কিন বাহিনীর বহরে থাকা এই বিমানটির আনুষ্ঠানিক নাম বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস। বিশাল আকারের কারণে সামরিক মহলে এর একটি জনপ্রিয় ডাকনামও রয়েছে। দীর্ঘপাল্লার এই বোমারু বিমান উচ্চ আকাশে উড়তে পারে এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বহনের সক্ষমতা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বি-৫২ শুধু একটি যুদ্ধবিমান নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্নায়ুযুদ্ধের সময় এই বিমানকে পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতার একটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতার কারণে এটি এখনো মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিমানটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো আকাশে থাকা অবস্থায় জ্বালানি গ্রহণের সক্ষমতা। এর ফলে এটি হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অভিযান চালাতে পারে এবং দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান করতে সক্ষম হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযানে এই বোমারু বিমান ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিভিন্ন অভিযানে এবং ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার সময়ও এই ধরনের বিমান মোতায়েন করা হয়েছিল।
তবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির যুগেও এত পুরোনো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনার শিকার হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে এর রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে। দুর্ঘটনার কারণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। যান্ত্রিক ত্রুটি, উড্ডয়ন-সংক্রান্ত সমস্যা অথবা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা তদন্ত শেষ হওয়ার পরই জানা যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুর্ঘটনা শুধু একটি বিমান হারানোর ঘটনা নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত বিমানবাহিনীর জন্যও একটি বড় ধাক্কা। কারণ বি-৫২ এখনো দেশটির দীর্ঘপাল্লার হামলা ও প্রতিরোধ সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এডওয়ার্ডস বিমানঘাঁটির এই দুর্ঘটনা তাই শুধু একটি সামরিক সংবাদ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তদন্তের ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা-কল্পনা চলতেই থাকবে।

